সহকারী অধ্যাপক
১৩ জানুয়ারি, ২০২৫ ০৫:১৪ অপরাহ্ণ
আর আমারই ইবাদাত কর।এটিই সরল পথ।আর অবশ্যই শয়তান তোমাদের বহু দলকে পথভ্রষ্ট করেছে।…এটি সেই জাহান্নাম যার সম্পর্কে তোমরা ওয়াদাপ্রাপ্ত হয়েছিলে।
আর আমারই ইবাদাত কর। এটিই সরল পথ। আর অবশ্যই শয়তান তোমাদের বহু দলকে পথভ্রষ্ট করেছে।…এটি সেই জাহান্নাম যার সম্পর্কে তোমরা ওয়াদাপ্রাপ্ত হয়েছিলে।
সূরাঃ ইয়াসীন আয়াতঃ ৫৯-৬৫ মাক্কী
৫৯ وَ امۡتَازُوا الۡیَوۡمَ اَیُّهَا الۡمُجۡرِمُوۡنَ
আর [বলা হবে] ‘হে অপরাধীরা, আজ তোমরা পৃথক হয়ে যাও’। আল-বায়ান
(সে দিন বলা হবে) ‘হে অপরাধীরা! আজ তোমরা আলাদা হয়ে যাও।’ তাইসিরুল
আর হে অপরাধীরা! তোমরা আজ পৃথক হয়ে যাও। মুজিবুর রহমান
[Then He will say], "But stand apart today, you criminals. Sahih International
৫৯. আর হে অপরাধীরা! তোমরা আজ পৃথক হয়ে যাও।(১)
(১) হাশরের ময়দানে প্রথমে মানুষ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় সমবেত হবে। অন্য আয়াতে এ অবস্থার চিত্ৰ বৰ্ণনা করে বলা হয়েছে, “তারা হবে বিক্ষিপ্ত পঙ্গপালের মত” [সূরা আল কামার: ৭] কিন্তু পরে কর্মের ভিত্তিতে তাদের পৃথক পৃথক দলে বিভক্ত করা হবে। এর দু'টি অর্থ হতে পারে। একটি হচ্ছে, অপরাধীরা সৎকর্মশীল মুমিনদের থেকে ছাঁটাই হয়ে আলাদা হয়ে যাও। কারণ দুনিয়ায় তোমরা তাদের সম্প্রদায়, পরিবার ও গোষ্ঠির অন্তর্ভুক্ত থাকলে থাকতে পারো, কিন্তু এখানে এখন তোমাদের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। ফলে কাফের, মুমিন, সৎকর্মী ও অসৎকর্মী লোকগণ পৃথক পৃথক জায়গায় অবস্থান করবে। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “আর যখন আত্মাসমূহকে জোড়া জোড়া করা হবে।” [সূরা আত-তাকওয়ীর: ৭] আলোচ্য আয়াতেও এ পৃথকীকরণ ব্যক্ত হয়েছে।
অনুরূপভাবে এ পৃথকীকরণের কথা কুরআনের অন্যান্য সূরায়ও বর্ণিত হয়েছে, যেমন: সূরা ইউনুস: ৩৮, সূরা আর-রূম: ১৪, ৪৩, সূরা আস-সাফফাত: ২২–২৩। দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, তোমরা নিজেদের মধ্যে আলাদা হয়ে যাও। এখন তোমাদের কোন দল ও জোট থাকতে পারে না। তোমাদের সমস্ত দল ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। তোমাদের সকল প্রকার সম্পর্ক ও আত্মীয়তা খতম করে দেয়া হয়েছে। তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তিকে এখন একাকী ব্যক্তিগতভাবে নিজের কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। [দেখুন: কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া
(৫৯) আর (বলা হবে,) ‘হে অপরাধিগণ! তোমরা আজ পৃথক হয়ে যাও।’ [1]
[1] অর্থাৎ, মু’মিনদের থেকে আলাদা হয়ে দাঁড়াও। অর্থাৎ, হাশরের ময়দানে মু’মিন ও অনুগত এবং কাফের ও অবাধ্যকে আলাদা আলাদা করে দেওয়া হবে। যেমন অন্য স্থানে মহান আল্লাহ বলেন
(وَيَوْمَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ يَوْمَئِذٍ يَّتَفَرَّقُوْنَ (يَوْمَئِذٍ يَّصَّدَّعُوْنَ) أي :يَصِيْرُوْنَ صَدْعَيْنِ فِرْقَتَيْنِ
অর্থাৎ, সেই দিন মানুষ দুই দলে বিভক্ত হয়ে যাবে। (সূরা রূম ১৪, ৪৩ আয়াত) দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হল যে, পাপীদেরকেই বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে দেওয়া হবে। যেমন ইয়াহুদীদের দল, খ্রিষ্টানদের দল, বেদ্বীনদের দল, অগ্নিপূজকদের দল, ব্যভিচারীদের দল, মদ্যপায়ীদের দল ইত্যাদি ইত্যাদি।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬০ اَلَمۡ اَعۡهَدۡ اِلَیۡكُمۡ یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ اَنۡ لَّا تَعۡبُدُوا الشَّیۡطٰنَ ۚ اِنَّهٗ لَكُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ
হে বনী আদম, আমি কি তোমাদেরকে এ মর্মে নির্দেশ দেইনি যে, ‘তোমরা শয়তানের উপাসনা করো না। নিঃসন্দেহে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু’? আল-বায়ান
‘হে আদাম সন্তান! আমি কি তোমাদেরকে নির্দেশ দেইনি যে, তোমরা শয়ত্বানের ‘ইবাদাত করো না, কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন? তাইসিরুল
হে বানী আদম! আমি কি তোমাদেরকে নির্দেশ দেইনি যে, তোমরা শাইতানের দাসত্ব করনা, কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? মুজিবুর রহমান
Did I not enjoin upon you, O children of Adam, that you not worship Satan - [for] indeed, he is to you a clear enemy - Sahih International
৬০. হে বনী আদম! আমি কি তোমাদেরকে নির্দেশ দেইনি যে, তোমরা শয়তানের ইবাদাত করো না(১), কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?
(১) অর্থাৎ সমস্ত মানুষ এমনকি, জিনদেরকেও কেয়ামতের দিন বলা হবে, আমি কি তোমাদেরকে দুনিয়াতে শয়তানের ইবাদত না করার আদেশ দেইনি? এখানে প্রশ্ন হয় যে, কাফেররা সাধারণত শয়তানের এবাদত করত না, বরং দেবদেবী অথবা অন্যকোন বস্তুর পূজা করত। কাজেই তাদেরকে শয়তানের ইবাদত করার অভিযোগে কেমন করে অভিযুক্ত করা যায়? এর জওয়াব হচ্ছে, এখানে আল্লাহ “ইবাদত” কে আনুগত্য অর্থে ব্যবহার করেছেন। প্রত্যেক কাজে ও প্রত্যেক অবস্থায় কারও আনুগত্য করার নামই ইবাদত। শয়তানকে নিছক সিজদা করাই নিষিদ্ধ নয় বরং তার আনুগত্য করা এবং তার হুকুম মেনে চলাও নিষিদ্ধ। কাজেই আনুগত্য হচ্ছে ইবাদাত। শয়তানের ইবাদাত করার বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে। কখনো এমন হয়, মানুষ একটি কাজ করে এবং তার অংগ-প্রত্যংগের সাথে সাথে তার কণ্ঠও তার সহযোগী হয় এবং মনও তার সাথে অংশ গ্ৰহণ করে। আবার কখনো এমনও হয়, অংগ-প্রত্যংগের সাহায্যে মানুষ একটি কাজ করে কিন্তু অন্তর ও কণ্ঠ সে কাজে তার সহযোগী হয় না।
এ হচ্ছে নিছক বাইরের অংগ-প্রত্যংগের সাহায্যে শয়তানের ইবাদাত। আবার এমন কিছু লোকও আছে যারা ঠাণ্ডা মাথায় অপরাধ করে এবং মুখেও নিজেদের এ কাজে আনন্দ ও সন্তোষ প্রকাশ করে। এরা ভিতরে বাইরে উভয় পর্যায়ে শয়তানের ইবাদতকারী। তারা চিরকাল শয়তানী শিক্ষার অনুসরণ করেছিল বিধায় তাদেরকে শয়তানের ইবাদতকারী বলা হয়েছে। সে অনুসারেই যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কিংবা অসন্তুষ্টির তোয়াক্কা না করে অর্থের মহব্বতে এমনসব কাজ করে, যদ্দারা অর্থ বৃদ্ধি পায় এবং স্ত্রীর মহব্বতে এমনসব কাজ করে যদ্দারা স্ত্রী সন্তুষ্ট হয়, হাদীসে তাদেরকে অর্থের দাস ও স্ত্রীর দাস বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। [দেখুন: বুখারী: ২৮৮৬, তিরমিযী: ২৩৭৫]
তাফসীরে জাকারিয়া
(৬০) হে আদম সন্তান-সন্ততিগণ! আমি কি তোমাদের কাছে অঙ্গীকার নিইনি যে, তোমরা শয়তানের দাসত্ব করো না,[1] কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু,[2]
[1] অর্থাৎ, আমি কি তোমাদের কাছে আরো অঙ্গীকার নিইনি যে, তোমরা একমাত্র আমারই ইবাদত করবে এবং আমার ইবাদতে কাউকে শরীক করবে না।
[2] অর্থাৎ, শুধু এক আল্লাহরই ইবাদত করবে, এটাই সেই সরল ও সঠিক পথ, যার প্রতি রসূলগণ মানুষকে আহবান করতেন এবং এটাই বাঞ্ছিত গন্তব্যস্থানে অর্থাৎ জান্নাতে পৌঁছবে।
সূরাঃ ৩৬/ ইয়াসীন | Ya-Sin | سورة يس আয়াতঃ ৮৩ মাক্কী
36. ইয়াসীন
:৬১ وَّ اَنِ اعۡبُدُوۡنِیۡ ؕؔ هٰذَا صِرَاطٌ مُّسۡتَقِیۡمٌ
আর আমারই ইবাদাত কর। এটিই সরল পথ। আল-বায়ান
আর আমারই ‘ইবাদাত কর, এটাই সরল সঠিক পথ। তাইসিরুল
আর আমার ইবাদাত কর, এটাই সরল পথ? মুজিবুর রহমান
And that you worship [only] Me? This is a straight path. Sahih International
৬১. আর আমারই ইবাদাত কর, এটাই সরল পথ।
তাফসীরে জাকারিয়া
(৬১) এবং আমারই দাসত্ব কর।[1] এটিই সরল পথ। [2]
[1] এখানে উদ্দেশ্য হল ঐ অঙ্গীকার যা আদম (আঃ)-এর পিঠ থেকে বের করার পর তাঁর সন্তানদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল। (সূরা আ’রাফ ১৭২ আয়াত দ্রঃ) অথবা ঐ অসিয়ত যা পয়গম্বরদের মুখে মানুষকে করা হয়েছে। অনেকের নিকট সেই সকল জ্ঞান ও বিবেকভিত্তিক প্রমাণপুঞ্জ যা আকাশ ও পৃথিবীতে মহান আল্লাহ ছড়িয়ে রেখেছেন। (ফাতহুল ক্বাদীর)
[2] অর্থাৎ, তোমাদেরকে শয়তানের ইবাদত এবং তার কুমন্ত্রণা গ্রহণ করা থেকে এই জন্য নিষেধ করা হয়েছে যে, সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু এবং সে তোমাদেরকে সব রকমভাবে পথভ্রষ্ট করার শপথ করে রেখেছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
:৬২ وَ لَقَدۡ اَضَلَّ مِنۡكُمۡ جِبِلًّا كَثِیۡرًا ؕ اَفَلَمۡ تَكُوۡنُوۡا تَعۡقِلُوۡنَ
আর অবশ্যই শয়তান তোমাদের বহু দলকে পথভ্রষ্ট করেছে। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করনি? আল-বায়ান
(কিন্তু তোমাদেরকে সতর্ক করে দেয়া সত্ত্বেও) শয়ত্বান তোমাদের বহু দলকে বিভ্রান্ত করে দিয়েছে, তবুও কি তোমরা বুঝ না? তাইসিরুল
শাইতানতো তোমাদের বহু দলকে বিভ্রান্ত করেছিল, তবুও কি তোমরা বুঝনি? মুজিবুর রহমান
And he had already led astray from among you much of creation, so did you not use reason? Sahih International
৬২. আর শয়তান তো তোমাদের বহু দলকে বিভ্রান্ত করেছিল, তবুও কি তোমরা বুঝনি?
তাফসীরে জাকারিয়া
(৬২) শয়তান তো তোমাদের পূর্বে বহু দলকে বিভ্রান্ত করেছে; তবুও কি তোমরা বোঝ না? [1]
[1] অর্থাৎ, তোমাদের এতটুকুও জ্ঞান ও বুঝ নেই যে, শয়তান তোমাদের শত্রু, তার আনুগত্য করা উচিত নয় এবং আমি তোমাদের প্রভু, আমিই তোমাদেরকে অন্ন দান করি এবং আমিই দিবারাত্রি তোমাদের হিফাযত করি। সুতরাং আমার অবাধ্যতা করা তোমাদের উচিত নয়। তোমরা শয়তানের শত্রুতা এবং আমার ইবাদতের অধিকারকে না বুঝে নেহাতই নির্বুদ্ধিতা ও অজ্ঞানতার পরিচয় দিচ্ছ।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬৩ هٰذِهٖ جَهَنَّمُ الَّتِیۡ كُنۡتُمۡ تُوۡعَدُوۡنَ
এটি সেই জাহান্নাম যার সম্পর্কে তোমরা ওয়াদাপ্রাপ্ত হয়েছিলে। আল-বায়ান
এটা সেই জাহান্নাম যে বিষয়ে তোমাদেরকে ভয় দেখানো হয়েছিল। তাইসিরুল
এটা সেই জাহান্নাম যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল। মুজিবুর রহমান
This is the Hellfire which you were promised. Sahih International
৬৩. এটাই সে জাহান্নাম, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল।
তাফসীরে জাকারিয়া
(৬৩) এটিই জাহান্নাম, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছিল।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬৪ اِصۡلَوۡهَا الۡیَوۡمَ بِمَا كُنۡتُمۡ تَكۡفُرُوۡ
তোমরা যে কুফরী করতে সে কারণে আজ তোমরা এতে প্রবেশ কর। আল-বায়ান
আজ তাতে প্রবেশ কর, কেননা তোমরা এটাকে অবিশ্বাস করেছিলে।’ তাইসিরুল
আজ তোমরা এতে প্রবেশ কর; কারণ তোমরা একে অবিশ্বাস করেছিলে। মুজিবুর রহমান
[Enter to] burn therein today for what you used to deny." Sahih International
৬৪. তোমরা যে কুফরী করতে সে কারণে আজ তোমরা এতে দগ্ধ হও।(১)
(১) যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, “যেদিন তাদেরকে ধাক্কা মারতে মারতে নিয়ে যাওয়া হবে জাহান্নামের আগুনের দিকে এটাই সে আগুন যাকে তোমরা মিথ্যা মনে করতে। এটা কি তবে জাদু? না কি তোমরা দেখতে পাচ্ছ না!” [সূরা আত-তূরঃ ১৩–১৫]
তাফসীরে জাকারিয়া
(৬৪) তোমাদের অবিশ্বাস (কুফরী) করার কারণে আজ তোমরা এতে প্রবেশ কর। [1]
[1] অর্থাৎ, এখন সেই নির্বুদ্ধিতার ফল ভোগ কর এবং নিজেদের কুফরীর কারণে জাহান্নামের কঠিন শাস্তির মজা আস্বাদন কর।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৬৫ اَلۡیَوۡمَ نَخۡتِمُ عَلٰۤی اَفۡوَاهِهِمۡ وَ تُكَلِّمُنَاۤ اَیۡدِیۡهِمۡ وَ تَشۡهَدُ اَرۡجُلُهُمۡ بِمَا كَانُوۡا یَكۡسِبُوۡنَ
আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেব এবং তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে ও তাদের পা সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে যা তারা অর্জন করত। আল-বায়ান
আজ আমি তাদের মুখে সীল মোহর লাগিয়ে দেব, তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে, আর তারা যা করত সে সম্পর্কে তাদের পাগুলো সাক্ষ্য দেবে। তাইসিরুল
আমি আজ এদের মুখে মোহর লাগিয়ে দিব। এদের হাত কথা বলবে আমার সাথে এবং এদের পা সাক্ষ্য দিবে এদের কৃতকর্মের। মুজিবুর রহমান
That Day, We will seal over their mouths, and their hands will speak to Us, and their feet will testify about what they used to earn. Sahih International
৬৫. আমরা আজ এদের মুখ মোহর করে দেব, এদের হাত কথা বলবে আমাদের সাথে এবং এদের পা সাক্ষ্য দেবে এদের কৃতকর্মের।(১)
(১) হাশরে হিসাব-নিকাশের জন্য উপস্থিতির সময় প্রথমে প্রত্যেকেই যা ইচ্ছা ওযর বর্ণনা করার স্বাধীনতা পাবে। মুশরিকরা সেখানে কসম করে কুফর ও শিরক অস্বীকার করবে। তারা বলবে, “আল্লাহর শপথ আমরা মুশরিক ছিলাম না” [সূরা আল-আন’আম: ২৩] তাদের কেউ বলবে, আমাদের আমলনামায় ফেরেশতা যা কিছু লিখেছে, আমরা তা থেকে মুক্ত। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের মুখে মোহর এটে দেবেন, যাতে তারা কোন কিছুই বলতে না পারে। অতঃপর তাদেরই হাত, পা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে রাজসাক্ষী করে কথা বলার যোগ্যতা দান করা হবে। তারা কাফেরদের যাবতীয় কার্যকলাপের সাক্ষ্য দেবে। আলোচ্য আয়াতে হাত ও পায়ের কথা উল্লিখিত হয়েছে। অন্য আয়াতে মানুষের কর্ণ, চক্ষু ও চার্মের সাক্ষ্য দানের উল্লেখিত রয়েছে। [যেমন, সূরা ফুসসিলাত: ২১–২২, সূরা নূর: ২৪]।
এখানে এ প্রশ্ন দেখা দেয় যে, একদিকে আল্লাহ বলেন, আমি এদের কণ্ঠ রুদ্ধ করে দেবো এবং অন্যদিকে সূরা নূরের আয়াতে বলেন, এদের কণ্ঠ সাক্ষ্য দেবে এ দু'টি বক্তব্যের মধ্যে কিভাবে সামঞ্জস্য বিধান করা যাবে? এর জবাব হচ্ছে, কণ্ঠ রুদ্ধ করার অর্থ হলো, তাদের কথা বলার ক্ষমতা কেড়ে নেয়া। এরপর তারা স্বেচ্ছায় নিজেদের মর্জি মাফিক কথা বলতে পারবে না। আর কণ্ঠের সাক্ষ্যদানের অর্থ হচ্ছে, পাপিষ্ঠ লোকেরা তাদেরকে কোন কোন কাজে লাগিয়েছিল, তাদের মাধ্যমে কেমন সব কুফরী কথা বলেছিল, কোন ধরনের মিথ্যা উচ্চারণ করেছিল, কতপ্রকার ফিতনা সৃষ্টি করেছিল এবং কোন কোন সময় তাদের মাধ্যমে কোন কোন কথা বলেছিল। সেসব বিবরণ তাদের কণ্ঠ স্বতস্ফূৰ্তভাবে দিয়ে যেতে থাকবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিভিন্ন হাদীসে এ ভয়াবহ অবস্থার বর্ণনা এসেছে।
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে ছিলাম। এমন সময় তিনি এমনভাবে হাসলেন যে, তার মাড়ির দাঁত দেখা গেল। তারপর তিনি বললেন, তোমরা কি জানো আমি কেন হাসছি? আমরা বললাম: আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ কিয়ামতের দিন বান্দা তার প্রভুর সাথে যে ঝগড়া করবে তা নিয়ে হাসছি। সে বলবে, হে রব, আমাকে কি আপনি যুলুম থেকে নিরাপত্তা দেননি? তিনি বলবেন, হ্যাঁ, তখন সে বলবে, আমি আমার বিরুদ্ধে নিজের ছাড়া অন্য কারও সাক্ষ্য গ্ৰহণ করবো না। তখন আল্লাহ্ বলবেন, তুমি নিজেই তোমার হিসেবের জন্য যথেষ্ঠ। আর সম্মানিত লেখকবৃন্দকে সাক্ষ্য বানাব। তারপর তার মুখের উপর মোহর মেরে দেয়া হবে এবং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে কথা বলার নির্দেশ দেয়া হবে। ফলে সেগুলো তাদের কাজের বিবরণ দিবে। তারপর তাদেরকে কথা বলার অনুমতি দেয়া হবে তখন তারা বলবে, তোমাদের ধ্বংস হোক, তোমাদের জন্যই তো আমি প্রতিরোধ করছিলাম। [মুসলিম: ২৯৬৯]
অন্য হাদীসে এসেছে, তোমাদেরকে মূক করে ডাকা হবে। তারপর প্রথম তোমাদের উরু এবং দু’হাতকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। [মুসনাদে আহমাদ: ৪/৪৪৬, ৪৪৭, ৫/৪–৫] অন্য হাদীসে এসেছে। ... তারপর তৃতীয় জনকে ডাকা হবে। আর তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তুমি কে? সে বলবে: আমি আপনার বান্দা, আপনার প্রতি ঈমান এনেছি এবং আপনার নবী ও কিতাবাদির প্রতিও। আর আপনার জন্য সালাত, সাওম, সাদাকাহ ইত্যাদি ভাল কাজের প্রশংসা করে তা আদায় করার দাবী করবে। তখন তাকে বলা হবে, আমরা কি তোমার জন্য আমাদের সাক্ষীকে উপস্থাপন করব না? তখন সে চিন্তা করবে যে, এমন কে আছে যে, তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়? আর তখনই তার মুখের উপর মোহর এটে দেয়া হবে এবং তার উরুকে বলা হবে, কথা বল। তখন তার উরু, গোস্ত, হাঁড় যা করেছে তার সাক্ষ্য দিবে। আর এটাই হলো মুনাফিক। এটা এজন্যই যাতে তিনি (আল্লাহ) নিজের ওজর পেশ করতে পারেন এবং তার উপরই আল্লাহ অসন্তুষ্ট। [মুসলিম: ২৯৬৮]
তাফসীরে জাকারিয়া
(৬৫) আমি আজ এদের মুখে মোহর মেরে দেব, এদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং এদের পা এদের কৃতকর্মের সাক্ষী দেবে।[1]
[1] এই মোহর লাগানোর প্রয়োজন এই জন্য হবে যে, কিয়ামতের দিন প্রথম দিকে মুশরিকরা মিথ্যা বলবে এবং বলবে, (واللهِ رَبِّنَا مَا كُنَّا مُشْرِكِيْنَ) অর্থাৎ, ঐ আল্লাহর শপথ যিনি আমাদের প্রভু, আমরা মুশরিক ছিলাম না। (সূরা আনআম ২৩ আয়াত) সুতরাং আল্লাহ তাআলা তাদের মুখে মোহর লাগিয়ে দেবেন, ফলে তারা কথা বলার শক্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। তবে আল্লাহ তাআলা মানুষের শরীরের অন্য অঙ্গকে কথা বলার শক্তি প্রদান করবেন। সুতরাং হাত বলবে, ‘আমার দ্বারা সে এই এই কর্ম করেছিল’ এবং পা তার সাক্ষী দেবে। ঠিক এইভাবে স্বীকার ও সাক্ষী, উভয় পর্যায় পার হয়ে যাবে। এ ছাড়া কথা বলতে সক্ষম বস্তুর মোকাবেলায় কথা বলতে অক্ষম বস্তুর কথা বলে সাক্ষ্য দেওয়া, দলীল ও প্রমাণ হিসাবে অধিক প্রভাবশালী হয়; যেহেতু তাতে অলৌকিক বিষয় পাওয়া যায়। (ফাতহুল ক্বাদীর) মুখ ছাড়া অন্য অঙ্গের কথা বলার বিষয়টি হাদীসসমূহেও বর্ণিত হয়েছে। (দেখুন সহীহ মুসলিমঃ কিতাবুয্ যুহদ)
৮
৮ মন্তব্য