প্রভাষক
০২ জুন, ২০২৫ ০৯:০৮ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশে নারী শিক্ষা
ফারহানা পারভীন
র্বাংলাদেশে নারী শিক্ষার বাস্তব চিত্র বেশ আশাব্যঞ্জক, তবে কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। স্বাধীনতার পর থেকে নারী শিক্ষায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
সাফল্যের দিক:
- শিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি:
- প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা পুরুষ শিক্ষার্থীদের চেয়ে বেশি। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর ৫০.৭% এবং মাধ্যমিক স্তরে ৫৩% ছাত্রী।
- উচ্চশিক্ষাতেও নারীর অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। ২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী ভর্তির হার ছিল প্রায় ৩৮%, যা ২০২৪ সালে ৫০.৪১% এ উন্নীত হয়েছে।
- পেশাগত শিক্ষায়, বিশেষ করে চিকিৎসা শিক্ষায় নারীদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি (প্রায় ৬৩% ছাত্রী মেডিকেল কলেজগুলোতে)।
- কারিগরি শিক্ষাতেও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে, ২০২৩ সালে মোট শিক্ষার্থীর ২৯.৫৩% নারী ছিল, যা ২০২২ সালের ২৭.১২% থেকে বেশি।
- উপবৃত্তি ও বিনামূল্যে বই বিতরণ: সরকার নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করার জন্য প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত উপবৃত্তি এবং অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে বই বিতরণের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
- শিক্ষক নিয়োগে অগ্রাধিকার: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, ২০২৩ সালে ৬২.১৬% প্রাথমিক শিক্ষক ছিলেন নারী। এটি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক।
- রাজনৈতিক সদিচ্ছা: গত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সরকার নারী শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর জন্য নানা ধরণের উৎসাহব্যঞ্জক নীতি গ্রহণ করেছে।
চ্যালেঞ্জসমূহ:
- উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে পড়া: উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত শিক্ষার ক্ষেত্রে এখনো নারীদের সংখ্যা কম। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রীদের হার তুলনামূলকভাবে কম।
- কারিগরি শিক্ষায় কম অংশগ্রহণ: কারিগরি শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও পুরুষদের তুলনায় এখনো অনেক কম।
- বাল্যবিবাহ: বাল্যবিবাহ নারী শিক্ষার প্রসারে একটি বড় বাধা। শিক্ষার হার বৃদ্ধির সাথে বাল্যবিবাহ কমে যাওয়ার কথা থাকলেও, ২০২২ সালে বাল্যবিয়ের হার ছিল ৪১%, যা উদ্বেগজনক। বাল্যবিবাহের কারণে অনেক মেয়ে উচ্চশিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে।
- নিরাপত্তাহীনতা ও হয়রানি: বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে স্কুল-কলেজে যাতায়াতকারী মেয়েদের বখাটে ছেলেদের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়। অভিভাবকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বোধও মেয়েদের পড়াশোনায় বাধা সৃষ্টি করে।
- কর্মমুখী শিক্ষার অভাব: কর্মমুখী শিক্ষার অভাব এবং শিক্ষার মান ভালো না হওয়ায় অনেক শিক্ষিত নারী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না।
- সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি: এখনো অনেক পরিবার মেয়েদের উচ্চশিক্ষার চেয়ে "ভালো বিয়ে" দেওয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। নারীর শারীরিক সৌন্দর্যকেই তাদের যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়, যা নারী অগ্রগতির পথে একটি বড় বাধা।
- ভালো শিক্ষকের অভাব: বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে ভালো শিক্ষকের অভাব নারী শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করে।
সরকারি উদ্যোগ:
- উপবৃত্তি ও বিনামূল্যে বই: প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত উপবৃত্তি এবং বিনামূল্যে বই বিতরণ।
- নারীবান্ধব পরিবেশ: বিদ্যালয়গুলোতে নারীবান্ধব শিক্ষার পরিবেশ তৈরি।
- বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন: বাল্যবিবাহ বন্ধে আইন এবং কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা।
- প্রশিক্ষণ ও ঋণ সুবিধা: নারী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান।
- নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ: সরকারি উচ্চপদস্থ পদে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশে নারী শিক্ষার অগ্রগতি প্রশংসনীয়। তবে, বাল্যবিবাহ, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, নিরাপত্তাহীনতা এবং কর্মমুখী শিক্ষার অভাবের মতো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারলে নারী শিক্ষায় আরও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
মন্তব্য করুন
১
১ মন্তব্য