সহকারী শিক্ষক
২৫ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০৫:২৫ অপরাহ্ণ
শিক্ষার্থীদের মনোযোগী করতে শিক্ষকদের করণীয় : - তৌফিক সুলতান
শিক্ষার্থীদের মনোযোগী করতে শিক্ষকদের করণীয় : - তৌফিক সুলতান
শিক্ষার্থীদের মনোযোগী করার বিষয়ে সকল শিক্ষকদের প্রয়োজন সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
শিক্ষার্থীরা কতোটা মনোযোগী এর উপর নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বুঝতে পারা এবং শিক্ষকের বোঝানোর ক্ষমতা।
গল্পটা কিছুদিন পূর্বের আমি যদিও মেডিক্যাল শিক্ষার্থী তবে শিক্ষকতা আমার সখ বলতে পারেন।
আমি যখন কলেজে পড়ি তখন থেকে টিউশনির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাইমারি স্কুল অথবা শিক্ষক সংকটে ভুগছে এমন স্কুলে গেস্ট শিক্ষক অথবা অতিরিক্ত শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করে থাকি।
এই শিক্ষকতায় ভালো করার জন্য প্রধান নূরানী মুআল্লিম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কাজলার পাড়, ঢাকা থেকে মুয়াল্লিম প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। অতঃপর আল ইত্তেহাদ ইসলামীয়া একাডেমিতে শিক্ষকতা করি বেশ কিছু দিন। এতো কিছু বলার কারণ শিক্ষকতা পেশায় আমার অভিজ্ঞতা বোঝানোর জন্য।
আজ সেই সব অভিজ্ঞতার কথাই আপনাদের সাথে শেয়ার করতে যাচ্ছি। কোনো শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীদের মনোযোগী আকর্ষণ করতে পারে। তবে ৫০% পড়াশোনা এখানেই শেষ হয়ে যায় আর বাকী ৫০% শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকের চেষ্টার উপর নির্ভর করে।
পড়াশোনার বিষয়ে আমি মনে করি একজন শিক্ষক প্রথমে একটা অধ্যায় ভালোভাবে বুঝাবে এবং বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে এই অধ্যায় কে উপভোগ করার উপযোগী করে তুলবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই অধ্যায় নিয়ে আলোচনা তৈরি করবে। এবার শিক্ষার্থীদের পড়তে দিবে পড়া শেষ হলে শিক্ষার্থীদের থেকে প্রশ্ন নিবে এখন শিক্ষক সেই প্রশ্ন গুলো একটা একটা করে সমাধান করবে। এই ভাবে অধ্যায় গুলো শেষ করবে এবং প্রশ্ন তৈরি করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুলো মুখস্থ করার জন্য দিবে।
এই ক্ষেত্রে শিক্ষক উক্ত অধ্যায় ভালোভাবে পড়ে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে এমন ভাবে বুঝানোর চেষ্টা করবে। অনেক কঠিন শব্দ আছে যেগুলো শিক্ষার্থীদের কে বিস্তারিত ভাবে বুঝাতে হবে এই বিষয়ে শিক্ষকদের খেয়াল রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার বিষয়ে উৎসাহিত করতর হবে।
শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য এওয়ার্ড এর ব্যাবস্থা করা যেতে পারে যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার বিষয়ে অধিক আগ্রহী করে তুলবে।
ছোট ছোট উপহার-এর ব্যাবস্থা করা যেতে পারে।
পাঁচুয়া গ্রামের কিছু শিক্ষার্থীদের উপর এই ফরমুলা এপ্লাই করে ভালে ফলাফল পেয়েছিলাম। কিন্তু ঘাগটিয়া চালা জুনিয়র মডেল স্কুলে এই ফরমুলা প্রয়োগ করে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে না।কারণ প্রথমে তাদেরকে এর উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।
এইখানে যেই বিষয় গুলো লক্ষ করা যাচ্ছে তাহলো ভালো শিক্ষার্থীরা মুখস্থ পড়ায় অধিক আগ্রহী এখন যেহেতু সে পড়া সহজেই মুখস্থ করে ফেলতে পাড়ছে। তাই পড়া বুঝার বিষয়ে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
এখন সমস্যা হলো যেহেতু সে বুঝে পড়ছে না তাই এর ভিতর থেকে কোনো প্রশ্ন করলে আর সে উত্তর দিতে পারছে না। এই সমস্যা সমাধানে শিক্ষার্থীদের কে প্রশ্ন করে তাদের ভুল ধরিয়েদিয়ে দিতে হবে। যখন সে বুঝতে পারবে যে তার অক্ষমতা কোথায় তখন তাকে সংশোধন করে দিতে সহজ হবে।
কিছু শিক্ষার্থীদের কথা বলবো যারা ভালো পড়াশোনা করে তবে বেশি কথা বলে যেমন রিবা,মাবিন,মাইশা,মমো এরা চার জন ভালো বান্ধবী।
একজন পড়া না পারলে অন্য তিন জন্য পাড়লেও পড়া দিতে চায় না।এরা হলো এমন গ্রুপ যারা একসাথে থাকে এবং একজন অন্য জনের বিপদে এগিয়ে আসে কিন্তু এর একটা ক্ষতিকর দিক হলো এদের একজন ভুল করলে অপর তিন জন তা সমর্থন করে। এটা যে ঠিক নয় এই বিষয় টা সম্পর্কে হয়তো তারা অবগত নয়। তাই আপনার শিক্ষার্থীদের মধ্যে যদি এমন গ্রুপ থাকে তাদের কর আলাদা করুন এবং সবাইকে এটা বোঝান যে ক্লাসের মধ্যে সবাই শিক্ষার্থী। বন্ধুত্ব ক্লাসের বাহিরে ক্লাসর মধ্যে সবাই ভালো বন্ধু। একই ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলাদা আলাদা গ্রুপ তৈরি হলে এটার একটা প্রভাব পরে।
প্রতিটা শিক্ষক যেই বিষয়টি নিয়ে অধিক গুরুত্ব দিবে তাহলো কোনো শিক্ষার্থী যেন কোনো ভাবে এটা মনে না করে। যে স্যার ওদের কে বা ওকে একটু বেশি খেয়াল করে তবে এটা ক্লাসের মধ্যে খারাপ প্রভাব বিস্তার করবে। সকল শিক্ষার্থীদের সমান ভাবে দেখতে হবে কারোর প্রতি অধিক যত্নবান হওয়া অনুচিত। ক্লাসে কোনো কনফিউশান রাখা যাবে না। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো অন্য রকম বিষয় খেয়াল করলে বিষয় গুলো গুরুত্বদিতে হবে। যেমন চঞ্চল শিক্ষার্থী হটাৎ শান্ত হয়ে যাওয়া বা শান্ত শিক্ষার্থী চঞ্চল আচরণ কিংবা আচরণগত যে কোনো পরিবর্তন।
অনেক সময় ক্লাসরুমে এমন শিক্ষার্থী দেখা যায় যাদের পড়ালেখার এবং ক্লাসরুম কর্যক্রমের ব্যাপারে কোন আগ্রহ থাকে না। ক্লাসে প্রবেশ করার সাথে সাথেই এরকম শিক্ষার্থীদের চেনা যায়। শিক্ষকই পারেন তার ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ দিতে। কারণ, দিনের একটি বড় অংশ তারা শিক্ষকের সাথে বিদ্যালয়ে কাটায়। উৎসাহ হারিয়ে ফেলা শিক্ষার্থীদের উৎসাহ ফিরিয়ে আনার জন্যে।
১) যে টপিকই পড়ান না কেন প্রাসংগিক অজানা গল্প বা উদাহরণ দেয়ার চেষ্টা করুন। শিক্ষার্থীরা বুঝবে এমন উদাহরণ দিন।
২) সময় বেঁধে কাজ শেষ করার জন্যে শ্রেণির কাজে চ্যালেঞ্জ দিন, এতে তারা আগে কাজ শেষ করার জন্যে হলেও আগ্রহী হয়ে উঠবে।
৩) শিক্ষার্থীদের বোঝার চেষ্টা করুন তাদের অবস্থান বোঝুন কতোটুকু পড়া দিলে তারা তা শেষ করতে পারবে তা খেয়াল করুন। তাদেরকে সময় দিন তাদের উপর কোনো কিছু চাপিয়ে না দিয়ে তাদেরকে দিয়ে সিদ্ধান্ত নিন।
৪) শ্রেণীকক্ষ সম্পর্কিত কিছু কাজ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ভাগ করে দিন। যেমন- ক্যালেন্ডার, দেয়াল পত্রিকা, অ্যাটেন্ডেন্স নেয়া, বোর্ড পরিষ্কার করা, চেয়ার-টেবিল ঠিক রাখা ইত্যাদি।
৫) ছোট বাজেটে ফিল্ড ট্রিপের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করুন। অনেক সময় বাজেটের স্বল্পতার কারণে ট্রিপের ব্যবস্থা করা যায় না। সেক্ষেত্রে ক্লাসের শুরুতে দল বেঁধে সারা স্কুল কম্পাউন্ড ঘুরিয়ে আনতে পারেন।
৬) তাদের উন্নতির দিকে খেয়াল করে পড়ার চাপ কমিয়ে দিতে পারেন মাঝেমাঝে। যেমন- একজন ছাত্র পুরো সপ্তাহ ক্লাসে উপস্থিত থাকলো। তার পুরস্কার স্বরুপ পরের সপ্তাহে প্রথম দিনের ক্লাসে বাড়ির কাজ অফ করুন। এরকম ছোট ছোট পুরস্কার লার্নিং এ অনেক সহায়ক হতে পারে। তাছাড়া বিভিন্ন এওয়ার্ড বা উপহারের ব্যাবস্থা করতে পারেন। যেমন : কলম,খাতা,বই,বিজ্ঞান বক্স ইত্যাদি।
৭) ক্লাসে যে টপিক পড়াবেন বাড়ির কাজ কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের দৈনিক জীবনের উপর নির্ভর দেয়ার চেষ্টা করুন, এতে তাদের চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি পাবে।
৮) ক্লাসে মনোযোগী ও সবার সাথে ভালো ব্যবহারের জন্যে ক্লাসের বাইরে তাদের সাথে ভালো করে কথা বলা কার্যকর।
৯) ছাত্রছাত্রীদের হাতে শ্রেণির পাঠের কিছু দ্বায়িত্ব বা কন্ট্রোল দিয়ে দেয়া উচিত, এতে তারা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভেবে আগ্রহী উঠে। এভাবে ক্লাসে মনোযোগী হয়ে উঠার সম্ভাবনা অনেক।
১০। শিক্ষার্থীদের সুনাম করুন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো ভাল কথা বলুন। ক্লাসে যে কাজ দেয়া হোক, তাদের ভুল শুধরে তাদের কাজের গুরুত্ব দিন। তাদের নোটবুক বা ডায়েরিতে পজিটিভ ফিডব্যাক লিখুন।
একজন অমনোযোগী ছাত্র একদিনেই শুধরে যাবে বা পড়ায় মন দিবে তা কিন্তু কখনওই ভাববেন না। এটা অনেক ধৈর্য্যের ব্যাপার। নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে অমনোযোগি শিক্ষার্থীরাও আপনার চেষ্টায় মনোযোগী হয়ে উঠবে। শিক্ষার্থীদের মনোযোগী করতে হয়তো একটু সময় প্রয়োজন হবে। কিছুটা পিছিয়েও যেতে পারে।তবে যখন একবার গুছিয়ে নিতে পারবেন তখন আর কোনো সমস্যা হবে না।
তখন দেখবেন তাদের মধ্যে অন্য রকম একটা আগ্রহ কাজ করবে। শিক্ষার্থীরাই আপনার কাজ কে সহজ করে দিবে।
তৌফিক সুলতান,সহকারী শিক্ষক - ঘাগটিয়া চালা জুনিয়র মডেল স্কুল।
কাপাসিয়া, গাজীপুর।
01301483833
১
১ মন্তব্য