Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ জুন, ২০২৫ ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ

অসময়ের আগমন (প্রিম্যাচিউর শিশুর গল্প)

সন্ধ্যা নামার আগেই পুরো গ্রাম যেন অন্ধকারে ঢেকে যায়। বিদ্যুৎ থাকে না প্রায়ই। তবে সেদিন সবার ঘরেই আলো জ্বলছিল। কারণ, সুমি আপার বাচ্চারা যে আসছে! বাচ্চারা বলতে সুমি আপার গর্ভে ট্রিপলেট বেবী। মানে তিনজন সন্তান। বাড়ির সবাই অপেক্ষায়। কিন্তু কারও মনটা পুরোপুরি খুশিতে ভরা নয়। কারণ, ডাক্তার বলেছে, "সময় হওয়ার আগেই বাচ্চা আসছে"

 

সুমির বয়স মাত্র ৩০। গর্ভে ট্রিপলেট সন্তান। ডাক্তাররা যাকে বলেন, 'প্রিম্যাচিউর বেবী'। গ্রামের অনেকেই এর মানে ঠিক জানে না, শুধু শুনেছেএ রকম হলে বাচ্চা ঠিকমতো বাঁচে না।

 

যেসব শিশু মাতৃগর্ভে ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই জন্ম নেয়, তারাই প্রিম্যাচিউর বেবী। এদের শরীর পুরোপুরি গঠিত হয় না। ফুসফুস ঠিকমতো কাজ করে না, হার্ট দুর্বল থাকে, ব্রেইনের বিকাশ অসম্পূর্ণ থাকে। তাই এদের জন্য জীবন শুরুটাই হয় লড়াইয়ের মাঠে।

 

সুমি যখন শহরের হাসপাতালে ভর্তি হলো, তখনও ওর চোখে একরাশ ভয়। স্বামী ইমরান পাশে বসে আছে, মুখে আশ্বস্ত করার চেষ্টা, কিন্তু চোখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তা।

 

ইমরান ইউটিউবে ভিডিও দেখে শুনেছেজাপানে, সুইডেনে, নরওয়েতে প্রিম্যাচিউর বাচ্চারা খুব ভালোভাবে বেঁচে থাকে। আধুনিক Neonatal Intensive Care Unit বা NICU রয়েছে, যেখানে ছোট্ট শিশুটিকে প্রয়োজনীয় যত্ন দেওয়া হয়।

 

জাপানে প্রতি ১০০০ প্রিম্যাচিউর বাচ্চার মধ্যে ২০-৩০ জন মারা যায়। আর সুইডেন বা নরওয়ের মতো উন্নত দেশগুলোতে প্রায় ৯০% এর বেশি বাচ্চা সুস্থভাবে বাঁচে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়াসবখানেই প্রযুক্তি আর দক্ষ চিকিৎসক-নার্সের প্রভাবে মৃত্যুহার অনেক কম।

 

আমাদের বাংলাদেশের চিত্রটা এখনো কষ্টের। প্রতি ১০০০ প্রিম্যাচিউর বাচ্চার মধ্যে প্রায় ১৫০-২০০ জন মারা যায়। নবজাতক মৃত্যুর একটা বড় কারণই হলো সময়ের আগেই জন্ম। ২০২৩ সালে UNICEF ও WHO জানায়, বাংলাদেশে প্রতি ১০০০ জীবিত জন্মে ২৪ জন নবজাতক মারা যায়যাদের বড় একটা অংশই হলো প্রিম্যাচিউর বেবী।

 

কারণগুলো ইমরান-সুমি নিজেরাই খুব ভালো বোঝে। গ্রামের হাসপাতালে NICU নেই। ডাক্তার নেই, নার্সের প্রশিক্ষণ অপ্রতুল। অনেক মা গর্ভকালীন ঠিকমতো চেকআপ করাতে পারে না। দারিদ্র্য, অপুষ্টি, সচেতনতার অভাবসব মিলিয়ে এদেশে বাচ্চা জন্ম দেয়াটাই যেন এক যুদ্ধ।

 

হাসপাতালের এক নারী ডাক্তার বলতে লাগলেন,

"আমাদের দেশে যদি প্রতিটি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে উন্নত NICU স্থাপন করা যায়;
নিয়মিত ANC, মা'র পুষ্টি, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ মায়েদের বিশেষ নজরদারি করা যায়;
গ্রামের মাতৃসভা, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালানো যায়;
ডাক্তার-নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, নবজাতক বিশেষজ্ঞ সংখ্যা বাড়ানো যায়;
কম ওজনের বাচ্চাদের মা'র বুকে রেখে (Kangaroo Mother Care) উষ্ণতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে সহজ যত্ন নেয়া যায়
;
প্রতিটি প্রিম্যাচিউর কেসের কারণ খুঁজে সমাধান বের করা যায়;
এবং
দারিদ্র্যতা হ্রাস ও মেয়েদের শিক্ষা বাড়ানো যায় তবে অনেক সময় এই বিপদ এড়ানো যায়।"

ডাক্তারের কথা শুনে সুমি ও তার স্বামী মনে যেন একটু সাহস পেল।

 

শেষ পর্যন্ত সুমির তিন তিনটি সন্তান জন্ম নিল। ছোট্ট, কুঁকড়ে যাওয়া শরীর। ডাক্তার বললেন, "ওদেরকে সারাক্ষণ বুকের কাছে রাখুন। Kangaroo Mother Care দিন।" সুমি যেন ওর বুকের উষ্ণতা দিয়ে জীবনের শক্তি ছড়িয়ে দিল। বাচ্চাগুলো খুব দুর্বল ছিল। তাই মা'র সাহস, চিকিৎসকদের সকল প্রচেষ্টা ভেদ করে বাচ্চাগুলো একে একে সকলেই মারা গেলো।

 

সারা বাংলাদেশে আরও হাজার হাজার মা-বাবার চোখে এই একই ভয়। সময়ের আগেই জন্মানো ছোট্ট প্রাণ নিয়ে লড়াই। কিন্তু আমরা চাইলে এই গল্পের শেষ বদলাতে পারি। উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও পরিকল্পিত পদক্ষেপ, সচেতনতা আর আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে প্রিম্যাচিউর শিশুর মৃত্যু হার কমানো সম্ভব।

 

একদিন, হয়তো খুব শিগগিরই, বাংলাদেশের মায়েরা বলবে:

"আমার বাচ্চার সময়ের আগেই জন্ম হলেও, আমি জানি ও বাঁচবে। কারণ এখন আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা, সচেতনতা আর প্রযুক্তি অনেক উন্নত।"

 

একটি শিশুর জন্ম শুধু একটা জীবনের শুরু নয়এটি একটি পরিবারের, একটি সমাজের, একটি জাতির আশার শুরু। আর সেই আশাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রিম্যাচিউর বাচ্চাদের গল্প যেন বেদনার গল্প না হয়ে, হয় সাহস আর ভালোবাসার গল্পসেই চেষ্টার পথে হোক আমাদের যাত্রা।

মন্তব্য করুন