সহকারী শিক্ষক
২২ জানুয়ারি, ২০২৫ ১২:৩২ অপরাহ্ণ
দুখু মিয়ার ছেলে বেলা
ছেলেটির জন্ম ২৫শে মে ১৮৯৯ সালে । বর্ধমান জেলার আসানসোল মহাকুমার জামুরিয়া থানার অন্তর্গত চুরুলিয়া i্গ্রামে । পিতা ১৮৯৯ সালে । বর্ধমান জেলার আসানসোল মহাকুমার জামুরিয়া থানার অন্তর্গত চুরুলিয়া গ্রামে । পিতা কাজী ফকির আহমেদ, মা জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান । বড় ছেলে সাহেবজানের পর ৪ ছেলের অকাল মৃত্যু ।তাই শিশুটির নাম রাখা হল দুখু মিয়া । আর দুখুর জন্মের পরে পরেই দুঃখের বান বয়ে গেল গোটা পরিবারে । জৈষ্ঠ্যের ঝড় আর অজয় নদের বান একাকার করে দিল সবকিছু । পীর পাহলোয়ানের মাজার, মক্তব, মাদ্রাসা, মসজিদ, সারা এলাকার ঘরবাড়ি ডুবে একাকার ।দুখু মিয়া দুঃখের জালে আরো জড়িয়ে পড়লেন । দুখু মিয়ার ১০ বছর বয়সে হঠাৎ মারা গেলেন তার পিতা । মা পড়ে গেলেন অথৈ সাগরে । অগত্যায় শিশু বয়সেই দুখুর ঘাড়ে পড়ল সংসারের জোয়াল । যে মক্তব থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেছিলেন সেই মক্তবেই শিক্ষকতার ভার পড়ল তার উপরে । শুরু হল তার আর এক সংগ্রামি জীবন । সেই সাথে পালোয়ানের মাজারে খাদেমগিরি এবং মসজিদের ইমামতি জুটল তাঁর কপালে । তার আজানের ধ্বনি, কোরআন পাঠ শুনে ধন্য ধন্য করল সকলে । কিন্তু মন থেকে দুখু মিয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলনা নিজেকে ।
একালের যাত্রা পালার মত সেকালে গ্রামে গ্রামে পালাগান হত । চুরুলিয়া গ্রামের পাশে নিমশা গ্রামে লেটো গানের একটা দল ছিল । একদিন তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে ভিড়ে গেলেন সেই দলে । চাচা কাজী বজলে করীমের কাছে কবিতা, গান লেখার হাতেখড়ি হয়েছিল তার । সেসব কাজে লাগালেন লেটো পালাগানে । লিখলেন সংগীত বহুল ছন্দবদ্ধ নাটক । প্রয়োজনে আসরে কবির লড়াইয়ে নেমেছেন বহুবার । তার পালাগানের কদরও জুটল চারদিক থেকে ।কিন্তু অর্থই অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল তার লেখাপড়ায় । তাই পড়াশোনা ছেড়ে একজনের বাড়িতে গার্ড দেবার কাজে নিযুক্ত হলেন ।
কিন্তু সেই কাজ তার মোটেই ভালো লাগলো না । একদিন কাউকে কিছু না বলে সোজা চলে গেলেন আসানসোলে ।
সেখানে মাওলা বক্সের রুটির দোকানে ৫ টাকা মাইনের চাকরি নিলেন । দিনের বেলায় রুটি বানানো আর বিক্রি করাই ছিল তার কাজ । দিনের বেলায় হাড়ভাঙা খাটুনি আর রাতের বেলায় সুর করে পুঁথি পড়া । “হাতেম তাই”, “জঙ্গনামা”, ” চাহার দরবেশ” আরো কত পুঁথি । আশেপাশের লোকজন সেই পুঁথি মনোযোগ সহকারে শোনে । অবাক হয় । গালে হাত দিয়ে ভাবে । তাঁর পুঁথি পড়ায় খুব আকৃষ্ট হয় এক সদাশয় দারোগা । নাম কাজী রফিজউল্লা । বাড়ি ময়মনসিংহে । দুখু মিয়ার অসাধারণ প্রতিভায় আকৃষ্ট হয়ে তাঁকে নিয়ে গেলেন নিজের গ্রামে, কাজীর শিমলায় । তাঁকে ভর্তি করে দিলেন দরিরামপুর হাইস্কুলে । সেটা ছিল ইং ১৯১৪ সাল । দারোগা সাহবের স্ত্রী শামসুননেশার তাঁকে মাতৃ স্নেহে কাছে টেনে নিলেন । কিন্তু বছর পার হতে না হতেই দুখু মিয়ার মনে হল তিনি যেন পিঁজরার পাখির মত আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন ।ভর্তি হলেন রানীগঞ্জের শিয়ারশোল স্কুলে, ক্লাস এইটে । বন্ধু হিসাবে পেলেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়কে । বন্ধু লিখতেন কবতা, দুখু লিখতেন গল্প । পরে ব্যাপারটা গেল উল্টে । দুখু লিখলেনস্কুলে গুরু হিসাবে দুখু পেয়েছিলেন চারজন শিক্ষকের সহচার্য । এরা হলেন– ১ । কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক ২ । নিবারণ চন্দ্র ঘটক ৩ । হাফিজ নূরুন্নবী এবং ৪ । সতীশ চন্দ্র কাঞ্জিলাল । প্রথমজনের কাছে শিখলেন কবিতার শব্দ নির্বাচন, দ্বিতীয়জনের কাছে বিপ্লবের মন্ত্র, মুক্তি যুদ্ধের চেতনা, দেশোদ্ধারের প্রেরণা, তৃতীয় জনের কাছে শিখলেন ফরাসী ব্যাকরন, কবিতার ছন্দ মাধুর্য, আর চতুর্থ জনের কাছে পেলেন সংগীতের সুর ।
দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় হঠাৎ বেজে উঠল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা । অশান্ত হয়ে উঠল দুখু মিয়ার মন । পড়াশুনা সব জলাঞ্জলি দিয়ে, সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তিনি যোগ দিলেন সেনাবাহিনীর বাঙালি পল্টনে । পড়ে রইল তার ম্যাট্রিক পরীক্ষা । প্রশিক্ষণ শেষে তাঁর স্থান হল করাচীর ৪৯ নাম্বার বাঙালি রেজিমেন্টে । সেখানে পাঞ্জাবেরএক মৌলভীর সাথে পরিচয় হয় তাঁর । তিনি ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী গুণী লোক । তাঁর স্নেহছায়ায় আরবি ও ফারসি ভাষা রপ্ত করেন দুখু মিয়া । তারপর ফরাসি ভাষায় লেখা ওমর খৈয়াম, শেখ সাদী ও হাফিজের সমস্ত রচনার সাথে পরিচিত হন । ফলে নতুন চিন্তা ভাবনার দিগন্ত খুলে যায় দুখু মিয়ার চোখের সামনে ।
১৯২০ সালে বাঙালি পল্টন ভেঙে দেয় ইংরেজ সরকার । ফলে চাকরি হারিয়ে আবার অথৈ জলে পড়ে যান দুখু মিয়া ।
যুদ্ধে যোগদানের জন্য ইংরেজ সরকার তাঁর জন্য একটা চাকরির ব্যবস্থা করে ছিলেন । কিন্তু সে চাকরি অবলীলায় ত্যাগ করে তিনি চলে গেলেন কোলকাতায় । বেছে নিলেন সাংবাদিকতার অনিশ্চিত জীবন । কারণ যুদ্ধের বীভৎসতা ও মানবিকতা লঙ্ঘিত হতে দেখে খুব মর্মাহত হয়েছিলেন খুব ।
পরাধীনতার নাগপাশ থেকে দেশকে মুক্ত করতে, মানুষের মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বালতে ১৯২১সালে “মোসলেম ভারত” কাগজে লিখলেন “বিদ্রোহী” কবিতা । ওই একটি কবিতাতেই দুখু মিয়ার পরিচিতি জেনে গেল দুনিয়ার লোকে । তিনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ।
এরপর তিনি হাত দেন সম্পাদনার কাজে । প্রকাশ করেন “ধূমকেতু” নামে একটি পত্রিকা । দেশের পূর্ণ স্বাধীনতা চেয়ে কবি লিখলেন–
সংগৃহীত
১৮
২৯ মন্তব্য