Loading..

ব্লগ

রিসেট

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ১০:০৭ অপরাহ্ণ

?♻️?বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদা

বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদা ১৯০০ সালের ১লা ডিসেম্বর অবিভক্ত ভারতের বীরভূম জেলার মাড়গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯১৮ সালে কলকাতার এক মাদ্রাসা থেকে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। ছয় বছর পরে, ১৯২৫ সালে রসায়নে প্রথম স্থান অধিকার করে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এমএসসি পাস করেন তিনি। ভালো ফলাফল করায় রাষ্ট্রীয় বৃত্তি নিয়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করেননি তিনি।


বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ছাত্র ছিলেন ড. মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদা। এজন্য বিলেতে ডিএসসি (ডক্টরেট অব সায়েন্স) করার সময় তাঁর শিক্ষক কে এফ থর্প তাঁকে অপছন্দ করতে লাগলেন। ফলে নিজে নিজেই তিনটি থিসিস লিখে জমা দিতে দিয়েছিলেন তিনি। কার্বোহাইড্রেটের রিং চেইন টটোমারিজম নিয়ে কাজ করছিলেন তিনি। ১৯২৯ সালে জৈব রসায়নে ডিএসসি ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন তিনি।


ডিএসসি (ডক্টরেট অব সায়েন্স) ডিগ্রিধারী হওয়া সত্ত্বেও প্রায় দুই বছর বেকার থাকতে হয়েছিল ড. মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদাকে। ১৯৩১ সালে ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেলে প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়নের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। পাঁচ বছর কাজ করার পর ১৯৩৬ সালে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে পদোন্নতি পান। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি মোট দুইবার কলেজের প্রিন্সিপাল হয়েছিলেন। ১৯৪২ সালে ইসলামিয়া কলেজ এবং ১৯৪৬ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন তিনি।


১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসে সরকারের জনশিক্ষা দপ্তরের পরিচালক পদে নিযুক্ত হন। ১৯৫০ সালে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ প্রাপ্তির পর পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান তিনি। কিন্তু তিনি বাঙালি হওয়ায় পশ্চিম পাকিস্তানিদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিলেন। এমনকি রাতে তাঁর বাড়িতে ইট-পাটকেল পর্যন্ত নিক্ষেপ করা হতো বলেও শোনা যায়। কিন্তু, তাঁর যোগ্যতা ও মেধাকে পাকিস্তানিরা উপেক্ষা করতে পারেনি। তাই, ১৯৫৩ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে তাঁকে পাকিস্তানের বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগারের পূর্বাঞ্চলীয় শাখার চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এই প্রতিষ্ঠানেরই উত্তরসূরি আজকের বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)।


স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৬শে জুলাই ড. মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদাকে প্রধান করে ‘ড. কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন’ গঠন করা হয়। প্রায় একমাস ভারত ঘুরে সেখানকার শিক্ষা সম্পর্কে সরেজমিনে জেনে জনশিক্ষা বিষয়ক অভিজ্ঞতা, মতামতসহ অন্যান্য বিষয়ের সংমিশ্রণ, সংযোজন ও সংশ্লেষণের পর ১৯৭৩ সালের ৮ই জুন ৪৫০ পাতার একটি রিপোর্ট সরকারের কাছে পেশ করেন তিনি। এটিই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা রিপোর্ট যাতে শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় অন্তত ২৫ শতাংশে উন্নীত করা, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন, শিক্ষার সর্বস্তরে বাংলা প্রবর্তন, বিজ্ঞান ও কৃষি শিক্ষাকে বিশেষ স্থান দেয়া, কারিগরি ও প্রকৌশল শিক্ষাকে সম্প্রসারণ করা, জনশক্তি কমিশন গঠন, শিক্ষক হিসেবে যোগ্যতমের নিয়োগ এবং তাদের বেতন কাঠামোকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু, দুর্ভাগ্যজনকভাবে অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অভাব এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে এমন যুগান্তকারী শিক্ষা রিপোর্ট বাস্তবায়িত হওয়ার সুযোগ মেলেনি। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবেও কর্মরত ছিলেন।


তাঁর মোট ১৮ টি আবিষ্কারের পেটেন্ট রয়েছে। তিনি তেলাকুচা থেকে ১২টি জৈব রাসায়নিক উপাদান নিষ্কাশন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এছাড়াও তুলসী, বিষকাঁঠালি, গুলঞ্চ, কালমেঘ ইত্যাদি উদ্ভিদেরও জৈব উপাদান নিষ্কাশন করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। পাটকাঠি থেকে মন্ড এবং মন্ড থেকে কাগজ তৈরির ফর্মুলা আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। পাটকাঠি থেকে বহুল ব্যবহৃত পারটেক্স বা পার্টিক্যাল বোর্ড তৈরির ফর্মুলার আবিষ্কার করেন তিনি। পাট, লবণ, কাঠ, কয়লা, মৃত্তিকা এবং অন্যান্য খনিজ পদার্থ নিয়েও গবেষণা করেছেন তিনি। রস ও গুড় থেকে মল্ট ভিনেগার তৈরির ফর্মুলাও তিনিই আবিষ্কার করেছেন।


গবেষক ড. মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদার ১০২ টি গবেষণামূলক প্রবন্ধ রয়েছে। ১৯২৬ সালে লন্ডনের জার্নাল অব কেমিক্যাল সোসাইটিতে প্রথম তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ ছাপা হয়। ১৯৩০-১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ইন্ডিয়ান জার্নাল অব কেমিস্ট্রিতে মোট ১৪টি প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল তাঁর। লন্ডনের বিখ্যাত নেচার পত্রিকাতেও তাঁর দুটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল।


বেশ কিছু বইও রচনা করেছেন ড. মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদা। বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘যুদ্ধোত্তর বাংলার কৃষি ও শিল্প’ নামক বইটি। ‘বিজ্ঞানের সরস কাহিনী’ ও ‘বিজ্ঞানের বিচিত্র কাহিনী’ নামের দুটি বিজ্ঞান বইও রয়েছে তাঁর। জৈব রসায়নের চার খন্ডের বইও রচনা করেছেন তিনি। ‘পুরোগামী বিজ্ঞান’ (১৯৬৩) ও ‘বিজ্ঞানের জয়যাত্রা’ (১৯৭২) নামের দুটি সাময়িকীও প্রকাশ করেছেন তিনি।


কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বিজ্ঞানী, গবেষক ও লেখক ড. কুদরত-এ-খুদার ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা। উল্লেখযোগ্য হলো, একুশে পদক (১৯৭৬), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৮৪), তঘমা-ই-পাকিস্তান, সেতারা-ই-ইমতিয়াজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে সম্মান সূচক ডক্টরেট ডিগ্রি।


মেধাবী এবং প্রতিথযশা বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ কুদরত-এ-খুদা ১৯৭৭ সালের ৩রা নভেম্বর ৭৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

মন্তব্য করুন