Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ জানুয়ারি, ২০২৫ ০৯:৩৪ অপরাহ্ণ

ক্লাসে কীভাবে মনোযোগী হবে


১. ক্লাসের পূর্বপ্রস্তুতি:

শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দেয়ার প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে ক্লাসে উপস্থিত হওয়া। বিগত ক্লাসে কী পড়ানো হয়েছিলো সেগুলো দেখা, হোমওয়ার্ক থাকলে সেগুলো প্রস্তুত করা এবং পরবর্তী ক্লাসের সম্ভাব্য বিষয়ের উপর চোখ বুলিয়ে নেয়া। শিক্ষক ক্লাসে পড়ানোর সময় বই সাথে থাকলে বিষয়বস্তু চিহ্নিত করা ও বুঝা সহজ হয়। প্রতিটি বিষয়ের জন্য কিংবা প্রত্যেক শিক্ষককের জন্য পৃথক খাতা ব্যবহার করে সবগুলো ক্লাস বিষয়ভিত্তিক সংরক্ষণ করা যায়। ফলে শিক্ষার্থীর খাতা দেখে প্রয়োজনক্ষেত্রে প্রক্সি শিক্ষক শিক্ষণফল অনুযায়ী পাঠদান অব্যাহত রাখতে পারেন এবং শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে পাঠদান বিষয়ের উপর অধিক গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারে।  

 

২. ক্লাসে বসার স্থান নির্বাচন:

ক্লাসে গিয়ে কোথায় বসবে, কোন বেঞ্চে কিংবা কোন বন্ধুর পাশে বসবে, এটা নিয়ে প্রায়ই শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়ে। ক্লাসে বসার স্থান শ্রেণিশিক্ষক কর্তৃক নির্ধারিত না থাকলে শিক্ষার্থীদের বসার স্থানটি আলো বাতাস রয়েছে এবং স্থানটি থেকে শিক্ষকের কথা শুনতে, বুঝতে এবং বোর্ডের লেখা দেখতে যাতে কোনোরূপ সমস্যা না হয়, এইরূপ স্থানে বসা উচিত। ক্লাসে সবার আগে এসে সামনের দিকের সারিতে সম্ভব হলে সামনের সারির ডানদিকে বসার চেষ্টা করা উচিত। এতে করে শিক্ষকের কথা মযোযোগ সহকারে শুনা যাবে, বোর্ডের লেখা দেখতে ও লিখতে সুবিধা হবে। সে সব সহপাঠী পাঠদানের সময় ক্লাসে সবসময় কথা বলে, দুষ্টুমি করে, ক্লাস ফাঁকি দেয় কিংবা পেছনে বসতে পছন্দ করে, তাদের সাথে না বসে অন্য কোথায় বসা উচিত। সামনের দিকে বসলে শিক্ষার্থীর মন ও মস্তিষ্ক সবসময় সতর্ক থাকছে যে, শিক্ষক তাকে দেখছেন। এই সর্তকতা শিক্ষার্থীর মনোযোগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

 

৩. রুটিন তৈরি করা:

ক্লাসে কিংবা বাসায় পাঠে মনোযোগী না হওয়ার অভ্যাসটি অন্যান্য খারাপ অভ্যাসের মতোই। যখন একজন শিক্ষার্থী অনুধাবন করতে পারবে যে, সে ঠিকমতো ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছে না, তখন থেকেই  পাঠ্যবিষয়সমূহ নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন করার জন্য একটি রুটিন তৈরি করতে পারে। সেই রুটিন মোতাবেক বাসায় পড়াশুনা করবে এবং ক্লাসের পড়াগুলো তৈরি করবে। রুটিনে খেলাধুলা, যেকোনো সহশিক্ষা কার্যক্রম কিংবা বিনোদনের খানিকটা সময়ও বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। রুটিন তৈরির উদ্দেশ্য হলো মস্তিষ্ককে একটি নিয়মিত অভ্যাস ও নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে নিয়ে আসা, যখন কেউ খেলাধুলা করবে তখন যেনো সম্পূর্ণ মনোযোগ খেলার মধ্যেই থাকে, যখন ক্লাস করবে তখন যেনো ক্লাসে পরিপূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে।

 

৪. সময়ের প্রতি যত্নবান হওয়া:

ক্লাসে মনোযোগী হওয়ার অন্যতম উপায় হচ্ছে, ক্লাস চলাকালীন সময়ের সদ্ব্যবহার করা। যে সময়ে ক্লাস চলছে, সে সময়ে ক্লাস ব্যতীত অন্য কোনো কিছু নিয়ে না ভাবা। যেমন ক্লাসের পর কোথায় যাবে, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানো, বিকালে কোন বন্ধুদের সাথে খেলতে যাবে, এইসব না ভেবে যে ক্লাসটি চলছে তার দিকে মনোনিবেশ করা। এই অভ্যাসটি গড়ে তোলা একটু কঠিন হলেও বারবার চেষ্টায় অভ্যাসটি একবার আয়েত্তে আসলে ক্লাসে মনোযোগী সহজ হবে। শিক্ষার্থীকে নিজে নিজেই শিখতে হবে, কীভাবে ভাবনাগুলোকে ঝেড়ে ফেলে ক্লাসের পাঠে মনোযোগ করবে। শিক্ষার্থী যদি উপলদ্ধি করতে পারে তার মস্তিষ্ক অন্য কিছু ভাবছে, তাহলে সেই ভাবনা থেকে মস্তিষ্ককে সরিয়ে নতুন করে ক্লাসে মনোযোগ স্থাপন করতে পারবে। মনে রাখতে হবে, মনোযোগ একটি দক্ষতা। পুনঃপুনঃ চেষ্টার ফলে এই দক্ষতাটি অন্যান্য দক্ষতার মতোই অর্জন করা যায়।

 

৫. প্রয়োজনীয় উপকরণ সাথে রাখা:

বিদ্যালয়ে রওয়ানা দেয়ার আগেই রুটিন অনুযায়ী বই-খাতা ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ যেমন কলম, পেন্সিল, রাবার, শার্পনার, স্কেল কিংবা প্রয়োজন ক্ষেত্রে জ্যামিতি বক্স প্রভৃতি ব্যাগে নেওয়া। শিক্ষকের পাঠদান করার সময় এইসব শিক্ষাউপকরণ সাথে না থাকলে ক্লাসে মনোসংযোগ প্রদানে, ক্লাসওয়ার্ক তৈরির কাজে ব্যঘাত হতে পারে। সতর্কতার জন্য সবসময় অতিরিক্ত কলম সাথে রাখবে যাতে কলমের কালি শেষ হলেও লেখাতে কোনোরূপ বিঘ্ন না ঘটে। ক্লাসে কিংবা পরীক্ষার হলে কলম-পেন্সিল অন্যের কাছ থেকে ধার করার সময় কথার বলায় শ্রেণিকক্ষে নয়েজ তৈরি হয়। ফলে শিক্ষকের পাঠদানে বাধাগ্রস্ত হয় এবং অনেকক্ষেত্রে শিক্ষক বিরক্ত হন। তাছাড়া শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং পরিচ্ছন্নতার জন্য খাবার পানির ছোট পাত্র, মাস্ক, টিস্যু পেপার, রুমাল বা ছোট তোয়ালে, মেয়েরা সেনেটারি ন্যাপকিন প্রভৃতি স্কুল ব্যাগে রাখতে পারে।

 

৬. অমনোযোগিতার ‍উপকরণ এড়িয়ে চলা:

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর মনোযোগী হবার অন্যতম ভালো মাধ্যম হলো, যে জিনিসগুলো শিক্ষার্থীকে ক্লাসে মনোযোগী হতে আর্কষণ করছে সেগুলোর প্রতি গভীর দৃষ্টি নিবন্ধ করা এবং যে জিনিসগুলো শিক্ষার্থীকে ক্লাসে মনোযোগী হতে বাধা দিচ্ছে সেগুলো মন থেকে সরিয়ে ফেলা। যেমন মোবাইলফোন, গেইম প্যাড প্রভৃতি ডিভাইস অনেকের নিত্যপ্রয়োজনীয় বা বিনোদনের জনপ্রিয় উপাদান হলেও ক্লাসের সময় এগুলোকে দূরে রাখতে হবে। স্মার্টফোন নিয়ে ক্লাসে না আসা, বাটনফোন আনার অনুমতি থাকলে তা ক্লাস চলাকালীন সুইচ অফ করে রাখা। কোনোভাবেই ক্লাস চলাকালীন মোবাইলফোন ব্যবহার করা  উচিত নয়। ক্লাসে অমনোযোগী হয়ে পড়ছে, এটি ‍উপলব্ধি করার সাথে সাথেই একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষকের পড়ানোর দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করে ক্লাসের প্রতি মনোযোগে পুনঃসংযোগ করা উচিত। শিক্ষা উপকরণের বাহিরে অপ্রয়োজনীয় বা নিষিদ্ধ কোনো কিছুই সাথে রাখা উচিত নয়।

 

৭. ক্লাসে নোট তৈরি করা:

শিক্ষক ক্লাসে যা পড়াচ্ছেন তা খাতায় তুললে ক্লাসে মনোযোগী থাকার বিষয়টি অনেক বেশি সহজ হয়। শিক্ষক ক্লাসে আসলে সাথে সাথে নির্ধারিত বিষয়ের খাতায় তারিখ, বিষয়বস্তুর নাম ও শিক্ষকের নাম লিখবে এবং শিক্ষক বোর্ডে যা লিখেন বা লিখতে বলবেন তা খাতায় লিখবে। ক্লাসে নোট করার অভ্যাসটি একজন শিক্ষার্থীকে বাসায় গিয়ে পড়া মুখস্থ করা এবং একইসাথে মনে রাখার জন্য অনেক বেশি সাহায্য করবে।  শিক্ষক নতুন কোনো শব্দ বা শিখণফলের কী-ওয়ার্ড বললে তা সাথে সাথে খাতায় লিখে রাখবে। শিক্ষকের পড়ানোর বিষয়টি একইসাথে শুনা ও লেখার ফলে মস্তিষ্ক বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেবার চেষ্টা করবে। আর তাই ক্লাস নোট করা অভ্যাসটি এখনি আয়ত্তে নিয়ে আসো।

 

৮. শিক্ষকের শরনাপন্ন হওয়া:

প্রত্যেক শিক্ষকের ক্লাসে পাঠদানের ধরন এবং শিক্ষার্থীর পড়া বুঝার ধরন ভিন্ন হয়ে থাকে। শিক্ষক যেভাবে বুঝাচ্ছেন বা শেখাচ্ছেন সেভাবে বুঝতে সমস্যা হলে ক্লাসে পাঠদানকালে শিক্ষার্থীকে অবশ্যই শিক্ষককে প্রশ্ন করা কিংবা শিক্ষককে পুনরায় বুঝানোর জন্য অনুরোধ করতে পারে। সম্ভব হলে যে বিষয় বুঝতে সমস্যা হচ্ছে, সে বিষয়ে ক্লাসের বাহিরে শিক্ষকের সাথে কথা বলা। পাঠদান বিষয়ে প্রশ্ন করলে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীর উপর কখনো বিরক্ত হন না, বরং খুশি হন এবং পরবর্তীতে শিক্ষার্থীর প্রতি অধিক যত্নবান হন। অনুমতি নিয়ে শ্রেণিশিক্ষক ও বিষয়শিক্ষকের টেলিফোন নম্বর সংগ্রহ রাখা যেতে পারে। তাছাড়া ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করতে সমস্যা দেখা দিলে শিক্ষকের সাথে সরাসরি অথবা অভিভাবক কিংবা ক্লাস প্রতিনিধির মাধ্যমে টেলিফোনে যোগাযোগ করা যেতে পারে। শিক্ষকদের সাথে ক্লাসে সকল শিক্ষার্থীর যোগাযোগ করার জন্য আজকাল অনেকে সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপ ব্যবহার করে থাকেন। শিক্ষকদের সাথে পড়াশোনার বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগের ব্যাপারটি ক্লাসের প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধিতে সহায়ক। কারণ যখন শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীর নিয়মিত যোগাযোগ থাকবে, তখন আলোচ্য বিষয়গুলোর প্রতি শিক্ষার্থীর আলাদা আগ্রহ সৃষ্টি হবে ও মনোযোগ বৃদ্ধি পাবে। আর না বুঝা কোনো বিষয়ে কারো কোনো সহায়তা না পেলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। অনলাইনে সেই সব বিষয়ের বিভিন্ন নোট বা ভিডিও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। এতে করে অজানা বিষয় ও তথ্যের প্রতি শিক্ষার্থীর মনোযোগ বৃদ্ধি পাবে।

লেখক:

মনির আহমেদ

সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ,

 বিএএফ শাহীন কলেজ ঢাকা।

তারিখ: ২৪ মে ২০২৩

 

 

মন্তব্য করুন