সিনিয়র শিক্ষক
২২ মে, ২০২৫ ০৯:৪৪ অপরাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-উদ্ভাবনেই সমৃদ্ধি
এখন বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞান মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে বহুদূর পর্যন্ত। সেই আদিম যুগে গোষ্ঠীবদ্ধ যাযাবর মানুষের জীবনে যুগান্তর আনলো আগুনের আবিষ্কার আর কৃষিকার্য প্রচলন। সেই সময় গড়ে ওঠলো ছোট ছোট গ্রাম । উদ্ভাবিত হলো আদি কৃষিযন্ত্র লাঙল। কার্পাস থেকে সূতা বানাতে শিখল মানুষ। কুমোরের চাকা ঘুরিয়ে মানুষ বানাতে শুরু করল নানা ধরনের মাটির পাত্র। প্যাপিরাস জাতীয় নলখাগড়া থেকে মিসরের মানুষ প্রথম লেখার উপযোগী কাগজ তৈরি করলো। ইরাক অঞ্চলের লোকেরা প্রথম চাকাযুক্ত গাড়ি বানিয়ে পরিবহন ব্যবস্থায় যুগান্তর আনলো। চীনের বিজ্ঞানীরা অতি দ্রুত যান্ত্রিক পদ্ধতিতে যোগ-বিয়োগ করার উপযোগী গণকযন্ত্র (অ্যাবাকাস) তৈরি করেন। ‘অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ক্লক’ প্রথম তৈরি করেছিলেন আলেকজান্ড্রিয়ার বিজ্ঞানীরা আজ থেকে দু’হাজার বছরেরও আগে। গ্রিসের মানুষেরা প্রথম পৃথিবী ও মহাকাশের মানচিত্র বানায়। প্রাণিবিদ্যা, চিকিসাশাস্ত্র, স্থাপত্যবিদ্যা এবং জ্যামিতির ক্ষেত্রে গ্রিক বিজ্ঞানীদের অবদান অনেক বেশি। অন্যদিকে বীজগণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শল্যচিকিৎসা, রসায়নশাস্ত্র, জীববিদ্যা প্রভৃতির ক্ষেত্রে প্রাচীন ভারতের ও আরব দেশের বিজ্ঞানীরা যেসব তত্ত্ব উদ্ভাবন করেছিলেন, তা মানুষের জীবনযাত্রাকে যথেষ্ট সহজ করে দিয়েছে।
সভ্যতার ক্রমবিকাশের পথে অগ্রসর হয়ে বিজ্ঞান বর্তমানে পূর্ণরূপে সমৃদ্ধি লাভ করেছে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে বিজ্ঞান নতুন শক্তি নিয়ে অবতীর্ণ হলো। শিল্পজগতে নতুন আলোড়নের সৃষ্টি করলো বিজ্ঞান। দ্রুত উৎপাদনের তাগিদে নতুন নতুন যন্ত্র আবিষ্কারের হিড়িক পড়ে গেল। নব নব শিল্প প্রকরণে বিজ্ঞান উৎপাদনের জগতে এনেছে যুগান্তর এবং সুদূরকে করেছে নিকটতম। বিজ্ঞানের সাফল্যে জীবধাত্রী বসুধা আজ কলহাস্য মুখরা।
দৈনন্দিন জীবনে মানুষ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে পূর্ণাঙ্গরূপে কাজে লাগিয়েছে ইউরোপে শিল্প-বিপ্লব ঘটে যাবার পর থেকে, উনিশ শতকে। ঐ সময়ই মানুষ বাষ্পের শক্তিকে নানান কাজে ব্যবহার করতে শিখে। তারপরে ক্রমে ক্রমে বিদ্যুৎশক্তিকে কাজে লাগাতে শিখে। এই শতকে জ্বালানি কয়লা ছাড়াও পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস এমনকি পারমাণবিক শক্তিকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে পেরেছে বিজ্ঞান। বাষ্পশক্তি, প্রাকৃতিক গ্যাসের শক্তি, সর্বোপরি বিদ্যুৎশক্তির ব্যাপক প্রচলন রয়েছে গৃহস্থের ঘরে ঘরে।
পরিবহন ব্যবস্থায় বিজ্ঞান রীতিমত যুগান্তর এনেছে। হাজার হাজার মাইল দূরের পথ হাতের মুঠোয় এসেছে বিমানের বদৌলতে। বাস, স্টিমার ও ট্রেনের সাহায্যে দ্রুতগতিতে একস্থান থেকে অন্যস্থানে চলে যাওয়া যায়।
কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের দান বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যাটি সমগ্র বিশ্বে বিদ্যমান থাকায় কৃষির উৎপাদন বাড়িয়ে তা মোকাবিলা করার প্রয়োজন দেখা দেয়। ফলে কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রয়োগ হওয়ায় কৃষির অনেক উন্নতি সাধিত হয়েছে। কৃষি উৎপাদনের সামগ্রিক ব্যবস্থায় বিজ্ঞান অবদান রেখেছে। বীজ উৎপাদন, সার, সেচ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ব্যবহার হচ্ছে। বেশি পরিমাণে ফসল ফলনের উপায় উদ্ভাবন করা হয়েছে। অল্প জমিতে অধিক ফসল উৎপাদনের প্রয়াসে নিবিড় চাষের জন্য যান্ত্রিক সরঞ্জামের আবিষ্কার কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লবের সূচনা করেছে। কৃষিকাজে বিজ্ঞানের প্রয়োগের মাধ্যমে পোকামাকড়, রোগবালাই দমন ও নির্মূল করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রয়োগ ঘটেছে অন্য সকল ক্ষেত্রের মতোই। নানা ধরণের পোকার আক্রমণ থেকে শস্যকে রক্ষার জন্য পোকা দমনকারী বহু রাসায়নিক দ্রব্য আবিষ্কৃত হয়েছে।
চিকিৎসা জগতে বিজ্ঞান আজ যুগান্তর ঘটিয়েছে। আবিষ্কৃত হয়েছে যুগান্তকারী সব ওষুধপত্র। আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্যে মানুষ মৃত্যুর কবল হতে ফিরে আসতে সমর্থ্য হচ্ছে । বৈজ্ঞানিক রঞ্জনের আবিষ্কার ‘রঞ্জন-রশ্মি’ , কুরি ও মাদাম কুরি আবিষ্কৃত রেডিয়াম বিজ্ঞান জগতে যুগান্তর এনেছে। রেডিয়াম ক্যান্সারের মতো ভয়ঙ্কর ক্ষতের মারাত্মক বিষক্রিয়াকে অনেকাংশে প্রতিহত করেছে। পেনিসিলিন, ক্লোরো মাইসিন ও স্টেপটোমাইসিন ইত্যাদি মহৌষধ আবিষ্কারের ফলে কোটি কোটি মানুষ নানা প্রকার রোগ থেকে রক্ষা পাচ্ছে। লুই পাস্তুরের ইনজেকশন আবিষ্কৃত হওয়ায় মানুষ জলাতংকের মতো রোগ থেকে রক্ষা পাচ্ছে। দুরারোগ্য সংক্রামক ব্যাধি বসন্তের জীবানু নিবারণের জন্য ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করেন এডওয়ার্ড জেনার। এভাবে বিজ্ঞানের কল্যানে আমরা আনন্দ লাভ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পেয়েছি।
মানবজাতির আদিকাল থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে ভিত্তি করেই সভ্যতার ক্রমবিকাশ বা উত্তরণ ঘটেছে। তাই নির্দ্ধিধায় বলা যায় জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নব নব আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের অগ্রগতি অগ্রগমনের ইতিহাসই সভ্যতা বিকাশের ইতিহাস। মানুষের মেধা মননের উদ্ভাবনী জ্ঞান প্রয়োগের মধ্য দিয়ে জীবন, জীবিকা ও প্রযুক্তি ধাপে ধাপে উন্নত থেকে উন্নতর হয়েছে; আর এ উদ্ভাবনকে কেন্দ্র করেই বিকশিত হয়েছে মানবসভ্যতা। উদ্ভাবন সম্পর্কে বিশ্বের খ্যাতিমান বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক বিভিন্ন আঙ্গিকে ধারণা দিয়েছেন। অর্থনীতিবিদ জোসেফ শূম্পেটারের মতে- উদ্ভাবন হলো সৃজনশীল ধ্বংস, যা ক্রমাগত অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতর থেকে বিপ্লব ঘটায় এবং ক্রমাগত পুরানোটিকে ধ্বংস করে অবিরামভাবে নতুন কিছু তৈরি করে। এ থেকে এটি স্পষ্ট যে, উদ্ভাবন হচ্ছে নতুন কিছু প্রবর্তন বা বিদ্যমান ধারণা, পণ্য বা প্রক্রিয়াকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করার প্রক্রিয়া। উদ্ভাবন (ইনোভেশন), সৃজন (ইনভেনশন) এবং আবিষ্কার (ডিসকভার) এই তিনটি ধারণাকে সামগ্রীকভাবে উদ্ভাবন হিসেবে গণ্য করা হলেও প্রকৃত অর্থে পার্থক্য অনেক। তবে, তিনটি ধারণাই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পৃথক অর্থে বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট যে, উদ্ভাবন দক্ষতা উন্নত করে, নতুন বাজার তৈরি করে এবং বিদ্যমান পণ্য পরিষেবাগুলোকে উন্নত করে অগ্রগতি নিশ্চিত করে।
উদ্ভাবন একটি বহুমুখী ধারণা। ক্ষেত্রবিশেষ বিভিন্ন ধরণের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখে। তাই বিভিন্ন মানদন্ডের উপর ভিত্তি করে উদ্ভাবনকে শ্রেণিবদ্ধ করা যেতে পারে। সাধারণত উদ্ভাবনকে ৪টি শ্রেণিকরণে বিভক্ত করা যায়। যথা – ১। পণ্য উদ্ভাবন ২। প্রক্রিয়া উদ্ভাবন ৩। সাংগঠনিক উদ্ভাবন ৪। বিপনন উদ্ভাবন।
উদ্ভাবন দক্ষতা এবং উৎপাদনশীলতার উন্নতি করে প্রযুক্তি। নতুন প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়তা ও সুবিন্যস্ত প্রক্রিয়া প্রবর্তন করে খরচ কমাতে পারে এবং আউটপুট বাড়াতে পারে। বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে মূল্যায়ন করে, মানুষের বুদ্ধিমত্তার শক্তিকে কাজে লাগায় যে সমাজ, সেই সমাজই আজকের চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবিলা করে একটি সমৃদ্ধ আগামীর ভিত্তি স্থাপন করতে পারে। যে জাতি উদ্ভাবনকে স্বীকৃতি দেয় এবং অগ্রাধিকার দেয়, তারা তাদের নিজস্ব সাফল্যের স্থপতি।
৪
৪ মন্তব্য