Loading..

ব্লগ

রিসেট

১০ মে, ২০২৫ ০২:৫৮ অপরাহ্ণ

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা ইতিহাস

“রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা ইতিহাস”  

        রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্বত্য অঞ্চল, যা চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকার অন্তর্গত। এর ইতিহাস বহু প্রাচীন এবং বহুমাত্রিক, যা প্রাকঐতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে আসা পর্যন্ত বিস্তৃত।

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাস:

        রাঙ্গামাটি অঞ্চলটি আদিকাল থেকেই বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি হিসেবে পরিচিত। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, লুসাই, ম্রোসহ বহু জাতিগোষ্ঠী এ এলাকায় বসবাস করে আসছে। এই অঞ্চল একসময় আরাকান রাজ্যের অংশ ছিল এবং পরে এটি ত্রিপুরা ও অন্যান্য পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে যুক্ত ছিল।

        চাকমা রাজারা ১৬শ শতক থেকে এই অঞ্চলে শাসন শুরু করেন। তারা প্রথমে আরাকান থেকে এসে এই এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। চাকমা সম্প্রদায়ের রাজা শ্রীমন্ত রাজা ও তার বংশধরগণ একসময় রাঙ্গামাটি অঞ্চলে ক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেন। মোগল ও ব্রিটিশদের সঙ্গে এদের রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল।

ব্রিটিশ শাসনকাল:

       ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ সরকার চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলকে প্রশাসনিকভাবে স্বতন্ত্র ইউনিট হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯০০ সালে 'Chittagong Hill Tracts Manual' (চট্টগ্রাম পার্বত্য জেলা রেগুলেশন ১৯০০) প্রণয়ন করা হয়, যা এই অঞ্চলের প্রশাসনিক ও ভূমি ব্যবস্থাপনা সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। এই আইন আদিবাসীদের ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি দেয় এবং বাইরের জনগণের ভূমি মালিকানা সীমিত করে।

পাকিস্তান আমল:

       ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পরে রাঙ্গামাটি পাকিস্তানের (অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের) অংশ হয়। পাকিস্তান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে, যার মধ্যে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ (১৯৬০-৬২) এই অঞ্চলের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এতে প্রায় ৫৪ হাজার একর ভূমি পানিতে নিমজ্জিত হয় এবং প্রায় ১৮ হাজার পরিবার (মূলত চাকমা) গৃহহীন হয়ে পড়ে। তাদের অনেককে ভারতে ও মিয়ানমারে উদ্বাস্তু হতে হয়।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা ও পরবর্তী সময়:

      ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে নতুন রাজনৈতিক টানাপড়েন শুরু হয়। আদিবাসী জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে চাকমা সম্প্রদায়, তাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে। এর ফলে ১৯৭০-এর দশকের শেষ থেকে শুরু হয়ে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চলে সশস্ত্র সংঘাত চলে।

পার্বত্য শান্তি চুক্তি:

      ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (PCJSS) মধ্যে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের অবসান ঘটে এবং রাঙ্গামাটি সহ তিন পার্বত্য জেলায় আঞ্চলিক পরিষদ গঠনসহ অনেক প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

       রাঙ্গামাটি এখন একটি পর্যটন, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের অনন্য কেন্দ্র। এটি বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণের ইতিহাস, সংগ্রাম ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

       রাঙ্গামাটি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত, যেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়, লেক এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বিশেষ করে শীতকাল ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পর্যটকদের ভিড় বেশি দেখা যায় ।

 

 

রাঙ্গামাটির প্রধান দর্শনীয় স্থানসমূহ:

  • কাপ্তাই লেক: বাংলাদেশের বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ, যা কর্ণফুলী নদীর উপর বাঁধ নির্মাণের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। এটি নৌভ্রমণ, মাছ ধরা এবং প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগের জন্য জনপ্রিয়।

  • শুভলং ঝর্ণা: বরকল উপজেলায় অবস্থিত এই ঝর্ণাটি কাপ্তাই লেকের উপর পড়ে, যা নৌকাযোগে পৌঁছানো যায়। বর্ষাকালে এর সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায় ।

  • ঝুলন্ত সেতু: ৩৩৫ ফুট দৈর্ঘ্যের এই সেতুটি রাঙ্গামাটির অন্যতম আকর্ষণ। এটি কাপ্তাই লেকের উপর নির্মিত এবং পর্যটকদের জন্য একটি জনপ্রিয় স্থান ।

  • সাজেক ভ্যালি: বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত এই ভ্যালিটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৮০০ ফুট উচ্চতায়। এটি মেঘ, পাহাড় এবং সবুজ প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত ।

  • কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান: ১৩,৫০০ একর জমির উপর বিস্তৃত এই উদ্যানটি বনজ সম্পদ এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত।

  • রাজবন বিহার ও চাকমা রাজবাড়ী: এই ঐতিহাসিক স্থানগুলো রাঙ্গামাটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে।

আবাসন ও রিসোর্ট:

 রাঙ্গামাটি শহরে ৫৬টি আবাসিক হোটেল এবং ১৭টি ইকো রিসোর্ট রয়েছে, যেখানে প্রায় ১০,০০০ পর্যটক রাত্রিযাপন করতে পারেন। সাজেক ভ্যালিতে ১২টি রিসোর্ট ও কটেজে প্রায় ৫,০০০ পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে ।

যাতায়াত ব্যবস্থা:

  • ঢাকা থেকে: গাবতলী, আরামবাগ বা কমলাপুর থেকে সরাসরি বাসে রাঙ্গামাটি যাওয়া যায়। নন-এসি বাসের ভাড়া প্রায় ৬২০ টাকা এবং এসি বাসের ভাড়া প্রায় ১,৪০০ টাকা। সময় লাগে প্রায় ৭-৮ ঘণ্টা ।

  • চট্টগ্রাম থেকে: অক্সিজেন বাস টার্মিনাল থেকে পাহাড়িকা বা লোকাল বাসে রাঙ্গামাটি যাওয়া যায়। ভাড়া প্রায় ৮৫-১১০ টাকা এবং সময় লাগে ২.৫-৩.৫ ঘণ্টা ।

খাবার ও স্থানীয় রেস্তোরাঁ:

     রাঙ্গামাটিতে স্থানীয় খাবারের জন্য বনরূপা এলাকার কুটুমবাড়ি, হোটেল মক্কা এবং কাঠালতলীর হোটেল হিল জামান জনপ্রিয়। এছাড়াও, ব্যাম্বু চিকেন এবং কচি বাঁশের তরকারি স্থানীয় বিশেষ খাবার হিসেবে পরিচিত ।

ভ্রমণের উপযুক্ত সময়:

     শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) রাঙ্গামাটি ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এই সময়ে আবহাওয়া শীতল ও মনোরম থাকে, যা পাহাড়ি ভ্রমণের জন্য আদর্শ ।

                                                                       

                                                                            রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা ইতিহাস-চলমান পর্ব-১

 

মন্তব্য করুন