প্রি-সার্ভিস শিক্ষক প্রশিক্ষণের গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট
শুভাশীষ দাশ
পেশা হিসেবে শিক্ষকতা আমাদের সমাজে একটি বিশাল উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এটি শুধুমাত্র একটি পেশা নয়, এটি একটি পরিষেবা, যার মাধ্যমে কেউ একটি দেশের নতুন প্রজন্মকে সেবা দিতে পারে এবং একই সাথে তাদের জীবিকা অর্জন করতে পারে। প্রাথমিক স্তরে, একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয় পড়াতে হয় এবং একটি শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলি শেখানোর ক্ষমতা আশা করা হয়। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে কিš‘ এই বিষয়ের শিক্ষকদের তাদের বিষয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ও পড়াতে হয়। অন্যদিকে, কলেজের শিক্ষক একটি বিষয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ করা হয় এবং একজন বিষয় শিক্ষকের দায়িত্ব শুধুমাত্র তার বিষয় পড়ানোর। যেমন ইংরেজি শেখানোর জন্য নিযুক্ত শিক্ষককে শুধুমাত্র ইংরেজি শেখাতে হয়। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের ছোট কলেজগুলোতে এক বিষয়ের জন্য একজন শিক্ষক একটি সাধারণ চিত্র। অনেক সময় ইংরেজি, গণিত, আইসিটি ইত্যাদি বিষয়ে কিছু সময়ের জন্য কোনো শিক্ষক পাওয়া যায় না কারণ পদ শ‚ন্য হওয়ার পরপরই শিক্ষক নিয়োগ করা যায় না।
আমার জানামতে, একজন শিক্ষককে কার্যকরভাবে পাঠদানের কাজটি সম্পাদন করতে অনেক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে হয়। এছাড়াও, শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি প্রদানের জন্য, একজন শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের শ্রেণীকক্ষের আচরণ পরিচালনা করতে হয়, প‚র্বের জ্ঞান পরীক্ষা করতে হয়, কাংখিত শিখন ফল অর্জনের জন্য সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম সংগঠিত করতে হয়, গঠনম‚লক ধারাবাহিক ও সামষ্টিক ম‚ল্যায়ন চালিয়ে যেতে হয়, শ্রেণীকক্ষের বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপে শিক্ষার্থীদের জড়িত করতে হয়, সমাধানের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিš‘ দুর্ভাগ্যবশত, শিক্ষাদানের জন্য নিযুক্ত একজন নবীন স্নাতকের তাত্ত্বিক বক্তৃতা দেওয়া ছাড়া এই ধরনের কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করার দক্ষতা বা ক্ষমতা থাকতে পারে না। এক্ষেত্রে শিক্ষক প্রশিক্ষণ হতে পারে একমাত্র সমাধান এবং প্রাক চাকুরী শিক্ষক প্রশিক্ষণ (চৎব-ংবৎারপব ঃবধপযবৎং ঃৎধরহরহম) আয়োজন করে একজন নবীন নিয়োগকৃত শিক্ষককে যথাযথ ভাবে প্রস্তুত হয়ে শ্রেণিকক্ষে উপ¯ি’ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব।
প্রি-সার্ভিস শিক্ষক প্রশিক্ষণ শিক্ষাগত তত্ত্ব, শিক্ষাবিদ্যা, ব্যবহারিক সং¯’ান, প্রয়োগ এবং অনুশীলনের কৌশল ও দক্ষতা প্রদান করতে পারে যাতে একজন নবীন শিক্ষক প্রশিক্ষিত শিক্ষাবিদ হিসাবে তার কাজের জন্য উপযুক্ত হয়। আমার ১৪ বছরের শিক্ষকতা কর্মজীবনে এবং এই সাম্প্রতিক মহামারী পরি¯ি’তিতে (মার্চ ২০২০ থেকে), আমি আমার অনেক সহকর্মীদের এবং অন্য অনেক স্কুল শিক্ষকদের অফলাইন এবং অনলাইন ক্লাস দেখেছি যেখানে আমি লক্ষ্য করেছি যে শিক্ষকরা সঠিক শিখন পদ্ধতি অনুসরণ করছেন না বা পাঠ্যক্রমের প্রস্তাবিত কৌশলগুলি মেনে চলছেন না। যদিও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রশিক্ষণ অতীব গুরুত্বপ‚র্ণ, তব্ওু কলেজ-স্তরের শিক্ষকদের জন্য প্রাক-সার্ভিস প্রশিক্ষণের কোন ব্যব¯’া নেই এবং ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণ বিরল এবং অধারাবাহিক। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশে প্রাক-সার্ভিস শিক্ষক প্রশিক্ষণ বাধ্যতাম‚লক করা হয়নি। জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০-এ বলা হয়েছে যে, তাদের (শিক্ষক) নিয়োগের পরপরই, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের ২-মাসের ভিত্তি প্রশিক্ষণ (ইধংরপ ঞৎধরহরহম) এর আয়োজন করা হবে এবং কলেজ শিক্ষকদের জন্য এটি হবে ৪ মাসের। কিš‘ বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখনো মাধ্যমিক কিংবা কলেজ শিক্ষকদের জন্য কোনো বাধ্যতাম‚লক প্রাক-সেবাম‚লক প্রশিক্ষণ চালু করতে পারেনি। তবে সরকারি কলেজের শিক্ষকরা সাধারণত ন্যাশনাল একাডেমি অফ এডুকেশনাল ম্যানেজমেন্টে (ঘঅঊগ) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হন (ইন সার্ভিস)। বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের সরকারি টিচার্স ট্রেইনিং কলেজ সম‚হে, উ”চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের এইচএসটিটিআই-তে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সাধারণত, সরকারি কলেজের শিক্ষকরা ঘঅঊগ-এ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হন। এই সবই ইন সার্ভিস প্রশিক্ষণ যার সুযোগ পেতে একজন শিক্ষকের সার্ভিসের পাঁচ থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পনের বছর সময় লেগে যায়। তার মানে এই শিক্ষকগনকে কোন প্রশিক্ষণ ছাড়াই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। যদিও আমরা জানি ব্যাংকিং, আইন এমনকি মার্কেটিং, মাচেন্ডাইজিং সহ সব পেশায় প্রাক সার্ভিস প্রশিক্ষণের ব্যব¯’া রয়েছে।
তাছাড়া সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ একই পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে পরিচালনা করা হয় না এবং কোর্সের সময়কাল এবং কোর্সের পাঠ্যক্রম বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভিন্ন বলে দেখা যায়। কোনো প্রি-সার্ভিস ট্রেনিং ছাড়াই, নবাগত শিক্ষকরা তাদের স্কুল ও কলেজ জীবনে যেমন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তেমনই শিক্ষা দেন। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে যে বেশিরভাগ অপ্রশিক্ষিত শিক্ষক শিখন পদ্ধতি এবং শিক্ষাদান এবং ম‚ল্যায়নের কৌশল সম্পর্কে সচেতন নন। তাই প্রি-সার্ভিস ট্রেনিং ছাড়াই প্রায় সব কলেজের শিক্ষকরা ঐতিহ্যগতভাবে (ঞৎধফরঃরড়হধষ ধিু) শিক্ষার্থীদের পড়ান।
'শিক্ষক প্রশিক্ষণ' শব্দগু”ছটি এমন ধরনের কোর্সকে বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হয় যা শিক্ষকদের শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক যোগ্যতাগুলি ও দক্ষতা অর্জনে সহযোগিতা করে, যা তাদের চাকুরী (শিক্ষকতা) জীবনের শুরুতেই প্রয়োজন। এই কোর্সসম‚হ স্বল্প মেয়াদের বা দীর্ঘ মেয়াদের হতে পারে। শিক্ষাবিদ রিচার্ড ও রেলের মতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ একজন নবীন শিক্ষককে সুসংগঠিত করে, তাকে অন্তত প্রয়োজনীয় দক্ষতা সঙ্গে সজ্জিত করে এবং শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন গুণাবলী এবং আগ্রহের শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস দেয়। এছাড়াও শিক্ষা গবেষক রামিরো এবং পেরেজের মতে সাধারণত তত্ত্বাবধান, পরামর্শদান এর পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রশিক্ষনার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের নতুন কৌশল বের করে কাংখিত শিখন ফল অর্জনে সহযোগিতা করে। এখন আমাদের দেশে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ (ঈড়হঃরহঁবং চৎড়ভবংংরড়হধষ উবাবষড়ঢ়সবহঃ) এর ব্যব¯’া রয়েছে তবে তা সকল শিক্ষক নিয়মিত বা পদ্ধতিগত ভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পান না। দেশে নতুন কারিকুলাম বা ম‚ল্যায়ন পদ্ধতি চালু হলে হয়তো সংশ্লিষ্ট বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের আয়োজন হলেও তা হয় সংক্ষিপ্ত ও অপর্যাপ্ত। অতি সম্প্রতি প্রবর্তীত নতুন কারিকুলামের শিক্ষন শিখন পদ্ধতি, শিখন ফল বা সামস্টিক ম‚ল্যায়ন (ঋরহধষ ধংংবংংসবহঃ) সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদেরও স্পষ্ট ধারণা নেই, তবে কার্যকর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। বেসিক শিক্ষক প্রশিক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যেও রয়েছে বিভেদ, যেখানে সরকারি কলেজ শিক্ষক, সদ্য সরকারিকৃত কলেজের শিক্ষক কিংবা এমপিও ভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক একই কোর্স, কারিকুলাম কিংবা একই সময়ের প্রশিক্ষণের সুযোগ পান না এবং প্রদর্শক বা প্রশিক্ষকগনও যে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ব্যব¯’ার বাইরে থাকেন। এছাড়াও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ বেশিরভাগই যে কোন ধরনের প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হন। আমাদের দেশে যে শিক্ষক প্রশিক্ষণের যে অবকাঠামো রয়েছে তাতেই আরো ব্যাপক প্রশিক্ষণ আয়োজন সম্ভব। বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. রঞ্জিত পোদ্দার ডেইলি সান-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে লিখেছেন, যদিও আমরা নতুন গ্র্যাজুয়েটদের নিয়োগ দিতে বাধ্য হই কোন পেডাগোজিক এবং অন্ড্রাগোজিক শিক্ষাজ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও। তবে আমরা তাদের বিভিন্ন টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (টিটিসি) বা শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (ওঊজং) এ পাঠাতে পারি প্রাক সার্ভিস প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উল্লিখিত ডিগ্রি বা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের জন্য"। কোনো প্রি-সার্ভিস ট্রেনিং ছাড়াই, নবাগত শিক্ষকরা সেভাবেই শ্রেণিকক্ষে পড়ান, যেভাবে তারা তাদের স্কুল এবং কলেজ জীবনে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তাই এটা বলাই যায়, স্কুল বা কলেজের অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকদের ওপর জাতি নির্ভর করতে পারে না এবং করা উচিতও নয়।
বিভিন্ন অপ্রশিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা যায় প্রাক প্রশিক্ষণের অভাব নতুন গ্র্যাজুয়েটদের প্রাথমিক কর্মজীবনকে গুরুতরভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এটি বাংলাদেশের স্কুল-কলেজগুলিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা তৈরি করে। এটা সত্য যে চাকুরিতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ যে কোনো শিক্ষকের শিক্ষার মান উন্নত করে কিš‘ একজন শিক্ষক যদি তার প্রথম ক্লাস নেওয়ার আগে তার দিকনির্দেশনা না পেয়ে থাকেন এবং যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ না করেন তবে তা তার জন্য উদ্দেশ্যবিহীন নৌকার মতো হবে। এজন্য, সংশ্লিষ্টদের মতে বাংলাদেশের সকল স্কুল কলেজ শিক্ষকদের জন্য প্রাক-সেবা শিক্ষক প্রশিক্ষণ বাধ্যতাম‚লক করা উচিত।
বাংলাদেশের শিক্ষা প্রশাসনের জন্য এ ধরনের বিশাল কর্মযজ্ঞ নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা যদি মানসম্পন্ন শিক্ষক নিশ্চিত করতে না পারি, আমরা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারবো না এবং শুধুমাত্র বিষয়ের জ্ঞান একজনকে একজন নিখুঁত শিক্ষক করতে পারে না। তাই আমরা সকল শিক্ষকের জন্য প্রাক-সেবা শিক্ষক প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করি। বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে মাধ্যমিক ও উ”চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কাজটি শুরু করতে পারলে নবনিযুক্ত শিক্ষকদের মানের ক্ষেত্রে আম‚ল পরিবর্তন আসবে এবং এর সুফল আমাদের শিক্ষার্থীরাই ভোগ করবে।
লেখক, প্রভাষক, সরকারি ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজ, ফেনী
This is a summary of my research. The link is given here for you. - https://scholar.google.com/citations?view_op=view_citation&hl=en&user=exqSVF8AAAAJ&citation_for_view=exqSVF8AAAAJ:u5HHmVD_uO8C
১
১ মন্তব্য