Loading..

ব্লগ

রিসেট

২১ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০৯:১৪ পূর্বাহ্ণ

আলিয়া মাদরাসায় দাখিল ও আলিম স্তরে আরবি ভাষা শেখানোর অন্তরায়

শিরোনাম : "আলিয়া মাদরাসায় দাখিল ও আলিম স্তরে আরবি ভাষা শেখানোর অন্তরায় ":


মাদ্রাসার শিক্ষকদের আরবি ভাষায় স্কিল এবং  ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট করার আগে প্রয়োজন ক্যাপাসিটি বা কোয়ালিটি সম্পন্ন জনশক্তি আরবি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা।


আমাদের দেশের মানুষের সাধারণ ধারণা হলো স্কুল মানে ইংরেজিতে ভালো আর মাদ্রাসা মানে আরবিতে ভালো।কিন্তু বাস্তবতা কী আসলেই সেরকম কিছু। নাকি ঠিক তার উল্টো কিছু হচ্ছে?দুই -চারটি মাদ্রাসা এবং কিছু আরবি শিক্ষক ছাড়া চিত্র ঠিক তার উল্টো দেখতে পাচ্ছি। কিছু নামকরা আলিয়া মাদরাসা ছাড়া অধিকাংশ আলিয়া মাদরাসার শিক্ষক এবং  শিক্ষার্থীদের আরবি বিষয়ে তাদের দক্ষতার অবস্থা খুবই হতাশাজনক। প্রমাণ হিসেবে বলতে পারি ব্যাচেলর অব মাদরাসা এডুকেশন (বিএমএড) প্রোগ্রামে টিচিং প্যাকটিস বিষয় হিসেবে চারটি বিষয় ( কুরআন,হাদিস,ফিকাহ ও আরবি)থেকে যে কোনো দুইটি বিষয় নেওয়া বাধ্যতামূলক।আমরা কয়েকজন আরবি নিয়েছিলাম। কিন্তু দশজন না হওয়ায় আমরা টিউটর পাইনি।তাই অনেক ইচ্ছা থাকা স্বত্তেও বাধ্য হয়ে কুরআন ও হাদিস বা ফিকাহ নিতে হয়েছে। জানলে চাইলে সে সকল শিক্ষক বলেন তারা আরবিতে দুর্বল এবং আরবি ভাষাকে ভয় পান । এখন প্রশ্ন হলো যারা আরবি ভাষা  শিখাবে তারা যদি আরবিতে দুর্বল হয় এবং আরবিভীতি থাকে তাহলে তারা শিক্ষার্থীকে কী শেখাবে?


√ব্যাক্তি দুর্বলতা:


তাদের এই দুর্বলতার কারণ হলো ছোটবেলা থেকে আরবি ভাষার বেইস তৈরি করতে না পারা,নূরানি শাখায় পড়াশোনা না করা, ছাত্র বা কর্মজীবনে আরবি ব্যাকরণ না শেখা, আরবি ভাষা দক্ষতা বৃদ্ধি না করা,নকল করে পাশ করা,নিয়মিত আরবি চর্চা না করা,আরবি ভাষাকে কম গুরুত্ব দেওয়া এবং যেই আরবি ভাষাকে ছাত্র জীবনে বেশি কঠিন ও ভয় করতো  সে যে পরবর্তীতে এই আরবি ভাষার শিক্ষক হবে সেটাও জানতো না।


√সামষ্টিক অন্তরায় :

আগে বেসরকারি মাদ্রাসার শিক্ষক নিয়োগ করা হতো ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে। ফলে কিছু যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ছাড়া বেশির ভাগ শিক্ষক নিয়োগ করা হতো স্বজনপ্রীতি ও  দুর্নীতির মাধ্যমে। তখন দেখা যেত যিনি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে তাকে নিয়োগ না দিয়ে ঘুষের মাধ্যমে  অযোগ্য, অদক্ষ এবং শিক্ষা জীবনে  ৩য় বিভাগ রয়েছে এমন প্রার্থীকে নিয়োগ করা হতো।এখন প্রশ্ন হলো যে শিক্ষক নিজেই আরবি ভাষা ও ব্যাকরণ জানেনা তিনি ক্লাসে শিক্ষার্থীদেরকে কী শেখাবেন? একজন অন্ধ কীভাবে আরেকজনকে পথ দেখাবে। আমাদের এদেশে যিনি ভালো ইংরেজি ও আরবি জানেনা সে আমাদের সন্তানদেরকে আরবি ও ইংরেজি ভাষা শেখাচ্ছেন! তবে আগে বেসরকারি মাদ্রাসায় শিক্ষকদের বেতনভাতা ও সুযোগ-সুবিধা কম থাকায় ভালো ও যোগ্যরা আসতে অনীহা প্রকাশ করতো। কিন্তু এখনতো আগের সেই অবস্থা আর নেই। তাই সময় এসেছে যোগ্য এবং দক্ষ  আরবি শিক্ষক নিয়োগ করা।আর সেটা যেহেতু এনটিআরসি এর মাধ্যমে নিয়োগ করা হয় তাই আরবিতে ভালো এমন শিক্ষক নিয়োগ করতে হলে তার পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে রিটেন পরীক্ষা আরবি ব্যাকরণের প্রশ্ন উত্তর করা বাধ্যতামূলক করা। আরবি ব্যাকরণ অংশের মার্ক থাকবে ৪০। আর সেখানে থাকবে কাওয়ায়েদ যাচাই করার মতো অনেক টপিক ভিত্তিক প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের মার্ক হবে ৫ করে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি বর্তমান রিটেন সিলেবাসে যা রয়েছে। সেখানে একজন শিক্ষক আরবি না জেনে এবং ব্যাকরণ অংশের উত্তর না দিয়েও শিক্ষক হতে পারতেছেন। একটা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নে দরখাস্ত ও  ব্যাকরণের রচনামূলক প্রশ্ন দেওয়া ও ২০ মার্কের রচনা লিখতে দেওয়ার মানে কী (প্রয়োগিক প্রশ্ন না দিয়ে)? সর্বোচ্চ সমসাময়িক টপিকের উপর একটা অনুচ্ছেদ দেওয়া যেতে পারে।অনেকে বলেছেন যারা আরবি জানেনা তারা যদিও প্রিলিতে পাশ করে তবে রিটেনে গিয়ে বাদ পরবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো বর্তমানে রিটের যে সিলেবাস রয়েছে এবং যে প্রশ্ন ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় এসেছে  তাতে কী বাদ যাওয়ার কথা?

আগের সিলেবাসটা ছিলো আরবি সাহিত্য এবং মুখস্থ নির্ভর বেশি। যখন শুনলাম সেই সিলেবাসটি পরিবর্তন হবে তখন মনে আশা জেগেছিলো সে এখন আর আরবি না জানা লোক আরবি শিক্ষক হতে পারবে না। কিন্তু কী দেখলাম কুরআন, হাদিস ও ফিকাহ এর প্রশ্নগুলো উত্তর করলেই প্রভাষক ও সহকারী মৌলভী! প্রমাণ হিসেবে বলতে চাই  আলিম পাশ করে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করে এমন একজন চাকরি প্রার্থী তার বাংলা বিষয়ে আবেদন না করে (অনার্সের  সাথে ফাযিল ও কামিল করা তাই)সে আরবি প্রভাষক ও সহকারী মৌলভী পদে আবেদন করবে। কারণ জানতে চাইলে সে বলে বাংলায় প্রভাষক পদে পাশ করা আরবির চাইতে সহজ! এর কারণ একটাই সেটা হলো নিবন্ধন রিটেন  পরীক্ষা আরবি ব্যাকরণের প্রশ্ন কম ( কাওয়ায়েদ যাচাই করা) এবং বাধ্যতামূলক না করা।অনেকে বলবেন যে এই সমস্যাকল্পে  প্রিলিতে গণিত বা সাধারণ জ্ঞানের পরিবর্তে  ২০ মার্ক বা ২৫ মার্ক যুক্ত করতে।যুক্তি  হিসেবে তারা বলেন যে যারা আরবিতে ভালো তারা প্রিলি পাশ করতে পারেনা। তাদের কথা অনেকাংশেই সঠিক।কিন্তু এটা আগের নিয়মে হলে ঠিক আছে। কারণ আগে মাদ্রাসায় বাংলা ও ইংরেজি ২০০ মার্ক ছিলো না। এখনতো আছে, তাহলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কীভাবে পাশ করে বাংলা ও ইংরেজি গ্রামার না জেনে? নকল করে পাশ করে? কারণ শিক্ষক নিবন্ধনের প্রিলি প্রশ্ন সব মাধ্যমিক স্তরের থেকে হয়।তবে যদি প্রিলিতে ২০ মার্ক যুক্ত করা যায় তাহলে একেবারে খারাপ হবে না।


ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট অব মাদরাসা অ্যাডুকেশন স্কিম( আরবি) এর আওতায় মাদ্রাসা শিক্ষকের স্কিল বা ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি করা হবে।এখন প্রশ্ন হলো যাদের ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট করা হবে তাদের ক্যাপাসিটি বা ধারণ ক্ষমতাতো থাকতে হবে তাইনা? তাদের আছে কতটুকু? কারণ হিসেবে দেখা যায় অনেক শিক্ষক  বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্স করে, বিএড বা বিএমএড কোর্স করে। কিন্তু ক্লাসরুমে তার প্রয়োগ করেন কতটুকু? সব কিছু নিজের এবং  জন্য টাকা পাওয়ার আশায়। শিক্ষার্থীরা কী পেল? তাদের প্রশিক্ষণের জন্য যে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে?  সফলতা বা উন্নতি কত % হলো?  


√প্রসাশনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অন্তরায় :

১.প্রাক- ইবতেদায়ী শাখা  ( প্লে, নার্সারি ও কেজি জামাত) না থাকা।

২. ইবতেদায়ী, দাখিল ও আলিম পরীক্ষার আরবি ভাষা দক্ষতা কতটুকু তা  মূল্যায়নে ত্রুটি থাকা।

৩.ব্যাকরণ পদ্ধতিতে আরবি ভাষা শেখানো। 

৪.উদাহরণ এর মাধ্যমে আরবি গ্রামার না শিখিয়ে  সূত্র থেকে আরবি গ্রামার শেখানো।

৫.আরবি ব্যাকরণ অংশের প্রশ্নে কাওয়ায়েদ যাচাই অংশ মার্ক কম থাকা।এবং রচনা,দরখাস্ত এবং রচনামূলক প্রশ্ন ( মুখস্থ নির্ভর) বেশি থাকা।

৬.আরবি ভাষা শেখানোর পূর্বে আরবি গ্রামার শেখানো।

৭.নিবন্ধন পরীক্ষার রিটের প্রশ্নে কাওয়ায়েদ যাচাই অংশে প্রশ্নের মার্ক কম থাকা এবং কাওয়ায়েদ যাচাই  প্রশ্নের উত্তর করা বাধ্যতামূলক না করা।

৮. কাওয়ায়েদ যাচাই অংশের মার্ক ৪০% না করা।

৯. আরবি না জানা লোককে আরবি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা।BMTTI-এর অধীনে আরবি ভাষা শিখন -শেখানো জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ না নেওয়া। Arabic Language Teaching Improvement Project [ALTIP]গ্রহন না করা।

১০. আবরি বইগুলোতে আধুনিক শব্দ এবং  দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করা হয় এরকম শব্দ কম থাকা। ইসলাম রিলেটড শব্দ বেশি থাকা। আরবি পাঠ্য বইয়ে অনুশীলনমূলক প্রশ্ন কম থাকা এবং ভাষা দক্ষতা কতটুকু তা যাচাই করার মতো  প্রশ্নগুলো পরীক্ষায় কম আশা। 


আমরা যদি কোয়ালিটি সম্পন্ন দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিতে না পারি। তাহলে যত অনলাইন বা অফলাইন আরবি ভাষা কোর্স করাই না কেন শিক্ষকদের ক্যাপাসিটি বা স্কিল কখনো  ডেভেলপমেন্ট করা সম্ভব হবে না ।


লেখক

আব্দুর রহিম 

শিক্ষক 

সৈয়দ আব্দুল মান্নান ডি. ডি. এফ. আলিম মাদরাসা, বরিশাল।

মন্তব্য করুন