Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ জানুয়ারি, ২০২৫ ০৩:১৫ অপরাহ্ণ

শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট ও করণীয়

শিক্ষা একটি জাতির মেরুদন্ড। এটি কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয় বরং ব্যক্তি সমাজ এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো নৈতিকতা, দক্ষতা এবং সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো।


বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হলে যুগোপযোগী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস এর মতে, শিক্ষা এমনভাবে ডিজিটাল করা উচিত যাতে এটি তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলে।

অর্থনীতিবিদ ডক্টর কাজী খলিলুজ্জামান আহমেদ শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রযুক্তির শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করেছেন। ব্রাকের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ মোহাম্মদ ফজলে হাসান আবেদ শিক্ষাকে টেকসই উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে দেখেছেন।


পাশাপাশি  জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাসমুহও কারিগরি এবং  বৃত্তিমূলক শিক্ষা কার্যক্রমের উপর গুরুতারোপ করেছে।

শিক্ষা একটি সমাজের অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। এটি ব্যক্তির জ্ঞান অর্জন নৈতিকতা এবং দক্ষতা বিকাশের মাধ্যমে জাতিকে সমৃদ্ধ করে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তিনটি স্তরে বিভক্ত প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক।

প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে নানা সরকারি উদ্যোগ যেমন :উপবৃত্তি মিড ডে মিল কর্মসূচি এবং স্কুলে উপস্থিতি বাড়াতে নেয়া নানা পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। তবে নানা প্রতিবন্ধকতা যেমন: ভাষা ও গণিতের পর্যাপ্ত দক্ষতা অর্জনের ব্যর্থতা রয়েছে।



মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফলের উপর বেশি জোর দেওয়ার কারণে পাঠদানের মান প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরিতেও সমস্যা লক্ষ্য করা যায়।


অন্যদিকে উচ্চশিক্ষায় মানসম্পন্ন গবেষণা এবং নতুন জ্ঞানের সৃষ্টিতে পিছিয়ে থাকার ফলে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক রেংকিংয়ে নিচের দিকে আছে। যেমন সম্প্রতি 'টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি রেংকিং ২০২৫'- এ বাংলাদেশের ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে যার মধ্যে ১৭ টি সরকারি ও সাতটি রিপোর্টার হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

তবে সেরা ৮০০ এর মধ্যে কোন বাংলাদেশী বিশ্ববিদ্যালয় নেই। ৮০১ থেকে ১০০০ রেংকিং এর মধ্যে ৫ টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।


তবে সেরা এক হাজার এর মধ্যে স্থান পায়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েট। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের আরেকটি গবেষণা উল্লেখ করা হয় দেশের প্রায় ৭৫% শিক্ষার্থী কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ। এতে দেখা যায় বাংলাদেশের প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ছয় জনই কর্মসংস্থান উপযোগী নয়।

ইউনেস্কোর ২০২১ সালে শিক্ষা প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে জিডিপি মাত্র ২%। এটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। অপরদিকে বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায় শহর অঞ্চলে শিক্ষার মান অপেক্ষাকৃত উন্নত হলেও গ্রামীণ অঞ্চলে অত্যন্ত নিম্নমান। এর মধ্যে অন্যতম সংকট গুলো হলো অবকাঠামগত সমস্যা, প্রযুক্তিগত ঘাটতি, শিক্ষকের অভাব, পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব, নতুন শিক্ষা ক্রমের চ্যালেঞ্জ ইত্যাদি। 


এছাড়াও রয়েছে কিছু কুপ্রভাব যেমন : চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার বাধা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিকৃতি, শিক্ষা ব্যবস্থার পক্ষপাতিত্ব, মানবাধিকার লঙ্ঘন, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের পশ্চাদপদতা ইত্যাদি। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল জনসাধারণের চিন্তা স্বাধীনতা এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি একক আদর্শ বাস্তবায়ন করা।


এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষা, সমাজ এবং অর্থনীতিতে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে শিক্ষাব্যবস্থায় নানা পরিবর্তনের এসেছে। তারপরেও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা যায়। যেমন বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ, বিভাজন ও রাজনৈতিক প্রভাব, অসাম্য এবং বৈষম্য ইত্যাদি।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় উন্নয়নের অনেক উদ্যোগ দেখা গেলেও উন্নত দেশের কাতারে যেতে  এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। এদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে  অনেক দেশের মৌলিক কাঠামো ও উদ্দেশ্য মিল থাকলেও মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রযুক্তির ব্যবহারের পিছিয়ে।


বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে গবেষণায় বিনিয়োগ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষকের দক্ষতা উন্নয়নে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রধান হাতিয়ার। এদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সম্ভাবনার অভাব নেই।

 সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি জাতীয় উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে যেমন জিডিপির ২ % থেকে বাড়িয়ে ৫% করা উচিত, কর্মমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণের প্রতিটি জেলায় কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা, স্কুল ও কলেজগুলোতে ই-লার্নিং চালু ও উন্নত ক্লাস রুম চালু করতে হবে, প্রতিটি স্তরে শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু করা উচিত , বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার জন্য সমাজের সব স্তরে শিক্ষার মান বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

সর্বশেষ, বাংলাদেশের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত  করা কেবল একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়। এটি আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জাতির ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করার মাধ্যম। একটি শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের মানব সম্পদকে দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক করতে পারে।


এজন্য সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাবিদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমরা যদি এখনি পদক্ষেপ নেই তবে আগামী দিনে আমাদের সন্তানরা শুধু চাকরির জন্য নয় বরং একটি উন্নত এবং দক্ষ মানবিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি কার্যকর এবং যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা অপরিহার্য ।

মন্তব্য করুন