Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ মার্চ, ২০২৫ ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ

স্যালুট তোমায় হে নারী।

১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন এসএসসি পরীক্ষার্থী। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে একদিন রাজা'কা'রে'রা তাদের  বাড়িতে বাবা হরিপদ বৈদ্যর কাছে চিঠি দিল, “আপনার দুটো মেয়ে আছে, ওদেরকে পা'কবা'হিনীর কাছে তুলে দিতে হবে অন্যথায় পাঁচ লক্ষ টাকা দিতে হবে”। দুই মেয়ে আশালতা ও তাঁর বোনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার হু'মকি পেয়ে হরিপদ বাবু ও স্ত্রী সরলাময়ী ভারতে চলে যাওয়ার চিন্তা করতে থাকেন। দিনও ঠিক হলো। মঙ্গলবার চলে যাবেন তার ঠিক এক দিন আগে সোমবার রাতে এই ঘটনা জেনে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার হেমায়েত বা'হি'নীর প্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত উদ্দিন এলেন হরিপদ বৈদ্যের বাড়িতে। হরিপদ বৈদ্যকে বললেন “মাস্টার বাবু ছেলে হোক বা মেয়ে হোক একজনকে মুক্তিযু'দ্ধের জন্য আমাকে দিতে হবে”। পিছনে থেকে আশালতা বলে উঠলো, বাবা আমি যাবো যু'দ্ধে। হেমায়েত উদ্দিন বললেন এইত পেয়ে গেছি। মেয়ের আগ্রহ দেখে বাবাও আর আপত্তি করলেন না। শুধু বললেন, ‘ও নিজে থেকে যু'দ্ধে যেতে চাইলে আমি অবশ্যই বাধা দেব না, দেশের জন্য ওকে আমি উৎসর্গ করলাম।’

আশালতাকে নিজের মাতৃভূমিতে থেকে দেশমাতৃকা তথা মা বোনের সম্মান রক্ষার্থে মুক্তিযু'দ্ধে যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করলেন হেমায়েত উদ্দিন। আশালতা উদ্বুদ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন মুক্তিযু'দ্ধে যোগ দিবেন। হেমায়েত উদ্দিন খুশি হলেন। আশালতাকে কাছে নিয়ে হ্যান্ডশেক করলেন এবং বললেন, “তুই কালকে সকাল বেলা ৩০-৪০/৪০-৫০ জন মেয়ে গুছিয়ে লেবুবাড়ি স্কুলে আসবি, পারবি?” আশালতা জানালেন পারবো।

.

হেমায়েত উদ্দিন মুক্তিযু'দ্ধে অংশ নিতে বলেছেন একথা শুনে অন্যরা সবাই সঙ্গে সঙ্গে স্বেচ্ছায় রাজি হলো। ছোট দুই বোন এবং ভাই হরগোবিন্দসহ মোট ৪৫ জন সহপাঠী ও প্রতিবেশী মেয়ে নিয়ে তিনি লাটেঙ্গা লেবুবাড়ী সরকারি প্রাথমিক স্কুলে উপস্থিত হলেন।

.

আশালতা বৈদ্যের জন্ম ১৯৫৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায়। ১৬ বছর বয়সী আশালতা ৮ ও ৯ নং সেক্টরে কোটালীপাড়া সীমানা সাব সেক্টর কমান্ডার হেমায়েত  মহিলা বাহিনীতে যোগ দেন। সেখানে ৩৫০ জন নারী মুক্তিযোদ্ধা বা'হি'নীর একমাত্র ক'মা'ন্ডার ছিলেন আশালতা বৈদ্য।

.

নেতৃত্ব দিয়েছেন ৪৫ জনের স'শস্ত্র নারী গে'রিলা দলকে। তিনি তাদের নিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। হেমায়েত বাহিনীর তত্ত্বাবধানে এই প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয় বরিশালের হেরেকান্দি হাইস্কুলে ও লেবুর বাড়ি প্রাইমারি স্কুলে। স্বল্পসময়ের প্রশিক্ষণে আশালতা বৈদ্য অ''স্ত্র পরিচালনা এবং যু''দ্ধকৌশলের উপর আশ্চর্যজনক পারদর্শিতা লাভ করেন। অ''স্ত্র প্রশিক্ষণে সেখানে ফাস্ট হলেন। 

.

এরপর অংশগ্রহণ করলেন বেশ কয়েকটা যু'দ্ধে যার ভেতর কলাবাড়ি যু'দ্ধ, হরিনাহাটি যু'দ্ধ , রামশীল পয়সার হাট যু'দ্ধ অন্যতম।

.

আশালতার সাহসিকতায় ক্যাম্পের ২৪ জন নারীকে নিয়ে হেমায়েত উদ্দিনের আদেশে আলাদা একটা নারী কমা'ন্ডো তৈরি করা হয়েছিল, যার নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছিল তাঁকে।  যাঁদের কাজ ছিল শ'ত্রুর অবস্থান রে'কি করা, ছদ্মবেশে গে'রিলা আ'ক্রমণ করা এবং সু'ই'সা'ইড স্কো'য়াড হিসেবে কাজ করা। আশালতা সহ তার কমা'ন্ডের সকলেই সু'ই'সা'ইড স্কো'য়াড হিসেবে কাজ করার জন্য ছিলেন সদা প্রস্তুত।

.

রামশীল নদী পাড়ে একদিন লঞ্চে করে  রা'জা'কা'রেরা পা'কি'স্তানি বা'হি'নীকে সাথে নিয়ে আসে। সেখানে   আশালতা এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের ৩ ঘণ্টার ও বেশি সময় যু'দ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের জয় হয়েছিল সেদিন।

.

গোপালগঞ্জে ছোটোখাটো অনেক গেরিলা যু'দ্ধ ছাড়াও ২২টি বড় যু'দ্ধে অংশগ্রহণ করেন আশালতা বৈদ্য।  শুধু প্রত্যক্ষ যু'দ্ধে অংশগ্রহণ করেননি, আ'হত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছেন নিজ হাতে। এই অপ্রতিরোধ্য নারী যো'দ্ধা সেদিন যু'দ্ধ'কেই ধ্যানজ্ঞান করেছিলেন।

.

স্বাধীনতার পর তাদের টিম শরণার্থীদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতেন।

.

স্বাধীনদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে তিনি উচ্চশিক্ষা শেষ  করেন। ১৯৮০-এর দশকে নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে গড়ে তোলেন "সূর্যমুখী সংস্থা"। বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দু'র্যোগেও তিনি মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আশালতা বৈদ্য তার বৈচিত্র্যময় জীবনের সেবামূলক কাজের জন্য ২০০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বাছাই কমিটিতে মনোয়ন পেয়েছিলেন। যদিও একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি কোনো রাষ্ট্রীয় উপাধি পাননি।

তেমন কেউ চেনেও না।


কার্টেসি: গিরিধর দে/ বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র


মন্তব্য করুন

ব্লগ