Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩১ মে, ২০২৫ ০৮:০৪ অপরাহ্ণ

হিংসা একটি ধ্বংসাত্মক শব্দ

হিংসা একটি ধ্বংসাত্মক শব্দ 

হিংসা মানব সমাজের এক মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক আবেগ। এটি মানুষের মানসিক শান্তি, সামাজিক সৌহার্দ্য এবং আত্মউন্নয়নের পথে একটি বড় অন্তরায়। হিংসা এমন একটি আগুন, যা প্রথমে হিংসুককে পুড়িয়ে দেয় এবং পরে অন্যকে আক্রান্ত করে। হিংসার ফলে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি হয়, বন্ধুত্ব নষ্ট হয় এবং অশান্তির আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এটি একপ্রকার আত্মবিনাশী প্রবণতা, যা মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

হিংসার উৎপত্তি মূলত আত্মতুষ্টির অভাব থেকে। যখন কেউ অপরের সাফল্য, সুখ বা উন্নতি দেখে নিজেকে তুচ্ছ মনে করে, তখন সেই অনুভূতি থেকেই হিংসা জন্ম নেয়। এটি একটি নেতিবাচক মানসিকতা, যা মানুষের শুভ চিন্তাগুলোকে ঢেকে ফেলে। হিংসার কারণে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়, সে ভালো-মন্দ বেছে দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। নিজের অক্ষমতা, ব্যর্থতা কিংবা অপূর্ণতা ঢাকতে গিয়ে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, যা হিংসারই রূপ।

বিশ্বের বিভিন্ন মনীষীরা হিংসা সম্পর্কে তাঁদের মূল্যবান বক্তব্য রেখেছেন, যা এই আবেগের ধ্বংসাত্মক দিককে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেন: "Happiness depends upon ourselves. Envy is pain at the good fortune of others."
অর্থাৎ, সুখ আমাদের নিজের উপর নির্ভর করে। অন্যের সুখে দুঃখিত হওয়া মানেই হিংসা।

হিন্দু ধর্মগ্রন্থ 'ভগবদ গীতা'-তেও হিংসাকে ত্যাগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে: "অদ্বেষ্টা সর্বভূতানাং মৈত্রঃ করুণ এভ চ..."
অর্থাৎ, সকল প্রাণীর প্রতি বিদ্বেষহীনতা, মৈত্রিতা ও করুণা ধারণ করাই ধর্ম।

আবার, জার্মান দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার বলেন: "Envy in men shows how they hate, but in women it shows how they love."
এই কথায় দেখা যায়, হিংসা কিভাবে মানুষের আবেগ ও মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে।
ইসলামী শিক্ষায়ও হিংসাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন: "তোমরা পরস্পরের প্রতি হিংসা করো না, পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না।"
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট যে, হিংসা সমাজকে ভাঙনের পথে নিয়ে যায় এবং মুসলিম জীবনে এটি নিষিদ্ধ।
হিংসার সবচেয়ে খারাপ দিক হলো এটি ব্যক্তির মনের শান্তি কেড়ে নেয়। হিংসুক ব্যক্তি সবসময় অপরের উন্নতিকে নেতিবাচকভাবে দেখে এবং নিজেকে অবহেলিত মনে করে। ফলে তার আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয় এবং ক্রমেই সে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। একসময় সে সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকে কিংবা অন্যের ক্ষতি করার ফন্দি আঁটে, যা আরও বড় সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করে।
অপরদিকে, যে ব্যক্তি হিংসার ঊর্ধ্বে উঠতে পারে, সে জীবনে উন্নতির পথে অগ্রসর হয়। সে অন্যের সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়, নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে গড়ে তোলে। এই মনোভাবই সুস্থ, সুন্দর এবং গঠনমূলক সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য।

সাম্প্রতিককালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও হিংসার প্রসার লক্ষ্য করা যায়। অন্যের ছবি, অর্জন বা জীবনের সুখের মুহূর্ত দেখে অনেকে হিংসাত্মক মন্তব্য করে, বিদ্বেষ ছড়ায়। এটি শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর নয়, বরং একটি বিশৃঙ্খল সমাজের ভিত্তি তৈরি করে।

উপসংহার:
হিংসা একটি বিষের মত। এটি প্রথমে হিংসুককে এবং পরে সমাজকে আক্রান্ত করে। হিংসা নয়, বরং সহযোগিতা, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা মানুষকে প্রকৃত অর্থে উন্নত করে। আমাদের উচিত আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজের ত্রুটি খুঁজে তা দূর করা এবং অন্যের সাফল্যে অনুপ্রেরণা নেওয়া। তাই, হিংসার এই ধ্বংসাত্মক আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে এবং সমাজে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে হবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  ভাষায়  "অপরের আনন্দে যাহার মন দোলা দেয় না, সে মানুষ নয়।"
এই কথাটিই আমাদের শেখায়, হিংসা নয়—সহানুভূতি ও ভালোবাসাই মানবধর্ম।

মন্তব্য করুন