সহকারী শিক্ষক
৩০ এপ্রিল, ২০২৫ ১০:১০ অপরাহ্ণ
মে দিবস: শ্রমিকের অধিকার ও বাস্তবতার মাঝে ব্যবধান
১ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় মে দিবস—শ্রমিক শ্রেণির আত্মত্যাগ, অধিকার অর্জন এবং মর্যাদার দাবিতে একটি ঐতিহাসিক দিন। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের রক্তদানের মধ্য দিয়ে যে সংগ্রামের সূচনা, আজ তা বিশ্বের প্রায় সব দেশের জাতীয় ক্যালেন্ডারে গৌরবের সঙ্গে চিহ্নিত। বাংলাদেশেও মে দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়, হয় বাণীপ্রদান, র্যালি, আলোচনা সভা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই আনুষ্ঠানিকতা কি শ্রমিকের প্রকৃত জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে?
২০২৫ সালের মে দিবসে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের অবস্থা বিশ্লেষণ করলে চিত্রটা মিশ্র। পোশাক খাত থেকে শুরু করে নির্মাণ, কৃষি, পরিবহন, বেসরকারি কারখানা, হোটেল বা গৃহস্থালি খাতে কর্মরত কোটি শ্রমিকের অধিকাংশ এখনও ন্যূনতম মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা সংগঠন করার স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত।
বিশেষ করে গার্মেন্টস খাত, যেটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস, সেখানে হাজার হাজার শ্রমিক ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করেও ন্যায্য মজুরি পান না। ২০২৪ সালে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো হলেও তা ছিল বাস্তব ব্যয় ও দ্রব্যমূল্যের তুলনায় অপ্রতুল। তদুপরি, আন্দোলনের জেরে অনেক শ্রমিক চাকরি হারান, হুমকি পান বা কালো তালিকাভুক্ত হন। শ্রমিকের দাবিকে অনেক সময় রাষ্ট্র বা মালিকপক্ষ ‘নাশকতা’ বা ‘অপপ্রচার’ হিসেবে চিহ্নিত করে।
নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালক, পরিবহন শ্রমিক কিংবা হোটেল-ক্যাফেতে কাজ করা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা তো আরও অনিরাপদ। তারা কোনো ট্রেড ইউনিয়নের আওতায় নেই, শ্রম আইন তাদের কণ্ঠে পৌঁছায় না, রোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা নেই, দুর্ঘটনায় পড়লে ক্ষতিপূরণ নেই, পেনশন তো দূরের কথা—নুন আনতে পানতা ফুরায়।
তবে বাস্তবতা শুধু হতাশার নয়। ২০২৫ সালের শুরুতে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেছে—কারখানায় শ্রমিকদের জন্য দিবা যত্নকেন্দ্র চালু, শ্রমিকদের ব্যাংক একাউন্টে বেতন দেওয়া বাধ্যতামূলক করা, কিছু কারখানায় ফ্রিঅক্সিজেন ক্লিনিক বা হেলথ ইনস্যুরেন্স চালু করার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কিন্তু এগুলো এখনও ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়।
বর্তমানে বিশ্বে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, অটোমেশন, গিগ ইকোনমির মতো প্রযুক্তিগত পরিবর্তন শ্রমিকদের জীবনকে নতুন বাস্তবতায় নিয়ে যাচ্ছে। ডেলিভারি রাইডার, ফুড কুরিয়ার, ফ্রিল্যান্সার—এই আধুনিক শ্রমিকদের জন্য এখনও কোনো স্পষ্ট শ্রমনীতি নেই। তারা শ্রম দিচ্ছেন, কিন্তু ‘কর্মী’ হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছেন না। তাই মে দিবসের উপলক্ষে এখন শুধু ইতিহাস স্মরণ নয়, শ্রমিকের পরিবর্তিত ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
বাংলাদেশের সংবিধানে ২০ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে—“কর্মই মানুষের জীবনের প্রধান উপায়।” সুতরাং একজন মানুষের কর্ম-পরিবেশ, অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মান রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। এ দায় শুধু সরকারের নয়, মালিকদেরও; এবং নাগরিক সমাজকেও হতে হবে সচেতন।
মে দিবস যেন শুধু লাল পতাকা ও ফুল দিয়ে সীমাবদ্ধ না থাকে—শ্রমিকের মুখে হাসি, সন্তানদের স্কুলে পাঠানো, অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়া ও বার্ধক্যে অবসরভাতা পাওয়ার মধ্যেই প্রকৃত মে দিবসের সম্মান নিহিত। এই মর্যাদা নিশ্চিত করতে না পারলে মে দিবস শুধুই ইতিহাসের গৌরব হয়ে থাকবে, বর্তমানের বাস্তবতায় নয়।
১
১ মন্তব্য