Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৩ জুন, ২০২৫ ০১:৩৯ অপরাহ্ণ

"হাওরে শিক্ষাদীক্ষা "এক কঠিন বাস্তবতার গল্প

হাওরের ঢেউ পেরিয়ে শিক্ষার দীপ্ত আলো: এক কঠিন বাস্তবতার গল্প

ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে কান ঝালাপালা, মাঝে মধ্যে ঢেউ আছড়ে পড়ছে নৌকাটিতে ।শিক্ষারথীরা যার যার সৃষ্টিকর্তার নাম জপছে । কখন জানি নৌকাটি ডুবে যায়। দেড় থেকে দুশত শিক্ষার্থী নিয়ে এগিয়ে  চলছে বিদ্যালয়ের দিকে।সময়মত স্কুলে যেতে না পারলে যে ক্ষতি হয়ে যাবে পড়াশুনার তাই ছুটে চলা ।বলছিলাম হাওর অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের বর্ষাকালে বিদ্যালয়ে নৌকাযোগে ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ করে  আসার প্রতিদিনের গল্পটি ।   বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল শুধুই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে নয়, প্রতিকূল পরিবেশেও গড়া এক সংগ্রামের নাম। এখানে শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়ে যাওয়া মানেই প্রতিদিন এক নতুন চ্যালেঞ্জ। ঘরের দরজা পেরিয়ে তাদের যাত্রা শুরু হয় হাওরের ঢেউয়ের সাথে লড়াই করে। নদী নয়, হাওরের বুক চিরে বৈঠা চালানো নৌকাই এই শিশুদের প্রতিদিনের স্কুলবাস।বর্ষাকাল এলেই হাওরের চিত্র পাল্টে যায়। পানি বেড়ে যায় কয়েক গুণ, শান্ত হাওর রূপ নেয় উত্তাল ঢেউয়ের সমুদ্রে। এই সময়টাতে ছোট ছোট শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়াটা হয়ে পড়ে এক মহা-দুঃসাহসিক অভিযান।বর্ষাকালে শিক্ষার্থীরা আবহাওয়ার বৈরিতার কারণে সময়মত স্কুলে যেতে ও স্কুল ছুটির পর বাড়িতে  যেতে  সমস্যার সৃষ্টি হয়,এতে অভিভাবক উদ্বিগ্ন থাকে এবং পড়ালেখার ব্যাপক  বিঘ্ন ঘটে। কাঁপা কাঁপা হাতে বৈঠা ধরা বাবা, ভাই অথবা কোন মাঝি যখন শিশুদের নিয়ে নৌকায় ওঠেন, তখন প্রতিটি অভিভাবক দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়েন – "ফিরে আসবে তো নিরাপদে?" শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকরাও এই প্রতিকূল যাত্রার অংশ। অনেক শিক্ষক হাওরের বাইরের এলাকা থেকে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসেন। কখনো কখনো কয়েক ঘণ্টা পানির মধ্যে অপেক্ষা করতে হয় নৌকার জন্য। অনেকে দুর্যোগের সময় আসতেই পারেন না। এতে বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়।দীর্ঘ সময় হাওরে বসবাসকারী অনেক পরিবারই চায় তাদের সন্তান লেখাপড়া শিখুক, আলোকিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাক। কিন্তু যখন প্রতিদিন সন্তানকে ঢেউয়ের মধ্যে পাঠাতে হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা ভয়ে পিছিয়ে পড়েন। বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে এই দ্বিধা আরো প্রকট। অনেক সময় তারা সন্তানকে স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দেন শুধুমাত্র নিরাপত্তার কারণে।পরিশেষে বলা যায়, হাওরের শিক্ষার্থীরা  প্রতিদিন ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ করে বিদ্যালয়ে আসে। এ যেন কেবলমাত্র লেখাপড়া নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই। এই সাহসিকতা, এই সংকল্প আমাদের সকলকে অনুপ্রাণিত করে। রাষ্ট্র, সমাজ এবং সচেতন মানুষের উচিত – এই সংগ্রামী শিশুদের পাশে দাঁড়ানো। তাহলেই হয়ত একদিন, হাওরের ঢেউ শুধু দুর্ভোগ নয়, হবে সম্ভাবনার প্রতীক।

মোঃ তাজুল ইসলাম ভূইয়া

সহকারি প্রধান শিক্ষক 

লাইমপাশা উচ্চ বিদ্যালয় ,ইটনা, কিশোরগঞ্জ।

মন্তব্য করুন