Loading..

ব্লগ

রিসেট

০২ জুন, ২০২৫ ০৩:২৮ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ

৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এটি ছিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সশস্ত্র সংগ্রাম, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে আত্মপ্রকাশ করে।

পটভূমি: দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণ চালিয়ে আসছিল। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। এর ফলে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে ওঠে।

যুদ্ধের সূচনা: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে ঢাকায় নিরস্ত্র বাঙালির ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। এই কালো রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পূর্বে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর সারাদেশে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ:

  • প্রারম্ভিক প্রতিরোধ: পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আক্রমণের পর বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ এবং সাধারণ মানুষ মুক্তিবাহিনী গঠন করে।
  • মুজিবনগর সরকার গঠন: ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের অধীনে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়।
  • গেরিলা যুদ্ধ: প্রাথমিক প্রতিরোধের পর মুক্তিবাহিনী গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ চালিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে।
  • ব্রিগেড গঠন: যুদ্ধের গতিশীলতা বাড়াতে এবং মুক্তাঞ্চল গঠনের লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর গঠন বিন্যাসে পরিবর্তন আনা হয়। প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানীর পরিকল্পনায় তিনটি নিয়মিত ব্রিগেড গঠন করা হয়: জেড ফোর্স (লেঃ কর্নেল জিয়াউর রহমানের নামে), কে ফোর্স (লেঃ কর্নেল খালেদ মোশাররফের নামে) এবং এস ফোর্স (লেঃ কর্নেল শফিউল্লাহর নামে)।
  • নৌ ও বিমান বাহিনীর ভূমিকা: মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ নৌ বাহিনী 'অপারেশন জ্যাকপট' নামে সমুদ্র ও নদী বন্দরসমূহে বিধ্বংসী আক্রমণ পরিচালনা করে। নবগঠিত বাংলাদেশ বিমান বাহিনীও পাকিস্তানী ঘাঁটিগুলোর ওপর বিমান হামলা চালায়।
  • আন্তর্জাতিক সমর্থন: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সাহায্য লাভ করে।
  • ভারতের সরাসরি অংশগ্রহণ: ডিসেম্বরের শুরুর দিকে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরিভাবে জড়িয়ে পড়ে।
  • পতন ও বিজয়: মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে পাকিস্তানের দখলদারী বাহিনীর পতন ত্বরান্বিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তান ৯৩,০০০ সৈন্যসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এর মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

ক্ষয়ক্ষতি ও ফলাফল: এই যুদ্ধে প্রায় ৩০ লক্ষ বাঙালি শহীদ হন এবং অসংখ্য মানুষ আহত ও বাস্তুচ্যুত হন। তবে এর বিনিময়ে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান পায়।

বীরত্বপূর্ণ অবদান: মুক্তিযুদ্ধে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে। এই যুদ্ধে শহীদ রুহুল আমিন, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ, বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান এবং বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সহ অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধা বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁদের আত্মত্যাগ ও বীরত্ব চিরস্মরণীয়।

মন্তব্য করুন

ব্লগ