Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৬ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০৬:১৩ অপরাহ্ণ

জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য প্রয়োজন

 

নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পর ৫৩ বছর আগে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রায় ৯১,৬৩৪ সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এর ফলে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পায় স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। দিনটি, জাতির আত্মমর্যাদা সংগ্রামের প্রতীক, বিজয়ের, গৌরবের এবং আনন্দ-অশ্রু-মাখা মুক্তির দিন। এই দিনে প্রিয় বাংলাদেশ বিজয়ের পতাকায় আকাশ-বাতাসে উদ্ভাসিত হয়েছিল।

নতুন এক প্রেক্ষাপটে ১৬ বছর পর মুক্ত পরিবেশে এদেশের সকল শ্রেণি, পেশার মানুষ দিবসটি উদযাপনে উন্মুখ হয়ে আছে। দীর্ঘ  এককেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা বাংলাদেশের মানুষকে যেন হাঁপিয়ে তুলেছিলো। সম্ভবত: এবারই প্রথম আওয়ামী লীগ দল ব্যতীত উদযাপিত হচ্ছে দিবসটি। তবে নতুনত্বে যোগ হয়েছে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র সমাজ। যাদের নেতৃত্ব আত্মত্যাগে সামিল হয়েছিলো এদেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা। আগস্ট ২০২৪ নতুন এক বাংলাদেশের আবির্ভাব ঘটেছে।

পটপরিবর্তনের পর দেশের অনেকেই পলাতক, কেউবা মুক্ত বাতাসের স্বাদ নিচ্ছেন। আবার কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও আমরা প্রত্যক্ষ করছি। সচিবালয়ে এতদিনের বঞ্ছিত কর্মকর্তাদের অনেকটা অসংযত আচরণের মাধ্যমে পদ দখল ও ঘনঘন প্রমোশন নেয়াহাইকোর্ট, জজকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টের লাইসেন্সধারী কিন্তু অপেশাদার আইনজীবীদের রাজনৈতিক বিবেচনায় বিভিন্ন পদে নিয়োজিত করা , পরিবহন খাত দখলে নতুন গ্রুপের আবির্ভাব, একইভাবে হাট-বাজার, ঘাট, ফুটপাত দখল করে চাঁদাবাজির হাত বদল, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা,মসজিদ কমিটি এতদিনের বঞ্ছিতদলের নেতা-কর্মীরা দখল করে নিয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সাথে দুর্ব্যবহার ইত্যাদি ঘটনাগুলো আমাদের নজরে এসেছে। আমরা জানি দীর্ঘদিন যাবত এককেন্দ্রিক শাসনে অনেক যোগ্য ব্যক্তি পদ বঞ্ছিত ছিলেন । যেহেতু আমরা নতুন এক বাংলাদেশের প্রত্যাশা করি, সেহেতু আর একটু ধৈর্য্য ধারণ করে সুশৃঙ্খলভাবে পদগুলো পূরণ হলে ভালো লাগতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমর্থনপুষ্ট ব্যক্তিরাই পদ পেয়েছেন। ফলে, অনেক অরাজনৈতিক অথচ যোগ্য ব্যক্তি বঞ্ছিত হয়েছেন। নিরপেক্ষ কর্মকর্তাগণ  এতদিন বঞ্ছিত ছিলেন অথচ নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও যদি বঞ্ছিত হন তাহলে তাঁরা কোথায় যাবেন, কীভাবেইবা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবেন ? মূল্যায়িত হলে তাঁরাও দেশের মঙ্গলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। পরিবহন, ঘাট, হাট-বাজার, ফুটপাতগুলো চাঁদাবাজিমুক্ত করে কিভাবে রাজস্ব খাতে আয় বৃদ্ধি করা যায় সে চিন্তা করা প্রয়োজন। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাগুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে শিক্ষিত বিজ্ঞজন দিয়ে পরিচালনা করলে শিক্ষকেরা মানুসিক তৃপ্তি পেতেন; রাজনৈতিক প্রভাবে শিক্ষকেরা যেনো হাঁপিয়ে উঠেছেন ! এদিকে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের অযাচিত অপপ্রচার অবৈধ হস্তক্ষেপের কারণে বাংলাদেশে চলছে একের পর এক অস্থিতিশীলতা। হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাই-বোনদেরকে আমরা রাত জেগে পাহারা দিয়েছি অথচ তারাও বারবার পাশের দেশের রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত হয়েছেন। একের পর এক দাবী আদায়ের নামে চলছে অনর্থক আন্দোলন।  একটি পক্ষ চান দেশের নাম, পতাকা, জাতীয় সংঙ্গীত, শ্লোগান বদল করে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম,আবার কোন পক্ষ চান হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করতে। যার ফলশ্রুতিতে দেশে চলছে অস্থিরতা। মূলত: বাংলাদেশের মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সকল রাজনৈতিক দলের মূল ভিত্তি যদি দেশপ্রেম হয় তবেই আমরা সাধারণ মানুষ বৈষম্যের হাত থেকে মুক্তি পাবো বলে বিশ্বাস করি। মূলত: কোন কট্টরবাদিতা নয় বরং মধ্যম পন্থাই শ্রেয় বলে মনে করি।

দেশের এই বিপদে পথভ্রষ্ট ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট বাজারকে করে তুলেছে লাগামহীন; দেশের মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে ! ভারতের পররাষ্ট্র নীতিকে আমরা ঘৃণা করি এতে কোন সন্দেহ নেই, তবে তাদের দেশাত্মবোধ থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়ারও অনেক কিছু আছে। জাতীয় প্রয়োজনে তাদের সকল রাজনৈতিক দল শ্রেণি , পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধ যার উদাহরণ বারবার আমাদের সামনে এসেছে। অথচ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে দোষারোপের রাজনীতিতে মত্ত্ব, যা বেদনা দেয়। প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তি আলাদা নীতি বা আদর্শে বিশ্বাসী হতেই পারে, তবে জাতীয় স্বার্থে পরাশক্তির হাত থেকে রক্ষা পেতে সকল রাজনৈতিক দল, শ্রেণি, পেশার মানুষ ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে এক কাতারে শামিল হবে সবসময় আমরা প্রত্যাশা করি।

মনে রাখতে হবে, কোন পরাশক্তিই নিজ দেশের স্বার্থ ব্যতীত আমাদের সহায়তায় এগিয়ে আসবে না। মুক্তিযুদ্ধে ভারত আমাদের এমনিতে নয় বরং তাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থেই সহায়তা করেছিলো এটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। আজকের বাস্তবতায় আমেরিকা, চীন, পাকিস্তান আমাদেরকে সহযোগিতা করছে এজন্য আমরা কৃতজ্ঞ, তবে আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, আমরা যেন নিজেদের বিলিয়ে দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করি। আর আমরাতো ফ্রিতে নয় বরং অর্থের বিনিময়ে সহযোগিতা পাচ্ছি; এই চেতনাবোধ যেন আমাদের থাকে। মনে রাখতে হবে, বিশ্বের সকল দেশের সাথেই আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে কিন্তু আত্মবিসর্জন দিয়ে নয়। সবার আগে দেশ জাতীয় সম্মান এটা যেন আমরা খেয়ালে রাখি। বাংলাদেশ যেন সুদৃঢ় একটি পররাষ্ট্রনীতির উপর দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারে প্রত্যাশা সবসময়।

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথমাবস্থায় মানুষ বুঝতে পারেনি যে কি হতে যাচ্ছে, কিন্তু যখন মানুষ দেখতে পেলো অকাতরে ছাত্ররা প্রাণ ঢেলে দিচ্ছে সেসময় সরকারি পক্ষের কিছু সুবিধাভোগী ব্যতীত সমগ্র দেশের মানুষ একাট্টা হয়ে ও নড়েচড়ে বসে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছেন। কেউ পানি ,কেউ খাবার , কেউ অর্থ সহায়তা আবার কেউবা দোয়া করেছে ছাত্র-জনতার বিজয়ের জন্য এমন পরিস্থিতিতে আগস্ট অযাচিত কর্তৃত্ববাদকে পরাজিত করে দেশ নতুন মাত্রা পেয়েছে। এমতাবস্থায় বিশ্ব বরেণ্য ব্যক্তিত্ব নোবেল বিজয়ী . মুহাম্মদ ইউনূস দেশ পরিচালনার হাল ধরেছেন। দুর্নীতি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে নতুন এক উজ্জ্বীবিত বাংলাদেশ গঠনে তিনি ধৈর্যের সাথে দেশকে এগিয়ে নেবার চেষ্টা করছেন। নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দেশ জাতীয় স্বার্থে সহযোগিতা করা আমাদের নৈতিক কর্তব্য বলে মনে করি। তিনি যদি সংস্কার কাজে সফলতা লাভ করেন তবেই আমরা ফিরে পাবো হারানো ভোটাধিকার। প্রতিষ্ঠিত হবে নতুন এক প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। ফলে, বিজয়ের আনন্দ স্থায়ীত্ব লাভ করবে। বিজয় দিবসের চেতনা শুধু অতীতের নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ গঠনের পাথেয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে দলের ভিতর করতে হবে সংস্কার।  যে আত্মত্যাগে আজকের এই দিন সম্ভব হয়েছে, সেই বীরদের আত্মার কাছে আমাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া উচিত যে, আমরা জাতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবো। দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষা, সাম্যের ভিত্তিতে সমাজ নির্মাণ, সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, সুশাসন এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠায়  আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকবো যেন প্রতিটি মানুষ পায় নিজের মর্যাদা, নিজের পরিচয়, এবং নিজের স্বাধীনতা।  তাহলেই বিজয়ের মহিমায় উদ্ভাসিত হবে বাংলার আকাশ বাতাস।

 

মন্তব্য করুন