Loading..

ব্লগ

রিসেট

১২ জুন, ২০২৫ ১২:৪৬ অপরাহ্ণ

শিক্ষায় বৈষম্য রেখে বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন

শিক্ষক ছাড়া শিক্ষা পরিপূর্ণ হয় না জাপানে একটি প্রবাদ আছে ‘এক হাজার দিনের পরিশ্রমী অধ্যয়নের চেয়ে একদিন একজন শিক্ষকের কাছে পড়াশোনা করা অধিক ভালো একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি শিক্ষকের আরও কিছু গুণ থাকা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে এ পি জে আব্দুল কালাম বলেছেন, ‘একজন মহান ও আদর্শ শিক্ষকের মধ্যে কয়েকটি বিশেষ গুণ অবশ্যই থাকা উচিৎ করুণা, জ্ঞান এবং অদম্য ইচ্ছা শক্তি’। যোগ্যতাঅভিজ্ঞতাপ্রযুক্তিজ্ঞান দ্বারাই শিক্ষক সক্ষম হয়ে ওঠেন শিক্ষকের সক্ষমতা যত বৃদ্ধি পায় শিক্ষা তত তীক্ষ্ণ হয়সমাজ ও রাষ্ট্র তত সমৃদ্ধ হয় প্রশ্ন হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের এ সমৃদ্ধি কতটা সুষম হচ্ছে?

উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মোটা দাগে তিন ভাগে বিভক্ত সরকারীবেসরকারী ও প্রাইভেট পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকল শিক্ষকের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। শিক্ষা প্রশাসন এ ব্যবস্থা করে থাকেন। সরকারী কলেজের শিক্ষকগণের প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম)-এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তাঁরা। এরপর দেশ বিদেশের স্বনামধন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগও তাঁরা পেয়ে থাকেন। এটি খুবই ইতিবাচক দিক। বিশ্বায়নের এ সময়ে বহুমূখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি গুরুত্বের দাবি রাখে। বিশ্বমানের জনশক্তি উন্নয়নে এটির ভূমিকা অনস্বীর্কার্য। শিক্ষকগণ চমৎকার কৌশলে শিক্ষার্থীদের মাঝে তাঁর অর্জিত জ্ঞান ভান্ডার উম্মূক্ত করে দেবেন এবং শিক্ষার্থীরা আনন্দ চিত্তে তা গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হবে এটিই স্বাভাবিক। এ প্রসঙ্গে আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন,  সৃষ্টিশীল প্রকাশ এবং জ্ঞানের মধ্যে আনন্দ জাগ্রত করা হলো শিক্ষকের সর্ব প্রধান শিল্প’।

বেসরকারী কিংবা প্রাইভেট কলেজের শিক্ষকগণেরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে তবে তা আলাদা প্রতিষ্ঠানে। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (এইচএসটিটিআই)-এ। দুই প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ মডিউল বা কনটেন্ট হয়তো কাছাকাছি। তবে রিসোর্স পারসন পরিবেশ, বাজেট এসবে ফারাক আছে। প্রশিক্ষণ শেষে সকল শিক্ষক নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়ান, পাঠদান করেন। দুই ধরণের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ নিয়ে একই সিলেবাস কিংবা কারিকুলামে পাঠদান একই রকম হবে, এটি আশা করা যায়?

লক্ষণীয় যে, শিক্ষাখাতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে এদেশে পরিচালিত প্রজেক্টসমূহ কিন্তু সরকারী বেসরকারী আলাদা করেনি। শিক্ষকগণের প্রশিক্ষণ একসাথে আয়োজন করে আসছে আমি নিজেও এরকম বেশ কিছু প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছি। শিক্ষক প্রশিক্ষণের এসকল আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট ব্যবস্থাপনা থেকে শিক্ষা প্রশাসন বৈষম্য দূরীকরণের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হতে পেরেছে কি?       

বর্তমানে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সাথে সাথে আমরা শিক্ষা পদ্ধতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। একসময় শিক্ষকগণ নানা রকম শাস্তি, বেত্রাঘাত,  জরিমানা ইত্যাদি প্রয়োগ করতেন। অর্থাৎ শিক্ষায় ভয়ের সংস্কৃতি জারি ছিলো। এখন তা করা হয় না, আনন্দ চিত্তে শিক্ষার্থীরা যেনো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান আহরণ করতে পারে সেরকম পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। শিখন শেখানোর পদ্ধতিগত এ রূপান্তরের ক্ষেত্রে শিক্ষকগণের মান সম্মত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আলাদা আলাদা ব্যবস্থাপনা সামাজিক বৈষম্য তৈরি করছে। অর্থাৎ সরকারি বেসরকারি শিক্ষকগণের জ্ঞান ভান্ডারের তারতম্য দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা প্রদান করছে। এটি অনাকাঙ্ক্ষিত।

মর্যাদার দিক বিবেচনায় সরকারী কলেজের শিক্ষকগণ ক্যাডারভুক্ত হয়ে থাকেন। উনাদের ট্রান্সফার, পদন্নোতি সব সরকারী জনবল কাঠামো অনুযায়ী হয়। পদন্নোতির ক্ষেত্রে সরকারী কলেজের শিক্ষকগণ সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপক পদে উন্নীত হতে পারেন।

বেসরকারী শিক্ষকগণ শুধু সহকারী অধ্যাপক পদন্নোতি পান ইন্টারমেডিয়েট কলেজের শিক্ষকগণ তাও পাচ্ছেন না। সহকারী অধ্যাপকের পরিবর্তে উনাদেরকে জ্যাষ্ঠ শিক্ষক পদমর্যাদা দেয়া হচ্ছে।

আর্থিক প্রাপ্তির বিষয়টি সম্মানজনক নয়, স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও দেশের ৯০ ভাগের বেশি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ অনুদানে চলে। মাস শেষে বেসরকারী শিক্ষক-কর্মচারীগণ অনুদানের চেক হস্তান্তরের অপেক্ষায় থাকে। বাড়ী বাড়া মাত্র ১০০০ টাকা আর চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা পেয়ে সন্তুষ্ট থা্কতে হয়। অপরাপর ভাতা দেয়া হয় না। এখান থেকেও ১০% কেটে নেয়া হয় অবসরকালীন সুবিধা প্রদানের জন্যে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ সেটিও ঠিক সময়ে পাচ্ছেন না। কয়েক বছর অফিসে অফিসে ঘুরাঘুরি করতে হয়, যারা সৌভাগ্যবান শুধু তারাই জীবিত অবস্থায় এ অর্থ পেয়ে থাকেন। এ ফান্ড থেকেও আট হাজার কোটি টাকা গরমিল পাওয়া গেছে ৪ মার্চ ২০২৫ তারিখের দেশ রূপান্তর প্রত্রিকার শিরনাম ছিলো  ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ৮ হাজার কোটি টাকা লোপাট’।

কর্পোরেশন পরিচালিত কিছু প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোতেও অভ্যন্তরীণ বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত কলেজ শিক্ষকদের মাঝে তিনটা ক্যাটাগরি রয়েছে ১ম ক্যাটাগরি- কর্পোরেশন নিয়োগকৃত স্থায়ী শিক্ষক যারা কর্পোরেশন নির্ধারিত সকল সুবিধা পেয়ে থাকেন। ২য় ক্যাটাগরি- কর্পোরেশন নিয়োগকৃত অস্থায়ী শিক্ষক,  যাদের চাকরী স্থায়ী নয় এবং সুযোগ সুবিধাও পুরোপুরি পান না। ৩য় ক্যাটাগরি- এনটিআরসিএ সুপারিশে নিয়োগকৃত শিক্ষক যাদের নিয়োগের সময়ও গড়িমসি করা হয় এবং শেষ মূহূর্তে শর্ত সাপেক্ষে নিয়োগ দেয়া হয়। অথচ তারা এনটিআরসিএ -এর মেধা তালিকা থেকে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়েছে। এদের একটা অংশকে কর্পোরেশনে সমন্বয় করা হয়েছে তারা কর্পোরেশন নির্ধারিত সকল সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন।  অপর অংশটি কর্পোরেশনের শিক্ষা ডিপার্টমেন্টে ঘুরাঘুরি করছে বলে জেনেছি তবে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তারা এখনো কোনো কুল কিনারা করতে পারেননি এবং কর্পোরেশন নির্ধারিত সুযোগ সুবিধাও পাচ্ছেন না। সংশয়, শঙ্কা নিয়ে নানা বৈষম্যের মাঝে অপরাপর শিক্ষকদের মতো পাঠদান করে যাচ্ছেন তাঁরা। এমতাবস্থায় সেখানকার কর্মপরিবেশ যে সন্তোষজনক নয় তা বলাবাহুল্য।

সরকারী কলেজও এখন দুই ধরণের। একটি হচ্ছে, সরকারী কলেজ যেখানে শিক্ষকগণ শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত থাকেন এবং সকল সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন। দ্বিতীয়টি হচ্ছে বেসরকারী থেকে সরকারীকৃত কলেজ যেখানে শিক্ষকগণ ‘সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা, ২০১৮’ অনুযায়ী নন ক্যাডার হিসেবে আত্তীকৃত হয়েছেন। এই অবস্থায় উনাদের বদলির সুযোগ থাকবে না, কোনো প্রমোশনের ব্যবস্থাও নেই। একটি কলেজে দুই ধরণের মর্যাদার শিক্ষক রয়েছেন। মর্যাদা ভিন্ন হলেও সকলের মূল কাজ একই। পাঠদান করা। অপেক্ষাকৃত কম আত্মমর্যাদা নিয়েও তাঁরা সমানতালে সকল সকল কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছেন। তাঁদের মনোযাতনা কখনো শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করে প্রিয় শিক্ষকগণের বৈষম্যেমূলক আচরণ থেকে তারাও শিখবে। এটির আঁচড় সমাজে গিয়ে পড়বে। হেনরি এডামস এর মতে ‘শিক্ষকের প্রভাব অনন্তকালে গিয়েও শেষ হয় না

এখানে কলেজ পর্যায়ের শিক্ষায় নানা রকম বৈষম্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। শিক্ষার বেইসিক এ স্তরসহ সকল স্তর থেকে সব ধরণের বৈষম্য দূর করে একই রকম কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ অনুভব করছি, বৈষম্যহীন সেই কাঙ্ক্ষিত সমাজ বিনির্মান করার লক্ষ্যে।  

 

মন্তব্য করুন