Loading..

ব্লগ

রিসেট

০২ জানুয়ারি, ২০২৫ ১০:০৮ অপরাহ্ণ

স্যার চার্লস উড এর ডেসপ্যাচ শিক্ষা কমিশন ,১৮৫৪

উডের ডেসপ্যাচ শিক্ষা কমিশন,১৮৫৪


ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজদের আগমনের ফলে নতুন শিক্ষা শিক্ষা বিস্তারের জন্য ভারতীয়  উপমহাদেশে নতুন একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়।এই কমিশনের নাম ছিল "উডের ডেসপ্যাচ" শিক্ষা কমিশন। 
 
শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। বাংলার ইতিহাসে শিক্ষা কিভাবে আমাদের এই অবস্থানে এসেছে ৷ তার ভূমিকা কোথায় তা আমাদের অনেকেই জানিনা। এই শিক্ষা ভারতীয় উপমহাদেশে বাঙালিদের জীবনে কি প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং কিভাবে এই শিক্ষা তাদের জীবনে শুরু হয়েছিল তার সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার চেষ্টা করব।  ১৮৫৪ সালে স্যার চার্লস উড নেতৃত্বে ব্রিটিশ ভারতে প্রথম শিক্ষা বিস্তারে কমিশন গঠন করা হয় ।

উডের ডেসপ্যাচ কি ? 

ভারতীয় উপমহাদেশে  ইংরেজি শিক্ষা, ধর্ম নিরপেক্ষ শিক্ষা এবং নারী শিক্ষা প্রসার ও উন্নয়নের জন্য ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গঠিত বোর্ড অফ কন্ট্রোল এর স্যার চার্লস উড একটা শিক্ষা প্রস্তাব প্রণয়ন করেন এবং তা সরকারের কাছে উপস্থাপন করেন । চার্লস উডের নাম অনুসারে এই শিক্ষা প্রস্তাবকে বলা হয় "উডের ডেসপ্যাচ" শিক্ষা। উডের ডেসপ্যাচ এর মূল বক্তব্য ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং উদ্দেশ্য ছিল ভারতে ইংরেজি ও নারী শিক্ষার প্রসার ঘটানো।উডের ডেসপ্যাচ সূচনায় সদস্য ছিলেন মাত্র একজন অর্থাৎ চার্লস উড নিজেই।  উডের  ডেসপ্যাচ কে বলা হয় ভারতীয় শিক্ষার "ম্যাগনা কাঁটা" শিক্ষার অধিকার সনদ। উডের ডেসপ্যাচ তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডালহৌসি কাছে উপস্থাপন করা হয়। উডের ডেসপ্যাচ স্বীকৃত হয় উনিশে জুলাই ।এই শিক্ষা প্রস্তাবে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাথমিক,মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার সুষ্ঠ বিকাশের লক্ষ্যে বাস্তবায়নের কর্মসুচী হাতে নেওয়া হয়। এই প্রস্তাবটিতে বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং মহিলা শিক্ষার ওপর অধিক জোর দেওয়া হয়েছিল। কোম্পানির প্রশাসনিক কাজে ইংরেজি ভাষার দোভাষী শ্রেণীর ভারতীয় লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রস্তাবটি ছিল অত্যান্ত কার্যকারী। 
১৮৫৪ সালে ডেসপ্যাচ ভারতের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কমিশন ছিল এতে সন্দেহ নেই। কারণ পরবর্তী কালে ভারতের শিক্ষা ক্ষেত্রে  সবকিছুর মূলে কিছু না কিছু প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। 

ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রস্তাব ও শিক্ষানীতি বলে অভিহিত হয় উডের ডেসপ্যাচ শিক্ষা। এই শিক্ষা প্রস্তাবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এটি শিক্ষার নিম্নগামী  নীতি ত্যাগ করে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে দায়িত্ব স্বীকার করে নেন । সুতরাং এখানে উল্লেখ করা যায় যে, স্বাধীন ভারত, পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলার বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা চলে আসছে তার ভিত্তি রচিত হয়েছিল সেদিনের প্রসিদ্ধ শিক্ষা সংক্রান্ত দলিল "উডের ডেসপ্যাচ" । 

১৯৫৪ সালে জুলাই মাসে স্যার চার্লস উড বোর্ড অফ ডাইরেক্টর এর সভাপতি ছিলেন। 
উডের ডেসপ্যাচ শিক্ষা প্রস্তাবে নীচের বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত ছিল-- 
  • ইংরেজি শিক্ষা ভারতীয়দের নৈতিক চরিত্র বৃদ্ধি করবে এবং এভাবে ই আই সি বিশ্বস্ত বেসামরিক কর্মচারী সরবরাহ করবে।
  • প্রতিটি প্রদেশে একটি শিক্ষা বিভাগ স্থাপন করতে হবে।
  • বোম্বাই কলকাতা এবং মাদ্রাজের মত বড় শহরগুলিতে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেল ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
  • প্রতিটি জেলায় কমপক্ষে একটি করে স্কুল চালু করতে হবে স্কুল।
  • অনুমোদিত বেসরকারি স্কুলগুলোকে সহায়তার অনুদান দিতে হবে।
  • ভারতীয় নাগরিকদের তাদের মাতৃভাষায় মাতৃভাষায়ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
  • প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামো তৈরি করতে হবে।
  • সরকারকে সর্বদা মহিলাদের শিক্ষাকে সমর্থন দিতে হবে ।
  • প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার মাধ্যম হবে স্থানীয় ভাষা এবং উচ্চ স্তরে শিক্ষার মাধ্যম হবে ইংরেজি ভাষা।
  • মেধাবৃত্তি দান করা করতে হবে।

উডের প্রস্তাবনা পরবর্তী বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গৃহীত ব্যবস্থা -

 উডের প্রস্তাবনা প্রেরণের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বেশ কয়েকটি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল।  

১. ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় এর মতো নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়েছিল এবং এর পাশাপাশি নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয় । ১৮৮২ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় ও ১৮৮৭  সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়।

 ২.  ইংরেজি শিক্ষার প্রচার ও প্রসার লাভ। 

উডের শিক্ষা প্রস্তাবের গুরুত্বঃ

প্রস্তাবিত ১৮৫৪ সালের শিক্ষা প্রস্তাবের তাৎপর্য ছিল অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রফেসর এস এন মুখার্জি, তার ভারতের শিক্ষার ইতিহাস বইটিতে এ শিক্ষা প্রস্তাবকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দলিল বলে উল্লেখ করেছেন তাছাড়া ভারতে ইংরেজি শিক্ষার ম্যাগনাকার্টা হিসাবে বিবেচিত হয় । প্রকৃতপক্ষে এই প্রস্তাব এমন বিস্তৃত ছিল যে ভারতীয় শিক্ষাবিদরা এখনো নির্ধারিত কাজ গুলি সম্পাদনের সফল হতে পারেননি। ইহা এমন একটি পরিকল্পনা যাতে ভারতীয় শিক্ষার সমস্ত দিক যুক্ত করা হয়েছিল। এই প্রস্তাবে ইংরেজি এবং ভারতীয় ভাষার তুলনামূলক অবস্থান সঠিক ভাবে তুলে ধরা হয়েছিল অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে   কিন্তু সরকার এটিকে বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। 

উডের শিক্ষা প্রস্তাবের সীমাবদ্ধতা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু সুস্পষ্ট ত্রুটির জন্য এই প্রস্তাবকে দায়ী করা হয় নিম্নে প্রস্তাবটির কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হলো-

  • কেন্দ্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের কারণে ব্রিটিশ সরকার ভারতবাসীর তীব্র সমালোচনার মধ্যে পড়ে যায়। 
  •  বরাবরের মতো ভারতীয় ভাষায় এবং ভারতীয় সংস্কৃতি পশ্চাৎপদ ও ভারতীয় সংস্কৃতি ছিল অবহেলিত ছিল। 
  • প্রস্তাবটি ভারতে ইংরেজি শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করেছিল এবং প্রস্তাবটি কেবলমাত্র পরীক্ষামূলক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দিয়েছিল।
  •  নিয়মিত শিক্ষাদানের ব্যাপারে কোন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়নি।  প্রকৃত পক্ষে প্রস্তাবটির গণশিক্ষার কার্যক্রম বাস্তবে পরিণত হয়নি।
  •  অনিয়ম থাকায় ব্যবস্থাপনা কার্যকর হয়নি ।
  •  সংস্কৃতি প্রচারে প্রস্তাবটির আগ্রহ লক্ষণীয়। 
  • দাপ্তরিক কাজের জন্য সাধারণের মধ্যে শিক্ষার আগ্রহ সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয় ।
  •  বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে পড়াশোনার পদ্ধতি ভারতীয় অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য হতে পারেনি।
  •  প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী এটা প্রচার করতে পারেনি। 
  • বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রচার করতে পারেনি। 
  • নারী শিক্ষা বরাবরের মতো অবহেলিত থেকে যায় ।
  •  প্রস্তাবটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরিত্র এবং নেতৃত্বের গুণাবলীর বিকাশ ঘটাতে পারিনি বরঞ্চ কেরানী ও হিসাব রক্ষক তৈরী করে মাত্র ।  

পরিশেষে বলা যায়,ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষা বিস্তারে ১৯৫৪ সালের ডেসপ্যাচ শিক্ষা কমিশন  শিক্ষা ব্যবস্থায়  ভিত্তি স্থাপন করে। যার ফলে এই এলাকার মানুষ জ্ঞানার্জনের  মাধ্যমে তাদের জীবন জীবিকা এবং সংস্কৃতিক চর্চা ছাড়াও সভ্য জীবন যাপন করার জন্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জ্ঞান অর্জনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এক কথায় বলা যেতে পারে যে ,এই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তাবগুলি পাক-ভারত মানুষের জ্ঞান অর্জনের পথ খুলে দিয়ে আলোর সন্ধান দিয়েছিল । 

 
মন্তব্য করুন