Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ মার্চ, ২০২৫ ১০:৩৩ অপরাহ্ণ

সহকারী শিক্ষক: শিক্ষকতার পথে অবহেলার দগদগে ক্ষত।

শিক্ষকতা পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পেশাগুলোর একটি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই পেশার ভেতরেও একটি অদৃশ্য বিভাজন কাজ করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে "সহকারী শিক্ষক" নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ থাকলেও, তারা কখনোই "শিক্ষক" হয়ে ওঠেন না। যেন সহকারী শিক্ষকরা চিরকাল শিক্ষকতার একটি ছায়ায় আটকে থাকেন। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা নীতিগত অবহেলা এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা।

সহকারী শিক্ষকদের দুঃখের কারণ: বাস্তব চিত্র

১. পদবীর শিকল:

সহকারী শিক্ষক শব্দের ‘সহকারী’ অংশটি যেন তাদের গুরুত্বকে অবমূল্যায়িত করে। একজন সহকারী শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও "শিক্ষক" পদবীটি তাদের কাছে অধরা থেকে যায়। অথচ তাদের হাত দিয়েই শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের ভিত নির্মিত হয়।

২. প্রমোশনের অনিশ্চয়তা:

সহকারী শিক্ষকদের জন্য পদোন্নতির সুযোগ প্রায় অনুপস্থিত। প্রধান শিক্ষক বা সহকারী প্রধান শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নও অনেকের কাছে অধরা থেকে যায়। একটি নির্দিষ্ট সময় পর তারা দেখতে পান, তাদের সহকর্মীরা এগিয়ে গেছেন কিন্তু তারা রয়ে গেছেন একই জায়গায়। দাখিল মাদরাসা এগুলোতে তো সহকারী শিক্ষকরা কখনো সহকারী প্রধান বা প্রধান শিক্ষক হতেই পারেন না।

৩. প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক অবজ্ঞা:

অনেক বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কাঠামো এমনভাবে সাজানো, যেখানে সহকারী শিক্ষকরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে একেবারেই বাইরে থাকেন। একই সঙ্গে সামাজিকভাবে তারা সম্মান পান কম। কারণ প্রধান শিক্ষক বা সিনিয়র শিক্ষকদের তুলনায় তাদের অবদানকে মূল্যায়ন করার দৃষ্টিভঙ্গি দুর্বল।

এই সমস্যার প্রভাব: একটি সুদূরপ্রসারী ক্ষতি

এই সমস্যার ফল শুধু সহকারী শিক্ষকদের উপর নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার উপর পড়ে। হতাশা এবং অবমূল্যায়নের কারণে সহকারী শিক্ষকরা তাদের কাজের প্রতি মনোযোগ হারান। এর ফলাফল সরাসরি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানে প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি জাতির জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করে।

সম্ভাব্য সমাধান: দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতির পরিবর্তন প্রয়োজন

১. পদবীর বিভাজন দূর করা:

সহকারী শিক্ষক এবং শিক্ষক পদবীর মধ্যে পার্থক্য ঘুচিয়ে "শিক্ষক" শব্দটি ব্যবহার করা উচিত। এতে সম্মানের অনুভূতি বাড়বে এবং তাদের অবদানকে যথাযথ মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

২. পদোন্নতির জন্য স্বচ্ছ নীতি:

জাতীয় পর্যায়ে একটি সুনির্দিষ্ট এবং স্বচ্ছ প্রমোশন পদ্ধতি চালু করতে হবে। অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং শিক্ষাদানের মানের ভিত্তিতে পদোন্নতির সুযোগ তৈরি করা হলে, সহকারী শিক্ষকদের হতাশা দূর হবে।

৩. নিয়মিত প্রশিক্ষণ:

সহকারী শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতির সাথে পরিচয় করানো প্রয়োজন। এতে তারা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন এবং শিক্ষাদানের মানও বৃদ্ধি পাবে।

৪. প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কার:

সহকারী শিক্ষকদের স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এটি তাদের কাজের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং গুরুত্ব বাড়াবে।

সহকারী শিক্ষক থেকে শিক্ষক হওয়ার পথ খুলে দিন

সহকারী শিক্ষকরা নিছক সহায়ক ভূমিকা পালন করেন না। তারা শিক্ষার মূল ভিত্তি গড়ে তোলেন। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারীদের প্রতি অবহেলা শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাদের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রশাসনিক এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা জরুরি।

শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির জন্য সহকারী শিক্ষকদের প্রতি সম্মান ও সুযোগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কারণ তাদের হাত ধরেই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি আলোকিত পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে শিখবে।

লেখক
মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান
সহকারী শিক্ষক (কৃষি)
তানজিম আশরাফ সাদী দাখিল মাদরাসা
দক্ষিণ নানশ্রী, করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ। 

মন্তব্য করুন

ব্লগ