সহকারী শিক্ষক
১১ মে, ২০২৫ ০৯:০৯ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
শিশুদেরমোবাইলব্যবহারেরক্ষতিকরদিক ও আমাদের করণীয়
ভূমিকা: বর্তমানবিশ্ব প্রযুক্তির যুগ। এই যুগে মোবাইলফোন হয়ে উঠেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান, বিনোদন, শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ আজ মোবাইল ফোনেরমাধ্যমে সহজে করা যায়। কিন্তু এই প্রযুক্তির অতিরিক্তবা অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বিশেষ করে শিশুদের জন্য হয়ে উঠতে পারে মারাত্মক ক্ষতির কারণ। মোবাইল ফোন যেমন সুবিধার দরজা খুলে দিয়েছে, তেমনি এর অপব্যবহার শিশুদেরশারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত ক্ষেত্রেগুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। আজকের এই প্রবন্ধে আমরাশিশুদের মোবাইল ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
শারীরিকস্বাস্থ্যক্ষতিগ্রস্তহয়: শিশুদের শারীরিক গঠনের সময় তাদের নিয়মিত ঘুম, পর্যাপ্ত খাবার, ও শারীরিক খেলাধুলাপ্রয়োজন। কিন্তু মোবাইলে আসক্তি শিশুদের এই স্বাভাবিক জীবনধারাকেব্যাহত করে। দীর্ঘ সময় মোবাইল স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে তাদের চোখের সমস্যা দেখা দেয়, যেমন চোখে জ্বালা, পানি পড়া, ঝাপসা দেখা, এমনকি চোখের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। আধুনিক চিকিৎসকরা বলছেন, মোবাইল ফোন থেকে নির্গত নীল আলো (blue light) শিশুদের ঘুমের হরমোন মেলাটোনিনের স্বাভাবিক উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায়, যার ফলে তাদের ঘুমের সমস্যা হয় এবং শারীরিকবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।
এছাড়া, মোবাইল ব্যবহারের কারণে শিশুদের শারীরিক নড়াচড়া কমে যায়, তারা খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এতে করে স্থূলতা, হজমজনিত সমস্যা এবং অন্যান্য শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
মানসিকস্বাস্থ্যওআচরণগতসমস্যা: অতিমাত্রায়মোবাইল ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা বাড়ে। তারা ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে দূরে সরে গিয়ে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ডুবে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত গেম খেলা, টিকটক বা ইউটিউব ভিডিওদেখা ইত্যাদি শিশুদের আবেগ-নিয়ন্ত্রণ ও মনঃসংযোগ ক্ষমতাকমিয়ে দেয়।
বিশেষ করে সহিংস ভিডিও গেম ও কনটেন্ট শিশুদেরমধ্যে আগ্রাসী আচরণ তৈরি করে। অনেক সময় দেখা যায়, শিশু কথা না শুনে রেগেযাচ্ছে, জিনিসপত্র ভাঙচুর করছে বা মারামারিতে লিপ্তহচ্ছে—এসবের পেছনে মোবাইল কনটেন্টের গভীর প্রভাব থাকতে পারে।
অন্যদিকে, যেসব শিশুরা দীর্ঘ সময় একা একা মোবাইল ব্যবহার করে, তারা ধীরে ধীরে একাকিত্বে ভুগে এবং বিষণ্ণতা ও উদ্বেগে আক্রান্তহয়। তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং তারা সহজে রাগান্বিত হয়ে পড়ে।
শিক্ষাজীবনেপ্রভাব: মোবাইলব্যবহার শিশুদের শিক্ষাজীবনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তারা পড়ালেখার প্রতি মনোযোগ হারায়, পাঠ্যবইয়ের বদলে ইউটিউব বা গেমে বেশিসময় ব্যয় করে। অনেকে রাতে দেরি পর্যন্ত মোবাইল ব্যবহার করায় সকালে ঠিকমতো ঘুম থেকে উঠতে পারে না, স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করে এবং পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হতে থাকে।
অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। মনোযোগহীনতা, তথ্য ধারণের অক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। অনেক সময় শিক্ষকদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারে না বা সহজবিষয়ও মনে রাখতে পারে না।
সামাজিকদক্ষতাওপারিবারিকসম্পর্কেরক্ষতি: শিশুরা সামাজিক জীব। তাদের মানসিক বিকাশের জন্য পারিবারিক পরিবেশ, বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা, খেলাধুলা ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারে শিশুরা সমাজ থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলে। তারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিবর্তে মোবাইলেই ডুবে থাকে।
এতে করে শিশুর সামাজিক দক্ষতা বিকাশ পায় না। অনেক সময় শিশুদের মধ্যে কথাবার্তা কমে যায়, তারা চুপচাপ ও আত্মকেন্দ্রিক হয়েপড়ে। বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে চায় না বা নতুনমানুষের সঙ্গে মিশতে ভয় পায়।
পারিবারিক সম্পর্কেও টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। অনেক সময় দেখা যায়, শিশু মোবাইল না পেয়ে রেগেযায়, জেদ করে, কান্নাকাটি করে বা ঘরের পরিবেশঅশান্ত করে তোলে।
অনলাইননিরাপত্তাঝুঁকি: বর্তমানে ইন্টারনেটভিত্তিক মোবাইল ফোনে শিশুদের অনিরাপদ কনটেন্ট বা অপরিচিত মানুষেরসংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বেড়ে গেছে। অনেক সময় শিশুরা না বুঝেই বিভিন্নওয়েবসাইটে প্রবেশ করে বা অনুপযুক্ত ভিডিওদেখে ফেলে। এসব কনটেন্ট তাদের কোমল মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এছাড়া, অনেক সময় শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে কোনো অ্যাপে রেজিস্ট্রেশন করে ফেললে তারা সাইবার অপরাধীদের টার্গেটে পরিণত হতে পারে। বিভিন্ন ফেক গেম বা অ্যাপের মাধ্যমেশিশুর মোবাইল থেকে তথ্য চুরি হয়, কিংবা শিশুদের ভুলিয়ে টাকা-পয়সা খরচ করিয়ে ফেলা হয়।
আসক্তিএবংএরপরিণতি: শিশুরাযখন মোবাইল ব্যবহারে আসক্ত হয়ে পড়ে, তখন তা একটি মানসিকরোগে পরিণত হতে পারে। মোবাইল না পেলে তারাঅস্থির হয়ে ওঠে, তাদের ঘুম নষ্ট হয়, মেজাজ খারাপ হয়ে থাকে, কারও সঙ্গে কথা বলতে চায় না। ধীরে ধীরে তারা বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদেরমতে, এটি ‘ডিজিটাল ড্রাগ’-এর মতো কাজকরে। একবার শিশুরা এই মোবাইল আসক্তিতেপড়ে গেলে, তা থেকে বেরিয়েআসা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি অনেক সময় চিকিৎসা বা কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজনহয়।
সমাধানওকরণীয়: এইপরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার, স্কুল, সরকার ও সমাজের সম্মিলিতউদ্যোগ প্রয়োজন।
অভিভাবকদেরকরণীয়:
· শিশুদেরমোবাইল ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করে দেওয়া।
· মোবাইলব্যবহারে নিয়ন্ত্রণমূলক অ্যাপ ব্যবহার করা (যেমন: Family Link)।
· শিশুদেরসামনে নিজেরাও মোবাইল ব্যবহার কমিয়ে তাদের ভালো উদাহরণ স্থাপন করা।
· বিকল্পবিনোদনের ব্যবস্থা রাখা—যেমন: গল্প শোনা, বই পড়া, খেলাধুলা, চিত্রাঙ্কন ইত্যাদি।
· শিশুদেরসঙ্গে নিয়মিত কথা বলা ও তাদের মানসিকঅবস্থার খোঁজ নেওয়া।
· বিদ্যালয়েরকরণীয়:
· বিদ্যালয়েমোবাইল ফোন নিষিদ্ধ রাখা।
· প্রযুক্তিরভালো ব্যবহার শেখানো—যেমন শিক্ষামূলক অ্যাপ ও কনটেন্ট পরিচিতকরানো।
· মোবাইলব্যবহারের ঝুঁকি ও সচেতনতা বিষয়েশিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা করা।
সরকারেরকরণীয়:
· শিশুদেরজন্য নিরাপদ ও বয়ঃসীমা অনুযায়ীইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিত করা।
· মোবাইলকোম্পানিগুলোকে শিশু-বান্ধব নিরাপত্তা ফিচার যুক্ত করতে বাধ্য করা।
· অভিভাবকও শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
উপসংহার: মোবাইলফোন আধুনিক জীবনের প্রয়োজনীয় একটি যন্ত্র হলেও এর ব্যবহার হতেহবে নিয়ন্ত্রিত ও সচেতনভাবে। বিশেষকরে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি হতে পারে দ্বি-মুখী তলোয়ার—যেখানে একটু ভুলে ঘটে যেতে পারে অপূরণীয় ক্ষতি। তাই অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের সকলকেদায়িত্বশীল হয়ে শিশুদের মোবাইল ব্যবহারে সচেতন করতে হবে। শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশনিশ্চিত করতে হলে প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ, সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের পথ দেখানোই হবেশ্রেষ্ঠ পথ।
৪
৫ মন্তব্য