Loading..

ব্লগ

রিসেট

২১ জানুয়ারি, ২০২৫ ০৮:১০ অপরাহ্ণ

দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কৃষি

দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কৃষি

  

কৃষিকাজ হচ্ছে ভূমিকর্ষণ, ৰীজ বপন, শস্য উদ্ভিদ পরিচর্যা, ফসল কর্তন ইত্যাদি থেকে শুরু করে উৎপাদিত পণ্য গুদামজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত বিস্তৃত কার্যক্রম। ফসল উৎপাদন ছাড়াও মাছ ও মৌমাছি চাষ, পশুপালন ও বনায়ন কৃষি খাতের অন্তর্ভুক্ত ।নিম্নে কৃষি খাতের উপখাতসমূহের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হলো –

ক) শস্য ও শাকসবজি

আমাদের দেশের কৃষকেরা শস্যের মধ্যে ধান, গম, পাট, ডাল, আখ, তামাক, চা ও তৈলবীজ ইত্যাদি আর শাকসবজির মধ্যে আলু, শিম, লাউ, মটরশুঁটি, পটল, করলা ও বেগুন ইত্যাদি উৎপাদন করে ।

খ) প্রাণিসম্পদ

আমাদের দেশে পারিবারিকভাবে ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, ভেড়া, মহিষ, কবুতর ও অন্যান্য পাখি পালন করা হয়। এদের মাংস, ডিম, দুধ, পালক ও চামড়া ইত্যাদি এ খাতের অন্তর্ভুক্ত।

গ) বনজ সম্পদ

আমাদের দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় শতকরা ১১.১ ভাগ জুড়ে রয়েছে বনাঞ্চল, যেখানে একটি দেশের থাকা উচিত মোট ভূখণ্ডের শতকরা ২৫ ভাগ। এসব বনাঞ্চলে রয়েছে বাঁশ, বেত, শাল, সেগুন, গর্জন, সুন্দরী, গরান, গেওয়া, পামারি, কড়ই, কুচি ও কেওড়া ইত্যাদি গাছ। এগুলো থেকে কাঠ, রাবার, গাম-তৈল, শণ, মোম ও মধু ইত্যাদি আমরা পেয়ে থাকি ।

ঘ) মৎস্য সম্পদ

এ দেশের নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, হাওর ও সাগর থেকে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও মৎস্যজাত দ্রব্য পাওয়া যায় । এদেরকে আবার ২টি ভাগে বিভক্ত করা হয় । যেমন- মিঠা পানির মৎস্য এবং সামুদ্রিক মৎস্য। মিঠা পানির মৎস্য হলো রুই, চিতল, কই, শিং, মাগুর ইত্যাদি এবং সামুদ্রিক মৎস্য হলো, রূপচাঁদা, ভেটকি, লইট্যা ইত্যাদি। সম্প্রতি মৎস্য খাতে উৎপাদন প্রচুর বৃদ্ধি পাওয়ায়  সরকার মৎস্য খাতকে একটি পৃথক খাতের মর্যাদা প্রদান করেছেন।

 

কৃষি তার সূচনা থেকেই মানব সভ্যতার মূল ভিত্তি, জীবিকা, জীবিকা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি প্রদান করে। সমসাময়িক যুগে, কৃষির ভূমিকা নিছক খাদ্য উৎপাদনের বাইরেও বিস্তৃত; এটি একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কৃষির বর্তমান অবস্থা এবং জিডিপির উপর এর প্রভাব বোঝার জন্য, কৃষি অনুশীলনের ঐতিহাসিক বিবর্তনের উপর প্রতিফলন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন সভ্যতার জীবিকা চাষ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের সবুজ বিপ্লব পর্যন্ত, কৃষিতে রূপান্তরমূলক পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, যেমন যন্ত্রপাতি প্রবর্তন, সার, এবং জেনেটিকালি পরিবর্তিত ফসল, কৃষি উৎপাদনশীলতাকে অভূতপূর্ব উচ্চতায়  নিয়ে গেছে। যাইহোক, এই অগ্রগতি সারা দেশে অভিন্ন হয়নি, যার ফলে বৈশ্বিক কৃষি উন্নয়নে বৈষম্য দেখা দিয়েছে।

বাজারের বিশ্বায়ন কৃষি বাণিজ্যের জন্য নতুন পথ খুলে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিয়োজিত দেশগুলোর জিডিপিকে প্রভাবিত করেছে। কৃষি রপ্তানি এবং আমদানি দেশগুলির অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখে, সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ উভয়ই তৈরি করে। কৃষি বলতে এখন আর শুধু ধান আর পাট উৎপাদন নয়। কৃষি সবচেয়ে সম্প্রসারিত ক্ষেত্র, যা একদিকে অধিক উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্যশস্যের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আনছে, অন্যদিকে দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথকে সুগম করেছে। বাংলাদেশে কৃষির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে একমাত্র কৃষিক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম পুঁজিতে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

এসব বহুমুখী উৎপাদনশীল কৃষি খামারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে অনেক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, খাদ্যপণ্য এবং কৃষিজ উৎপাদন সহায়ক উপকরণের ছোট-বড় ব্যবসা। অল্প কথায় বলা মুশকিল, কারণ কৃষিক্ষেত্রটি জাতীয় উন্নয়নে বহুমুখী কর্মক্ষেত্রের বৃহৎ সমাবেশ ঘটিয়ে কৃষি থেকে কৃষি শিল্পের দিকে সম্প্রসারণ হচ্ছে। কৃষি খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত বিকাশের প্রতি বাংলাদেশ বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ফুল, ফল, সবজি ও অন্যান্য ফসল, মাছ, মুরগি, দুধ ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে পৃথক শিল্প খাত। এছাড়া বাঁশ, বেত, ঝিনুকসহ রকমারি কৃষিজ উপকরণের সমন্বয়েও জেগে উঠছে কৃষিভিত্তিক শিল্প সম্ভাবনা।

ধান-পাটের পাশাপাশি খাদ্যশস্য, শাকসবজি, রকমারি ফল, সমুদ্র ও মিঠা পানির মাছ, গবাদি পশু, পোলট্রি মাংস ও ডিম, উন্নত জাতের হাঁস-মুরগি, দুগ্ধ উৎপাদন অনেক বেড়েছে। টেকসই কৃষির লক্ষ্য হল পরিবেশগত সংরক্ষনের  সাথে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ভারসাম্য বজায় রাখা, এই খাতের দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নিশ্চিত করা। যে নীতিগুলি কৃষিবিদ্যা, জৈব চাষ, এবং পুনরুৎপাদনমূলক অনুশীলনগুলিকে উন্নীত করে তা শুধুমাত্র জিডিপিতে নয় ,পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক কল্যাণেও অবদান রাখে। কাজেই কৃষি এখন সামগ্রিক অগ্রগতির নাম।

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কৃষি খাতের উন্নয়নের উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল । গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা তথা খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন, দারিদ্র্য বিমোচন, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ইত্যাদি কৃষির অগ্রগতির সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত । ফলে কৃষি খাতের উন্নয়নে সরকার সব রকম চেষ্টা চালাচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি প্রযুক্তির উদ্ভাবন, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, দেশের সর্বত্র মাঠপর্যায়ে কৃষকদের দোরগোড়ায়  কৃষি উপকরণ পৌঁছানো, সহজ পদ্ধতিতে কৃষিঋণ প্রদান, কৃষিবীমার প্রচলন ও কৃষি কার্যক্রমে ভর্তুকি প্রদান ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

 

আমাদের দেশের শতকরা প্রায়  ৭৫ ভাগ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। দেশের শ্রমশক্তির মোট ৪৫.১ শতাংশ কৃষিখাতে নিয়োজিত । কৃষি থেকে প্রাপ্ত শণ, গোলপাতা, খড়, বাঁশ, বেত ও কাঠ ইত্যাদি এ দেশের জনগণ কর্মসংস্থান, আসবাবপত্র এবং জ্বালানির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে। এছাড়া জনগণের প্রাণিজ আমিষের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ এবং শিল্পজাত দ্রব্যাদির বাজার সৃষ্টি করে সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে । কৃষি খাতের প্রধান প্রধান রপ্তানি পণ্য যেমন : হিময়িত খাদ্য, কাঁচা পাট, পাটজাত দ্রব্য ও চা । বিশ্বের বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত করতে সরকারের উচিত একটি রোডম্যাপ আঁকা। সেক্ষেত্রে প্রথমেই নজরদারি জোরদার করতে হবে কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীন অর্থনীতির কার্যক্রমকে স্বাভাবিক রাখা ও গতিশীলতা বৃদ্ধি করা। বাংলাদেশের অর্থনীতির জিডিপিতে অবদান রাখে প্রধানত কৃষি-১৬%; শিল্প -৩৪% ও পরিষেবা -৫০%। অর্থনীতিতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি আসে মূলত ৫ টি খাত থেকে। উৎপাদন, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, পরিবহণ, নির্মাণ ও কৃষি খাত। বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তি ৭ দশমিক ৩৭ কোটি। কৃষিখাতে নিয়োজিত ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ, শিল্পে ২০ দশমিক ০৪ শতাংশ ও সেবাখাতে ৩৯ শতাংশ। দেশের মোট শ্রমশক্তির ৮০% কে কৃষিতে নিয়োজিত করলে অপাতদৃষ্টিতে দারিদ্রতা ঘোচানো কিছুটা সম্ভব। আমাদের কৃষি জমির অনেকাংশই অব্যবহৃত বা পতিত অবস্থায় আছে। শুধু তাই নয়, কৃষি শ্রমশক্তির বিরাট একটি অংশ মাইগ্রেশন করে কৃষি থেকে শিল্প ও অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত আছে। এদেরকে গ্রামীন অর্থনীতির বহু ক্ষেত্র যেমন: হাঁস-মুরগি পালন, মাছ চাষ, পশুপালন, দুগ্ধখামার, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ কাজ প্রভৃতিতে কাজে লাগিয়ে মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর উৎপাদন স্তর কাঙ্খিত মাত্রায় ধরে রাখা যায় আবার তারা তাদের প্রত্যাশিত উপার্জনও অব্যাহত রাখতে পারে।অর্থনীতিকে দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করতে হলে এখন গ্রামীন কৃষি ও কৃষককেই সর্বোচ্চ প্রাধিকার দিতে হবে। এতে করে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও বর্তমানে যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা রয়েছে তা ধরে রাখা সম্ভব হবে। দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত আছে। খাদ্য ঘাটতির কোন সম্ভবনা নেই। এটাই আমাদের অর্থনীতির প্রধান আস্থার জায়গা। যার কারনে আমাদের গ্রামীন অর্থনীতি অনেকটাই স্থিতিশীল।


কৃষি বাংলাদেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। হাজার বছরের অবহেলিত ও শোষিত এ বাংলার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ও সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কৃষির কোনো বিকল্প নেই। কৃষির উন্নতিই হচ্ছে কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তি, কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তি মানেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য হবে আরও প্রজ্জ্বলিত ও প্রস্ফুটিত।

 

মন্তব্য করুন