সিনিয়র শিক্ষক
২১ জুন, ২০২৫ ০৮:১৫ অপরাহ্ণ
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা: সনদপত্র ও মূল্যবোধ
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা: সনদপত্র ও মূল্যবোধ
ভূমিকা
হাজার বছরের স্বপ্ন ও
আত্মত্যাগের ফসল-একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ১৬
ডিসেম্বর। এই দেশ গঠিত হয়েছিল গণতন্ত্র, ন্যায়, সাম্য এবং মানবিক মর্যাদার আদর্শে। রাষ্ট্রচিন্তার
কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এমন এক সমাজ, যেখানে মানুষ হবে শিক্ষিত, সচেতন, মূল্যবোধসম্পন্ন ও আত্মমর্যাদাশীল। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪
বছর পর দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে-আমরা কি সেই সমাজ গড়তে পেরেছি?
আজ বাংলাদেশে প্রতি বছরে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী
ডিগ্রি অর্জন করছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কিন্তু এই
শিক্ষার ফসল কী? ডিগ্রিধারী
মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সমাজে কমে যাচ্ছে সততা, সহানুভূতি, দেশপ্রেম ও মানবিকতা। ফলে জন্ম নিচ্ছে এক শোচনীয় প্রশ্ন-শিক্ষা
কি সত্যিই মানুষ গড়ছে, নাকি কেবল কাগুজে সার্টিফিকেটের স্তূপ বুঝিয়ে দিচ্ছে?
অনৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষিত
মানুষ:
শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষ তৈরি করা। মননশীল, নৈতিক এবং দায়িত্বশীল মানুষ। কিন্তু বর্তমানে
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহীতার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সেই শিক্ষা সমাজে মানবিকতার
ছাপ রাখতে পারছে না।
শিক্ষিত দুর্নীতিবাজ, স্বার্থান্ধ রাজনীতিবিদ, নৈতিকতাবর্জিত চিকিৎসক, কিংবা বিতর্কিত আমলা। এরা সকলেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে
শিক্ষিত। তবু কেন তারা জাতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
শুধু সংখ্যায় শিক্ষার অগ্রগতি নয়, গুণগত উন্নয়ন জরুরি। নচেৎ শিক্ষা হবে কেবল অর্থ ও ক্ষমতার সিঁড়ি, সমাজ পরিবর্তনের মাধ্যম নয়।
ডিগ্রি-নির্ভর শিক্ষা:
মানুষ নয়, পণ্য তৈরি
বর্তমানে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলো থেকে প্রতি
বছর প্রায় ৫ লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে (শিক্ষা মন্ত্রণালয়)। অথচ
সমাজে সেই ডিগ্রিধারীদের এক বিরাট অংশ চাকরি প্রত্যাশী, কিন্তু মূল্যবোধহীন।
শিক্ষা হয়ে পড়েছে শুধুমাত্র পেশাভিত্তিক
প্রতিযোগিতার হাতিয়ার। ছাত্ররা জিপিএ, পিএসসি, এইচএসসি, ভর্তি পরীক্ষা। এসব পরীক্ষায় ভালো ফল করতে ব্যস্ত। কিন্তু এই প্রতিযোগিতায়
হারিয়ে যাচ্ছে নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এবং সহমর্মিতা।
একটি বাস্তব চিত্র:
স্কুলে ‘সততা’ শিখানো হয় পাঠ্যবইয়ে, কিন্তু একই স্কুলে শিক্ষক পরীক্ষার সময় ‘নকল’
দেখেও চুপ থাকেন বা টাকার বিনিময়ে নম্বর বাড়িয়ে দেন। শিক্ষার্থী বুঝে যায়। নীতিবোধ বইয়ের জন্য, বাস্তবের জন্য নয়।
দুর্নীতির শিকড়ে শিক্ষার হাত
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (TIB) সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৮৮% মানুষ জীবনের কোনো না
কোনো সময় দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ সত্য হলো।এই দুর্নীতিগুলো বাস্তবায়ন করে শিক্ষিত মানুষরাই।
একজন দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারী কর্মকর্তা, অসৎ চিকিৎসক, স্বজনপ্রীতিতে অভ্যস্ত
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক।তাদের সবাই শিক্ষিত, কিন্তু মূল্যবোধহীন। তাই প্রশ্ন ওঠে,এই শিক্ষা
কোথায় ব্যর্থ হচ্ছে?
দেশপ্রেমের অবক্ষয়:
আত্মনির্মাণের বদলে আত্মস্বার্থ।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছিল, কীভাবে দেশের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়। অথচ
আজ, দেশপ্রেম পরিণত হয়েছে
স্লোগানে, বাস্তবে তার চর্চা বিরল।
বর্তমান তরুণদের একটি বড় অংশ বিদেশে ‘সেটেল’
হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। সামাজিক উদ্যোগ, জাতীয় সংকটে স্বেচ্ছাসেবা, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান,এসব তাদের
কাছে আর অগ্রাধিকার নয়।
কিছু করুণ বাস্তবতা:
চাকরির জন্য ঘুষ। নাগরিক সনদ, জন্মসনদ, পার্সপোর্ট , শিক্ষকদের বেতন থেকে কর্তন করে জমানো পি এফ, অবসর সুবিধা, কল্যাণ ,এমন কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় প্রত্যয়ন টাকা ছাড়া কোন ফাইল নড়ে না। এ সব কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় তৈরি হওয়া শিক্ষিত, সোনার মানুষ দ্বারাই হচ্ছে।
রাজনীতিতে আদর্শ নয়, সুবিধাবাদ,ছাত্ররাজনীতি
এখন সংঘর্ষ আর দখলের মাঠ।
শিক্ষকদের অযোগ্য নিয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাবে চাকরি নিশ্চিত হয়,যোগ্যতা
নয়, পরিচয় মুখ্য।
মূল সংকট: কেন আমাদের শিক্ষা মানুষ গড়তে পারছে
না?
১. মূল্যবোধভিত্তিক পাঠ্যক্রমের অভাব
নৈতিকতা পাঠ্যবইয়ের একটি অধ্যায় হয়ে আছে, জীবনচর্চার অংশ নয়। বাস্তব অনুশীলন ছাড়া কেবল
মুখস্থ মূল্যবোধ মানুষের মননে গেঁথে যায় না।
২. শিক্ষকের নৈতিক ব্যর্থতা
শিক্ষক হচ্ছেন জাতি গঠনের কারিগর। কিন্তু
অনেকক্ষেত্রে শিক্ষক নিজেই পক্ষপাত, দুর্নীতি বা দলীয় প্রভাবের ধারক হয়ে ওঠেন। এতে ছাত্রের কাছে
মূল্যবোধ অর্থহীন হয়ে পড়ে।
৩. পরীক্ষাকেন্দ্রিক একমাত্রিক শিক্ষা
সৃজনশীলতা, বিতর্ক, থিয়েটার, সমাজসেবা,এসব শিক্ষার অংশ হওয়া উচিত। অথচ আজ শিক্ষা
মানে নম্বর ও সার্টিফিকেট। এতে ছাত্র হয় পুথিগত জ্ঞানে ভারাক্রান্ত, কিন্তু বাস্তব জীবনে অচল।
৪. আইনের শাসনের অভাব
যখন দুর্নীতিবাজরা শাস্তি পায় না, বরং সম্মানিত হয়,তখন শিক্ষার্থীরা বুঝে যায়, নৈতিকতা দিয়ে এগোনো যায় না। এতে আদর্শ নয়, প্রতারণা হয়ে দাঁড়ায় টিকে থাকার কৌশল।
সমাধানের পথ: মানুষ গড়ার জন্য শিক্ষার পুনর্গঠন
✅ ১. নীতিভিত্তিক শিক্ষাক্রম প্রণয়ন
শুধু বই নয়, আচরণভিত্তিক পাঠদান জরুরি। যেমন:সততার বাজার,
সহানুভূতির গল্প লেখা,
সামাজিক থিয়েটার,
বাস্তব অভিজ্ঞতা বিনিময় ইত্যাদি।
✅ ২. শিক্ষকের নৈতিকতা প্রশিক্ষণ
শিক্ষকদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ, সহানুভূতি ও দায়বদ্ধতা বাড়াতে আলাদা প্রশিক্ষণ
দরকার। শিক্ষকের আচরণই হোক শিক্ষার প্রধান পাঠ।
✅ ৩. স্কুল-কলেজে সমাজমুখী কার্যক্রম
শিক্ষার্থীদের ভলান্টিয়ার কাজে সম্পৃক্ত করতে
হবে,পথশিশুদের পাঠদান, রক্তদান, বৃদ্ধাশ্রমে সেবা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান।
✅ ৪. অবশ্যই শাস্তির দৃষ্টান্ত তৈরি
দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা দ্রুত ও
কঠোর হলে সমাজে বার্তা যাবে,মূল্যবোধহীনতার চূড়ান্ত পরিণতি আছে।
✅ ৫. পরিবার ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সংহতি
ঘর থেকেই নৈতিকতা চর্চা শুরু হতে হবে। বাবা-মা
যদি দুর্নীতিপরায়ণ হন, সন্তান কখনোই সৎ হতে পারবে না।
ধর্মীয় মূল্যবোধও হতে পারে নৈতিক শিক্ষার সহায়ক
হাতিয়ার,শান্তিপূর্ণ ও প্রগতিশীল উপায়ে।
উপসংহার
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড।এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু যদি সেই মেরুদণ্ডই নড়বড়ে হয়, তাহলে জাতি দাঁড়াবে কী করে?
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু একটি নৈতিক জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে
দাঁড়াতে পারেনি। কারণ, আমরা শিক্ষাকে ব্যবহারের দক্ষতা হিসাবে নিয়েছি।মানুষ গড়ার উপায় হিসাবে নয়।
এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো-
👉 যুগোপযোগি শিক্ষাক্রম প্রনয়ন ও দ্রুত বাস্তবায়ন
👉 শিক্ষায় মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্বকে স্থান দেওয়া,
👉 শিক্ষক ও পরিবারে নৈতিকতা চর্চা,
👉 এবং সমাজে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান।
শুধু ডিগ্রি নয়, প্রয়োজন সততার সার্টিফিকেট।
শুধু সাফল্য নয়, প্রয়োজন নিষ্ঠা ও দায়িত্বের চর্চা।
তবেই স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আমরা বলতে পারব-হ্যাঁ, আমরা সত্যিই স্বাধীন; শুধু ভূখণ্ডে নয়, চিন্তা ও চরিত্রে, বিবেক ও বোধে।
লেখক: মুফিদুল আলম
সিনিয়র শিক্ষক
নাদেরুজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়
রশিদনগর, রামু, কক্সবাজার।
মোবাইল: ০১৮১৫৫০০৭৫১
১৪
২৪ মন্তব্য