Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ এপ্রিল, ২০২৫ ১০:১১ অপরাহ্ণ

কাশ্মীর সংকট: ইতিহাসের উত্তরাধিকার ও বর্তমান উত্তেজনা

কাশ্মীর—একটি ভূখণ্ড, যা ইতিহাস, রাজনীতি, ধর্ম ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশের চিরন্তন সংঘাতে আবদ্ধ। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্ত হওয়ার সময় কাশ্মীর ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য, যার শাসক হরি সিং ছিলেন হিন্দু, কিন্তু অধিকাংশ জনগণ ছিলেন মুসলমান। পাকিস্তানের অনুপ্রবেশ ও বিদ্রোহ দমনের জন্য হরি সিং ভারতীয় সেনা সহায়তা চাইলে তিনি ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’ স্বাক্ষর করে কাশ্মীরকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেন। এরপর থেকেই শুরু হয় ভারত-পাকিস্তানের সংঘাতের এক অনন্ত অধ্যায়, যার রেশ আজও উপমহাদেশের রাজনীতি, কূটনীতি ও নিরাপত্তায় প্রবলভাবে বিদ্যমান।

এই অমীমাংসিত বিরোধের সবচেয়ে বড় শিকার কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ। ইতিহাসের পরতে পরতে রক্ত, প্রতিশোধ, সেনা পাহারা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিহ্ন। ১৯৪৮, ১৯৬৫ ও ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের প্রতিটি ঘটনায় কাশ্মীর ছিল মূল কেন্দ্রবিন্দু। তবুও রাজনৈতিক সমাধান আজও অধরা।

২০১৯ সালে ভারতের বিজেপি সরকার সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে নেয়। অঞ্চলটিকে কেন্দ্রশাসিত এলাকায় রূপান্তর এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ কাশ্মীরিদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের ওপর বড় আঘাত হিসেবে ধরা পড়ে।

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে কাশ্মীর আবারও শিরোনামে। ২২ এপ্রিল, ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পর্যটন শহর পাহালগামে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হন। ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ নামে একটি গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করে, যেটি পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তৈয়বার ঘনিষ্ঠ বলে দাবি করেছে ভারত। এর পরপরই ভারত ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটে।

ভারত পাকিস্তানি কূটনীতিকদের বহিষ্কার করে, সীমান্ত বন্ধ করে দেয়, ভিসা স্থগিত করে। পাল্টা পদক্ষেপে পাকিস্তানও একই পদক্ষেপ গ্রহণ করে, এবং ইন্দাস পানি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। পাশাপাশি, উভয় দেশ সীমান্তে সেনা মোতায়েন বাড়ায় এবং গোলাগুলির ঘটনা বেড়ে যায়।

এই সংঘাত শুধু দুই রাষ্ট্রের নয়—একটি পুরো জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও জীবনের প্রশ্ন। কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত আতঙ্ক, সেনা তল্লাশি, ইন্টারনেট বন্ধ, গুম ও গ্রেপ্তারের মধ্যে বসবাস করছে। এপ্রিলের হামলার পর ভারতীয় সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে প্রায় ২,০০০ মানুষকে আটক করেছে এবং একাধিক ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে।

এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে—এই সংকটের শেষ কোথায়? সামরিক উত্তেজনা কিংবা কূটনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঝে কি কাশ্মীরিদের মানবাধিকার ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা কখনো বিবেচনায় আসে?

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিপ্রিয় দেশগুলোর দায়িত্ব এই সংকটে একটি মানবিক ও বাস্তবমুখী সমাধান খুঁজে বের করার জন্য কূটনৈতিক চেষ্টা চালানো। জাতিসংঘ, ওআইসি কিংবা সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোকেও ভূমিকা রাখতে হবে। কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আলোচনার সদিচ্ছা এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার ওপর।

কাশ্মীর সংকটের সমাধান শুধু সীমান্ত চুক্তিতে নয়—এর ভিত্তি হতে হবে ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও মানবাধিকারের স্বীকৃতিতে। সময় এসেছে কাশ্মীরকে আর ‘বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ড’ নয়, বরং মানুষের ভূখণ্ড হিসেবে দেখা, যেখানে শান্তি থাকবে, উন্নয়ন থাকবে, থাকবে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার।

মন্তব্য করুন

ব্লগ