সহকারী শিক্ষক
০২ জুন, ২০২৫ ০৭:৩৭ অপরাহ্ণ
পাহাড়ে বঞ্চিত কেনো এমপিও শিক্ষকগণ?
বাংলাদেশের দক্ষিন-পশ্চিমে ৩টি পার্বত্য জেলা একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকা। এখানে বাঙ্গালীদের পাশাপাশি ২০টির বেশি জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের মাতৃভাষা বাংলা নয়। ফলে এখানে শিক্ষাব্যবস্থা সমতলের চেয়ে আলাদা ও ভিন্ন।
প্রথম দিকে, শিক্ষকতা অনেক উপভোগ করলেও ধীরে ধীরে বুঝতে পারি এখানে শিক্ষকদের চ্যালেঞ্জ ও পরিশ্রম অনেক বেশী। ক্ষেত্রবিশেষে জীবন ঝুকি তো আছেই।
এখানে, শিক্ষককে হতে হয় একাধারে দোভাষী, মনোবিদ ও সমাজকর্মী। অনেক শিক্ষক নিজ উদ্যোগে স্থানীয় ভাষা কিছুটা শিখে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতেও শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ করাটা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। নিজ মাতৃভাষায় পাঠদান করা সকল নাগরিকের অধিকার হলেও এখানে বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে আসার পর যা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। বাংলা না জানা শিশুর জন্য পাঠ্যবই বোঝা যেমন কঠিন, তেমনি শিক্ষককেল সামলাতে হয় এক অদ্ভুত ভাষাগত চাপ।
একই এলাকায় পুলিশ অফিসার, ডাক্তার, সরকারী কর্মকর্তা এমনকি প্রাথমিকের শিক্ষকরাও পাহাড়ি ভাতা পান। অথচ এখানে শিক্ষকরা প্রতিদিন দুর্গম পথে হাঁটেন, ভিন্ন ভাষার শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন। বাংলা না জানা ছাত্রকে বুঝিয়ে পড়ানোর জন্য ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি ও কৌশল অবলম্বন করতে হয়। তা না হলে, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। এখানে শিখনফল অর্জন চেষ্টার আগে আসে শিক্ষার্থীদের পাঠের মূল বক্তব্য বোঝানোর ঝামেলা। প্রচন্ড ভাষাগত চাপ ও যোগাযোগ অনিরাপত্তায় চলে এখানকার পাঠদান।
কিছু বিদ্যালয়ে প্রতিদিন পায়ে হেঁটে খাড়া পাহাড়ি দূর্গম রাস্তা পেরিয়ে বিদ্যালয়ে যান মাধ্যমিক পর্যায়ের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা । কিছু বিদ্যালয় এতোটাই প্রত্যন্ত এলাকায় যে, সেখানে যেতে গাড়ির কোনো ব্যবস্থাই থাকে না। সেখানে স্থানীয় শিক্ষকদের দ্বারাই চলে পাঠদান। আর আমার মত বাহিরে থেকে যারা আসেন, তাদেরকে পড়তে হয় আরো চ্যালেঞ্জে। অপরিচিত জায়গা, অপরিচিত ভাষা, সংস্কৃতি সব মিলিয়ে নতুন জীবন। সেই জীবনে আবার পাহাড়ধ্বসের শংকা কিংবা স্থানীয় ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা। বর্ষায় বিদ্যালয়ে যাওয়াটাই রীতিমত চ্যালেঞ্জ। কারন বৃষ্টির সময় পাহাড় হয়ে যায় পিচ্ছিল আর কর্দমাক্ত। এতে বিদ্যালয়ে যাতায়াতে যেকোন সময় ঘটতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত দূর্ঘটনা।
এতোসব সমস্যা মাথায় নিয়েও পাহাড়ি এলাকা বিবেচনায় প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা পাহাড়ি ভাতা পেলেও, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা পান না কোনো ‘পাহাড়ি ভাতা’। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (BCS)-এর পুলিশ, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, প্রকৌশলসহ বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তারা পার্বত্য এলাকায় কর্মরত থাকলে ‘পার্বত্য ভাতা’ পান, যা মূল বেতনের ২০%-৩০% পর্যন্ত দেওয়া হয়। অথচ এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণ, যাঁরা মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানে নিয়োজিত, তাঁদের কোনো পাহাড়ি ভাতা বরাদ্দ নেই।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান) মোট ২৬৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৯২টি এমপিওভুক্ত। সেই হিসেবে, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ৫,২০০ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে অন্তত ৭০% শিক্ষক প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি পথ পাড়ি দেন। সরকারি পরিপত্র (Finance Division, Memo No. 07.00.0000.173.42.003.15-218, Date: 03/03/2016) অনুযায়ী, পার্বত্য এলাকায় কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি “পার্বত্য ভাতা” (Hill Allowance) প্রবর্তন করা হলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য নেই সেই সুবিধা।
সরকারের এসডিজি-৪ বাস্তবায়নে "সকলের জন্য সুশিক্ষা" নিশ্চিতকরণে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পাহাড়ি ভাতা প্রদান একটি সময়ের দাবী। ন্যায্য পাহাড়ি ভাতা নিশ্চিত করা হলে শিক্ষকগণ আরও দায়িত্বশীল হয়ে উঠবেন, আর পাহাড়ে শিক্ষার মানও হবে উন্নত। এতে বাইরে থেকেও শিক্ষকগণ এসে এখানে শিক্ষকতা করাটা উপভোগ করার সুযোগ পাবেন।
এটি শুধু অর্থের বিষয় নয়—এটি ন্যায্যতা ও মর্যাদার প্রশ্ন। শিক্ষকদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন এর সাথে সাথে সামাজিক ন্যায্যতা ও মর্যাদা রক্ষার্থে সরকারের এবং সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
-এনাম আহমেদ খাঁন, সহকারী শিক্ষক, পাহাড়িকা উচ্চ বিদ্যালয়, কাপ্তাই।
১৪
২১ মন্তব্য