Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ জুন, ২০২৫ ১০:৩০ অপরাহ্ণ

মাতৃভাষাই কি ওদের শত্রু? নাকি শিক্ষানীতির ব্যর্থতা?

বাংলা বোঝে না, উচ্চারণে লজ্জা পায়। 

পার্বত্য শিক্ষার্থীরা ভাষাগত প্রতিবন্ধকতায় পিছিয়ে পড়ছে মূলস্রোত থেকে।


দশম শ্রেণির ছাত্র ঙাকরেং পাংখোয়া। সুঠাম দেহ, আত্মবিশ্বাসী চেহারা—তবুও ক্লাসে দাঁড়ালে চোখ নামিয়ে রাখে। কথা বলতে চায় না, কারণ উচ্চারণে ভুল হলে সহপাঠীরা হাসে। রাঙ্গামাটির কাপ্তাই এলাকার লিচুবাগানে একটি ভাড়া বাসায় থেকে পাহাড়িকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়া লেখা করে। অথচ তার শৈশব কেটেছে বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নের গভীর পাহাড়ি এলাকায়, যেখানে তার মাতৃভাষা পাংখোয়া। শিক্ষা জীবনের শুরুও সেখানেই।


অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্থানীয় বিদ্যালয়ে অপর্যাপ্ত শিক্ষাদান, শিক্ষক সংকট এবং ভাষাগত অসংগতির মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে ঙাকরেং। সে পড়েছে বই মুখস্থ করে, অনেক শব্দের অর্থ না বুঝেই। নবম শ্রেণিতে পৌঁছে শহরে এসে ভর্তি হয়েছে বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ বিদ্যালয়ে। 

কিন্তু সমস্যার ধরন বদলায়নি, বরং বেড়েছে।


"স্যার, আমি বুঝে না । কষ্ট হয় । কি বলবো বুঝতে পারে না,"—কথাগুলো বলার সময় চোখ নিচু করে রাখে ঙাকরেং।

শুধু সে নয়, তার মতো হাজারো পাহাড়ি শিক্ষার্থী বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বড় হচ্ছে। তারা বাড়ির পরিবেশে মাতৃভাষায় কথা বলে, কিন্তু বিদ্যালয়ে গিয়ে বাংলা ভাষায় পুরোপুরি মানিয়ে নিতে হয়। 

একটি ভাষা, যা তাদের প্রথম ভাষা নয়।


ভাষাগত চ্যালেঞ্জ শিক্ষার মূল প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাঁড়িয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে গিয়ে নিজেকে নিঃসঙ্গ ভাবে, কারণ শিক্ষক এবং সহপাঠীরা তার ভাষা বোঝে না। অনেক সময় শিক্ষকের কথাও পুরোপুরি বোঝে না, আবার নিজের কথা বুঝিয়ে বলতেও দ্বিধায় পড়ে। ফলস্বরূপ, সে পাঠ্যবই থেকে দূরে সরে যায়, আত্মবিশ্বাস হারায়।


বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতিতে মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিশ্রুতি থাকলেও পার্বত্য এলাকায় তার প্রয়োগ দৃশ্যমান নয়। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে বাংলা ও ইংরেজিতে পাঠদান হয়, যেখানে পাহাড়ি শিশুদের ভাষাগত প্রস্তুতি অনুপস্থিত। অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিজেই স্থানীয় ভাষা জানেন না।


এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত হতাশার জন্ম দেয় না, বরং একটি গোটা জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার মূলস্রোত থেকে পিছিয়ে দেয়। শিশুরা যখন ভাষা বুঝতে পারে না, তখন তারা চিন্তা করতে পারে না, অংশ নিতে পারে না, এমনকি স্বপ্ন দেখতেও ভয় পায়।


নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রশ্ন হলো—ঙাকরেং-এর মতো শিক্ষার্থীদের জন্য কী প্রস্তুতি নিচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা? শুধু বই দিয়ে নয়, ভাষা দিয়ে, বোঝাপড়া দিয়ে, সমান অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে কি তাদের পাশে দাঁড়ানো হচ্ছে?

পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের জন্য যা যা প্রয়োজন। যেমন:

মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা,

স্থানীয় ভাষায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক,

সাংস্কৃতিক সংবেদনশীল পাঠ্যবই,

এবং শহরের বিদ্যালয়ে ভাষা-বান্ধব সহায়তা ব্যবস্থা।

তা কি দিতে প্রস্তুত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা?


না হলে ঙাকরেং-এর মতো শিক্ষার্থীরা আরও অনেকেই হারিয়ে যাবে—শুধু শ্রেণিকক্ষে নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মানচিত্র থেকে।


এনাম আহমেদ খাঁন, 

সহকারী শিক্ষক

পাহাড়িকা উচ্চ বিদ্যালয়, কাপ্তাই।

মন্তব্য করুন