প্রভাষক
১০ জানুয়ারি, ২০২৫ ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ
আসুন শিক্ষার পাশে দাঁড়াই।
খোলা চিঠি
আসুন শিক্ষার পাশে দাঁড়াই
শিক্ষা হলো একটি আচরণগত পরিবর্তন । শিক্ষা হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে জ্ঞান , দক্ষতা , মান , বিশ্বাস এবং অভ্যাস অর্জন করা যায়। কারও মতে শিক্ষা হচ্ছে বুদ্ধির বিকাশমূলক প্রক্রিয়া, আবার কেউ বলেন শিক্ষা সামাজিক প্রক্রিয়া, শিক্ষা জীবন যাপনের প্রস্তুতি। সাধারণ অর্থে জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে। তবে শিক্ষা হলো সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের অব্যাহত অনুশীলন। শিক্ষা হলো একটি ত্রিমুখী আন্দোলনের ফল। যার মুল ধারায় থাকে শিক্ষার্থী অপর দুটি হলো পরিবার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে একটি অপরটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জরিত। শিক্ষার্থী শিখবে পরিবার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করবে। শিক্ষার দুয়ার উন্মোচনে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার আজ একান্ত প্রয়োজন।
শিক্ষা নিয়ে আজ আমি যা বলবো, তাতে হয়তো সবার মনে হবে আমি পেশায় শিক্ষক তাই এসব বলছি। বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটে শিক্ষক তথা এ সমাজের একজন মানুষ হিসেবে ব্যাপারটি নিয়ে অনেক ভেবে-চিন্তেই বলছি....
আসুন সবাই মিলে দেশের শিক্ষার পাশে দাঁড়াই। শিক্ষার খুঁটি/অবলম্বন হই। অন্তত যে যেখানে আছি সেখান থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষার সহায়তাকারী হই। অন্তত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে আমরা সচেতন ভাবে এগিয়ে নেই।শিক্ষার বিষয়ে সচেতন ও অচেতনভাবে সকলের মাঝেই একটি ভুল ধারনা কাজ করে স্কুল/মাদ্রাসা আছে, মাস্টার/হুজুর আছে তারাই বুঝুক। এ ধারনা মন থেকে মুছে ফেলতে হবে। কারন শেখানো মানে শুধু পড়ানো নয় বরং শেখানোর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা, যা থেকে শিক্ষার্থী নিজেই পড়বে, শিখবে, সচেতনভাবে শিখবে, অবচেতনভাবে ও শিখবে। শিশু শিখবে পড়তে, লিখতে, হিসাব করতে, নিরাপদে থাকতে, পরিচ্ছন্ন থাকতে। শিশু শিখবে রুচি, বিবেকবোধ, ভালবাসা, দয়া মায়া, সামাজিকতা, সহমর্মিতা। সে জানবে বুঝবে তার অধিকার, তার দায়িত্ব, পরিমিতিবোধ। সে নিজেকে ভালোবাসবে, ভালোবাসবে অন্যকে। আর এ শেখানো কাজটি একা শিক্ষকের দ্বারা কি করে সম্ভব বলুন? শিশুর শিখনের স্থান শুধু তার বিদ্যালয়/মাদ্রাসা নয়। শিক্ষার যে মাধ্যম গুলোর কথা উল্লেখ করলাম তা শিশু কি শুধু বিদ্যালয়/মাদ্রাসায়ই সম্ভব ? অবশ্যই নয়। শিশুর শিখন শুরু হয় পরিবারে। যেহেতু শিশুর ৭০ ভাগ বিকাশ মাতৃ গর্ভে তাই, সে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিয়ে গর্ভকালীন সময়েও তার শিখন পরিবেশ বিবেচনায় মায়ের সর্বোচ্চ যত্নের প্রয়োজন। তারপর আসে শৈশব কালীন শিক্ষা। আমরা যারা শিশুর বাবা মা, যারা পরিবারের সদস্য তারা কিন্তু শিশুটিকে আমলেই নিই না যে সে আমাকে দেখে, শুনে কত কি শিখছে। নিজে সারাক্ষন মিথ্যা কথা বলে অন্যায় আচরন করে আশা করি আমার সন্তানটি স্কুল/মাদ্রাসায় গিয়ে পীর পয়গম্বর হবে! বলুন তা কি করে সম্ভব? প্রতিবেশি হিসেবে আমি যদি কোন দিন ছোট্ট এ মানব শিশুটির সাথে যদি সম্মান দিয়ে কথা না বলি, তাহলে সে কার কাছে শিখবে প্রতিবেশি সুলভ আচরন?
হয়তো কথায় কথা বাড়িয়ে ফেলেছি। ফিরে আসি যা মুলত বলতে চেয়েছি সেখানে। আসুন নিকটস্থ্ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত খোঁজ রাখি। শিক্ষা সহায়তার জন্য কি কি প্রয়োজন খবর নিই।আর্থিক ও মানষিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা, দান-আনুদান যদি স্কুল/মাদ্রাসা গুলোতে করতে পারেন তবে সেটিই হবে মহৎতম দান। কারণ সে দানে রাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা বাড়বে। কত স্কুল/মাদ্রাসায়, শিশুদের বসার ভালো ব্যবস্থা নাই, কক্ষের স্বল্পতা, শিক্ষক স্বল্পতা, শিক্ষার জরুরী উপকরণসহ অনেক রকম অসুবিধা বিদ্যমান। আসুন সবাই মিলে সরকার তথা রাস্ট্রের পাশে দাঁড়াই। আপনি ভাবছেন শিক্ষার দায়িত্ব তো সরকারের, আমার কি দায় পড়েছে? আপনার এ ভাবনাটি সম্পুর্ন ভুল ও অসচেতনতার দায়ে আবদ্ধ। সরকার কেউ না আপনি নিজে। আপনি আপনার সাধ্য থেকে স্কুলকে সহায়তা দিলে সেটিই হবে রাস্ট্রকে দুহাতে এগিয়ে দেয়া। আসুন নিকটস্থ স্কুল/মাদ্রাসার খোঁজ রাখি, প্রয়োজনের নিরিখে, পরিকল্পিত ভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশে দাঁড়াই। আবারো বলছি শিখন-শেখানো বিষয়টি মুলত উপযুক্ত পরিবেশ সৃস্টি করা। সহায়ক পরিবেশ পেলে মানব শিশু তার তাগিদ থেকেই শিখবে, সৃষ্টিকর্তা সে বোধ দিয়েই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। শিক্ষক তার চাকুরী করতে আপনার এলাকার স্কুলে এসেছে, আপনি তাঁর স্বজন হিসেবে পাশে দাঁড়ান, প্রয়োজন জানতে চান, প্রয়োজনীয় সহায়তা দিন, স্কুলের কাছে আপনার প্রত্যাশা জানান, বুঝে নিন আপনার অধিকার।
শিক্ষা যদি সঠিক পরিবেশে সুষ্ঠুরুপে বিকশিত হয় তবে অবশ্যই প্রতিটি মানব শিশুই মানব সম্পদ রুপে গড়ে উঠবে। শিশুকে বুঝতে দেই শিক্ষা অর্থাৎ লেখাপড়ার সুযোগ তার অধিকার, লেখাপড়া মন দিয়ে করা তার কর্তব্য। অনেক শিক্ষার্থীই ঠিকমত পড়াশুনা করে না এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো সে বুঝতে পারেনা লেখাপড়া করা তার দায়িত্ব। নিজের দায়িত্ব বুঝিনা হেতু আমরা বড়রা ও অনেক কিছু ভালো ভাবে করতে পারিনা। আমরা একটা বড় গর্তে এসে আটকে গেছি। শুধু ফলাফল দিয়েই শিক্ষাকে মুল্যায়ন করি, করতে চাই। আর এখানে এসে শিক্ষার উদ্দেশ্য প্রচন্ডরুপে ব্যর্থ হয়। যেখানে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ কেউই শিশুকে শিখন সহায়ক পরিবেশ দিতে পারিনি সেখানে কি করে আশা করি সেরা ফলাফল? তাছাড়া শিক্ষা তো উদ্ভিদ নয় যে ফল না ধরলে তার মান হবে না। বরং শিক্ষা হলো সুরভিত রঙিন ফুল, যা বিকশিত হতে দিতে হবে, যার বিকাশ হবে সমগ্র জীবন জুড়ে। আমরা শিশুকে ছোট থেকেই বলছি যদি তুমি ভালো করে পড়ো তাহলে বড় চাকুরী করবে, শহরে থাকবে, বড় গাড়ি হবে, বড় বাড়ি হবে খুব সুখে থাকবে। বলিনা, পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট নয় ভালো মানুষ হও। আর এ বোধ দিয়ে সুন্দর মানব সন্তানটিকে কুৎসিত দানব রুপে প্রতিষ্ঠিত করি। যার শিক্ষা কোন আলো না, আগুন হয়ে সব পুড়িয়ে মারে। তাই আসুন শিশুকে শিক্ষা দেই কোন লোভে নয় বরং মহৎ কোন লাভের আশায়। সন্তানকে শেখাই বিপদে ভয়ে পিছিয়ে যেয়ো না মানুষের পাশে দাঁড়াও, মানুষকে সম্পদ বা সামর্থ্য বুঝে নয়, মানুষ হিসেবে ভালোবাসি, বড়দের সম্মান করি, কাজ করি নিজ হাতে। তাহলে শিশু হবে আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল সুনাগরিক। তাহলে আজকের মত সময়ে এসে আর মুখ ফিরিয়ে নেবে না তাদের মত, যাদের আজ বড় প্রয়োজন ছিল। কেননা সনদধারী শিক্ষিত মানুষ নয় সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষের আজ বড্ড প্রয়োজন। তাই আসুন সবাই মিলে দেশের শিক্ষার পাশে দাঁড়াই।
মো: ফরিদুল ইসলাম
প্রভাষক (আইসিটি)
জংলী হামিদিয়া ফাযিল মাদ্রাসা, নাটোর।
৮
৮ মন্তব্য