সদ্য জন্ম নেয়া একটি শিশুর সময় গড়ানোর সাথে সাথে ভালো ব্যক্তিত্ব কীভাবে তৈরি হয় জানেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন বিশ্ববিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সিগমুন্ড ফ্রয়েড। দীর্ঘসময়ের গবেষণায় তিনি শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনের কিছু অজানা রহস্য খুঁজে পান।
সিগমুন্ড ফ্রয়েড একাধারে ছিলেন একজন অস্ট্রিয় মানসিক রোগ ও স্নায়ুরোগ চিকিৎসক, অপরাধ বিজ্ঞানী এবং মনস্তাত্ত্বিক। ১৮৫৬ সালে জন্ম নেয়া ফ্রয়েড "মনোসমীক্ষণ" (Psychoanalysis) নামের মনোচিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবক। এ কারণে মনঃসমীক্ষণ তত্ত্বের জনক হিসেবেও তিনি পরিচিত।
দীর্ঘ সময়ের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান নিয়ে ফ্রয়েড অসংখ্য বই লিখেছেন। যার মধ্যে অন্যতম ‘দ্য ইগো অ্যান্ড দ্য ইড’। ১৯২৩ সালে প্রকাশিত এ বইতে ফ্রয়েড এমন কিছু চমৎকৃত তথ্য প্রকাশ করেন যা থেকে শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনের অজানা রহস্য সম্পর্কে জানা যায়।
ফ্রয়েড তার বইতে মানুষের আচরণের পেছনে লুকিয়ে থাকা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিশ্লেষণ করেন। একই সাথে মানুষের এসব আচরণ করার পেছনে শিশু বয়সের বেড়ে ওঠার পরিবেশ ও নিয়মনীতিকে দায়ি করেন তিনি।
ফ্রয়েডের মতে, ব্যক্তিত্ব গঠনের ক্ষেত্রে মনের তিনটি অংশ ইড, ইগো এবং সুপার-ইগোর ভূমিকা থাকে। যেমন-
১। ইড- বাংলায় এর অর্থ আদিম সত্তা। এ স্তরে থাকা ব্যক্তি শুধু নিজের ইচ্ছা চরিতার্থ করতে আগ্রহী হয়। কোনো খারাপ দিক বিচার বিবেচনার বুদ্ধি তার থাকে না।
২। সুপার ইগো- বাংলায় এর অর্থ অধিসত্তা। এ স্তর ইডের পুরোপুরি বিপরীত। অর্থাৎ এ স্তরে থাকা ব্যক্তির মধ্যে নীতিনৈতিকতা বোধ বেশি কাজ করে।
৩। ইগো- বাংলায় এর অর্থ অহং সত্তা। এ স্তরে থাকা মানুষ ভালো (সুপার ইগো) আর খারাপের (ইড) মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলে।
ধরুন, আপনার মা ফ্রিজে অতিথিদের জন্য খাবার রেখেছেন এবং খাবারগুলো আপনাকে খেতে নিষেধ করলো। এমন পরিস্থিতিতে ফ্রয়েডের তত্ত্ব বলছে, মানুষের মনে তিনটি ইচ্ছা তৈরি হয়। ১। খেয়ে ফেলি, পরে কী হবে দেখা যাবে। ২। খাওয়া উচিত নয়, এটা অন্যায়। ৩। এমন ভাবে খাবো, মা বুঝতেই পারবেন না।
‘দ্য ইগো এন্ড দ্য ইড’ বইটি অনুসারে আপনার খাবারগুলো খেয়ে ফেলার ইচ্ছা হলে আপনি ইড স্তরে রয়েছেন। আবার আপনার নৈতিকতা যদি খুব বেশি কাজ করে তবে খাবারগুলো আপনি কখনই ছুঁয়েও দেখবেন না। এর মানে আপনি সুপার ইগোর স্তরে রয়েছেন। আর যদি আপনার মনে এমন বুদ্ধি আসে যে খাবারের কিছু অংশ এমন ভাবে খাবেন যে আপনার মা বুঝতেই পারবেন না। তাহলে আপনি ইগো স্তরে রয়েছেন।
ফ্রয়েডের এ তত্ত্ব অনুযায়ী, যে শিশুর মধ্যে ইড স্তর বেশি কাজ করে সে শিশুর ব্যক্তিত্ব কখনই ভালো হয় না। অপরাধ করার প্রবণতা তার মধ্যে বেশি কাজ করে যা শিশুর অপরাধী হওয়ার শঙ্কা বাড়িয়ে তোলে। অন্যদিকে ইড ও সুপার ইগোর মিশেলে তৈরি হওয়া ইগো স্তরের শিশুরা সমাজে সাধারণ মানুষের কাতারে থাকেন। এ স্তরে থাকা মানুষ ভালো ও খারাপ উভয় ধরনের কাজই পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়। আর যেসব শিশুর মধ্যে সুপার ইগো বেশি কাজ করে তারা সমাজে হয়ে ওঠে আদর্শ ব্যক্তি।
ফ্রয়েড মনে করেন, সমাজের একজন আদর্শ ব্যক্তি হয়ে গড়ে উঠতে শিশু বয়সের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য ওরাল, অ্যানাল, ফ্যালিক, ল্যাটেন্সি, এবং জেনিটাল নামের পাঁচটি মনস্তাত্ত্বিক ধাপ ব্যাখ্যা করেন তিনি। ফ্রয়েড মনে করেন, পরিবারের সদস্যদের এ পাঁচটি ধাপই নির্ধারণ করে দেয় শিশুর ভবিষ্যত ব্যক্তিত্ব।
আসুন এক নজরে জেনে নিই, সে পাঁচটি ধাপ সম্পর্কে-
১। ওরাল- বাংলায় এর অর্থ মুখকাম স্তর। জন্মের শুরু থেকে শিশুর ১ বছর বয়স এ স্তরের অন্তর্ভুক্ত। এ বয়সে শিশু মাতৃদুগ্ধ পান করে। যে কারণে তার মধ্যে হাত-মুখ বা যেকোনো কিছু মুখে চোষার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
ফ্রয়েড বলছেন, এ বয়সে শিশুর মাতৃদুগ্ধ পান ও মুখে কোনো কিছু চোষার চাহিদা কম বা বেশি হলে ব্যক্তিত্ব সঠিকভাবে বিকাশে ব্যহত ঘটে। শিশুর মাতৃদুগ্ধ পান ও মুখে কোনো কিছু চোষার চাহিদা পূরণ কম হলে তার মধ্যে বড় হয়ে মানসিক অস্থিরতা তৈরি হতে দেখা যায়। আবার অতিরিক্ত এ অভ্যাস পূরণে বড় হয়ে ধূমপান, মুখ দিয়ে নখ কাটার অভ্যাস কিংবা অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাসসহ ইত্যাদি বদঅভ্যাস গড়ে উঠে।
২। অ্যানাল- বাংলায় এর অর্থ পায়ুকাম স্তর। এ স্তরে শিশুর বয়স ধরা হয়েছে ১ থেকে ৩ বছর। এ বয়সে শিশু শৃঙ্খলতা শিখতে শুরু করে। মলত্যাগ ও মূত্রত্যাগের নিয়ম শেখার পাশাপাশি শিশুকে এ সময় বাড়ির টয়লেট ব্যবহার করতে শেখানো হয়। এ স্তরে বাবা, মা যত শৃঙ্খলভাবে শিশুকে এগুলো শেখাবেন শিশুর মধ্যে তত বেশি আত্ম নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবোধের বিষয়টি গড়ে উঠে।
ফ্রয়েড বলছেন, এ সময় পরিবার থেকে শিশু শৃঙ্খলাবোধের শিক্ষা কম পেলে তার মধ্যে এনাল এক্সপালসিভ (অগোছালো, অনিয়মতান্ত্রিক, অলস, অনিয়ন্ত্রিত জীবনের অভ্যাস) ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। আর যদি এ সময় শিশুকে কঠোর নিয়মতান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলা যায় তবে শিশু ভবিষ্যত জীবনে নিয়মতান্ত্রিক জীবনে চলতে পছন্দ করবে। এ ব্যক্তিত্বকে ফ্রয়েড এনাল রিটেনটিভ ব্যক্তিত্ব বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
৩। ফ্যালিক- বাংলায় এর অর্থ আত্মরতি (লিঙ্গ বিষয়ক) স্তর। এ স্তরে শিশুর বয়স ধরা হয়েছে ৩ থেকে ৬ বছর। এ স্তরে শিশু লিঙ্গগত পার্থক্য বুঝতে শেখে এবং সে বিষয়ে সচেতনতা মূলক শিক্ষা গ্রহণ করে।
ফ্রয়েড মনে করেন, কোনো কারণে পরিবার থেকে এ স্তরে শিশু লিঙ্গগত পার্থক্য ও এ বিষয়ে সচেতনতার শিক্ষা সঠিকভাবে না পেলে শিশুর মধ্যে মারাত্মক নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যেমন অডিপাস কমপ্লেক্স, ইলেক্ট্রা কমপ্লেক্স। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ফ্রয়েড বলেন, মেয়ে শিশুরা এ বয়সে বাবার প্রতি আকৃষ্ট হয় আর মাকে প্রতিদ্বন্দি ভাবতে শুরু করে। আর ছেলে শিশুরা মার প্রতি আকৃষ্ট হয় আর বাবাকে প্রতিদ্বন্দ্বি ভাবতে শুরু করে। এ কারণে ছেলে শিশুরা পরিণত পুরুষদের আচরণ নকল করতে শুরু করে। আবার মেয়ে শিশুরা পরিণত নারীদের আচরণ নকল করতে শুরু করে।
পরিবার থেকে এ স্তরে শিশুর সঠিক শিক্ষা ও বিকাশের অভাব হলে শিশুর মধ্যে চারিত্রিক সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। যা সারাজীবনে জটিলতা তৈরি করতে কাজ করে।
৪। ল্যাটেন্সি- বাংলায় এর অর্থ সুপ্তিকাল (অবসন্নতা স্তর)। এ স্তরে শিশুর বয়স ৬ থেকে ১২ বছর। এ বয়সে শিশু পরিবারের বাইরে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার শিক্ষা পেতে শুরু করে। এবং কাজে দক্ষতা অর্জনের ইচ্ছা তৈরি হতে শুরু করে।
ফ্রয়েড বলছেন, ১ম স্তর থেকে তৃতীয় স্তরে শিশুর শিক্ষা ও বিকাশ সঠিকভাবে হলে চতুর্থ স্তরে শিশুর মধ্যে যৌন চিন্তা দূর হতে শুরু করে। শিশু সময় ব্যয় করতে শুরু করে নতুন কিছু শিখতে। নতুন তথ্য জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। পড়াশুনায় মনোযোগী হওয়ার অভ্যাস স্পষ্ট হতে শুরু করে। তাই পরিবারের উচিত এ স্তরে শিশুকে চারপাশের পরিবেশ, মহাকাশ ইত্যাদি বিষয়ে শিশুকে জানানো। এতে শিশুর চিন্তাশক্তি সুষ্ঠু বিকাশের সুযোগ পায়।
কোনো কারণে পরিবার থেকে এ স্তরে প্রয়োজনীয় শিক্ষা না পেলে শিশুর মধ্যে সামাজিক অদক্ষতা দেখা দেয়। যা ভবিষ্যতে শিশুর ক্যারিয়ার ও আত্মবিশ্বাস তৈরিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
৫। জেনিটাল- বাংলায় এর অর্থ যৌন স্তর। এ স্তরে শিশুর বয়স ধরা হয়েছে বয়ঃসন্ধিকাল থেকে পূর্ণবয়স্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত। এ সময় শিশুর অন্যের প্রতি ভালোবাসা বিকাশ লাভ করে এবং যৌন যন্ত্রের পূর্ণতার কারণে স্বাভাবিক যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে ইচ্ছা প্রকাশ পেতে শুরু করে।
কোনো কারণে শিশুকে প্রথম চার স্তরে সুপার ইগোর শিক্ষা পরিবার দিতে ব্যর্থ হলে শিশুর মধ্যে ইড বা ইগোর বিকাশ স্পষ্ট হতে শুরু করে। এতে ব্যক্তিত্ব গঠনের সর্বশেষ স্তর অর্থাৎ জেনিটাল স্তরে শিশুরা অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক, স্বার্থপর আচরণ কিংবা যেকোনো অপ্রীতিকর কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে।
ফ্রয়েড তার ‘দ্য ইগো এন্ড দ্য ইড’ বইয়ের বিভিন্ন তত্ত্বে শিশুর বেড়ে ওঠার পরিবেশ ও পরিবারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ তিনি মনে করেন, শিশু বয়সের অভিজ্ঞতাগুলোই সারাজীবনের ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা রাখে।
তাই শিশুর ভালো ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য পরিবারের সদস্য হিসেবে আপনার করণীয় কী তা ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনুসারে তৈরি করুন এবং শিশুর উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিশ্চিত করুন।
১৮
২৯ মন্তব্য