সহকারী শিক্ষক
২৯ জুন, ২০২৫ ০৯:০৮ পূর্বাহ্ণ
মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন: যৌক্তিকতা-অযৌক্তিকতার তুলনামূলক পর্যালোচনা
বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্র গত কয়েক বছর ধরে বেশ অস্থিরতার মধ্যে আছে। বিশেষ করে এখন যারা শিক্ষার্থী বা পড়াশোনা শেষে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন, তারা সবাই এই অস্থিতিশীলতার উত্তাপ টের পেয়েছেন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে বর্তমান সময়ের ক্রমাগত ধারা পরিবর্তনের ইতিহাস বুঝতে চাইলে ”২০০১ সাল” ক্যালেন্ডারের অন্যতম একটি মাইলফলক হয়ে দাঁড়াবে।
১৯৯১ সালে বুয়েটে বাংলাদেশে প্রথমবারের মত গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করা হয়। ২০০১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম গ্রেডিং সিস্টেম চালু হয়। এর আগে ডিভিশন সিস্টেম চালু ছিলো, যার নিয়ম মোটামুটি এরকম- ৬০০ নাম্বার পেলে ফার্স্ট ডিভিশন, ৪৫০ নাম্বারে সেকেন্ড ডিভিশন এবং ৩৩০ নাম্বারে ছিল থার্ড ডিভিশন। টোটাল ৭৫০।পেলে স্টার মার্ক নাম্বার এবং প্রতি বিষয়ের ক্ষেত্রে ৮০ ছিল লেটার মার্ক নাম্বার। প্রতিটি বোর্ডের সর্বোচ্চ নাম্বার পাওয়া প্রথম বিশজনকে আলাদাভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হতো। ভালো ছাত্রদের টার্গেট থাকতো বোর্ড স্ট্যান্ড করা। বেশ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।
কথা উঠলো, ডিভিশন সিস্টেম আধুনিক বিশ্বের সাথে মানানসই না। আমাদের শিক্ষার্থীরা দেশের বাইরে গিয়ে এই মূল্যায়ন পদ্ধতির জন্য সমস্যায় পড়ছেন। এখন চাই আন্তর্জাতিক কিছু। ব্যস, সব সমস্যার সমাধানের নাম গ্রেডিং সিস্টেম!
মজার ব্যাপার হচ্ছে, গ্রেডিং সিস্টেম অবশ্যই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, কিন্তু যিনি এর উদ্ভাবক ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উইলিয়াম ফারিস, তিনি এমন কোন স্কেল আবিষ্কার করেননি যেটা সব দেশের,সব সংস্কৃতির, সব আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য প্রযোজ্য। তিনি ছাত্রদের লার্নিং বা শেখাটাকে কয়েকটি ক্যাটাগরি বা ধাপে ভাগ করেন। মুল্যায়নকারী বা শিক্ষক তার জানার গভীরতা অনুযায়ী তাকে কোন একটি ধাপে বা গ্রেডে ফেলবেন। নম্বর দেওয়ার পদ্ধতির যে সমস্যাগুলো ছিলো অর্থাৎ বিভিন্ন শিক্ষক কর্তৃক বিভিন্ন মার্কিং এর সমস্যা, অল্প কিছু মার্কের পার্থক্যের জন্য যে অবমুল্যায়নের ব্যাপার — এগুলো অনেকাংশে গেলো। গ্রেডিং এর সাথের পরীক্ষার নম্বরের কোন ধরা-বাধা সম্পর্ক নেই বেশিরভাগ দেশেই। মার্কস দেবার পরে গ্রেডিং এর ধাপ ঠিক করা হয়। সহজ প্রশ্নে ৯৮-১০০ তে এ+ হতে পারে আবার কঠিন প্রশ্নে ৬০-১০০ তে এ+ হতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিভিন্নভাবে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী গ্রেডিং সিস্টেম ডেভেলপ করেছে। গ্রেডিং সিস্টেম ডেভেলপ করতে গিয়ে যে বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে-
১. গ্রেডের উদ্দেশ্য কী? (ক্লাস র্যাংক, মেধাবীদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করা নাকি সবাইকে ভালোভাবে লেখাপড়া করতে উদ্বুদ্ধ করা)
২. এই গ্রেডিং সিস্টেমের অডিয়েন্স কারা? (স্টুডেন্ট, টিচার, কলেজ নাকি চাকুরিদাতারা)
৩. কোন কোন বিষয়গুলোকে ক্রাইটেরিয়া বা পরিধি হিসেবে ধরা হবে? (টেস্ট, প্রজেক্ট, আচরণ, ব্যবহার নাকি হোমওয়ার্ক)
৪. রিপোর্ট কার্ডে কোন সিস্টেমে রেজাল্ট লেখা হবে? (লেটার- এ প্লাস, এ, এ মাইনাস ইত্যাদি, সংখ্যা- জিপিএ ৪, জিপিএ ৩, নাকি ন্যারেটিভ অর্থাৎ বিস্তারিত বর্ণনা থাকবে)
৫. কি পরিমাণ নাম্বারকে কোন গ্রেডের সমতুল্য বলে ধরা হবে? (এ প্লাস=?, জিপিএ ৪=?)
৬. এই গ্রেড কি স্টুডেন্টের সম্পূর্ণ এ্যাচিভমেন্টকে পরিমাপ করতে পারছে?
৭. একজন স্টুডেন্ট তার রিপোর্ট কার্ডে যে গ্রেডটা দেখতে পাচ্ছে, সেটা আসলে কি ইনডিকেট করে?
-এগুলো ছাড়াও আরও অনেক বিষয় রয়েছে।
পৃথিবীতে পারফেক্ট থিওরি বলে কিছু নেই, উইলিয়াম ফারিসের গ্রেডিং সিস্টেম নিয়েও তেমনি রয়েছে প্রচুর সমালোচনা। বিষয়টা এমন না যে, গ্রেডিং সিস্টেম আসলে অযোগ্য একটা সিস্টেম, পৃথিবীর কোন দেশেই এটি কাজে লাগবে না। মূল কথা হলো, গ্রেডিং সিস্টেমের জন্য আমরা তখন প্রস্তুত ছিলাম না, বা এখনও প্রস্তুত হয়েছি কি না, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কিভাবে এই সিস্টেমকে ডেভেলপ করা দরকার ছিলো, ২০০১ এ যখন মূল্যায়ন পদ্ধতির এত বড় পরিবর্তন এলো তখন শিক্ষাক্ষেত্রের অন্য সব বিষয় পারফেক্ট ছিলো কি না, অন্য কোন বিষয়ে আগে পরিবর্তন করা দরকার ছিলো কি না- এগুলো নিয়ে আমরা কী কাজ করেছি।
গ্রেডিং সিস্টেমের নিজস্ব কিছু সমস্যা আছে। এর ফলে একই গ্রেড পাওয়া কিছু স্টুডেন্টকে একটা গ্রুপ করে ফেলা হয়। প্রত্যেককে স্বতন্ত্র্যভাবে দেখা হয় না। এই সিস্টেমে একই গ্রেড পাওয়া প্রত্যেক স্টুডেন্টকে সমান হিসেবে ধরা হয়, তাদের ডেভেলপমেন্ট কতটুকু, জানার পরিধি, আগ্রহ কতটুকু এগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এখানে স্টুডেন্ট নিজস্বতা দেখানোর, মাথা খাটানোর সুযোগ নেই। কেউই ইন্টেলেকচুয়ালি রিস্ক নিয়ে কত গ্রেড পেতে চায় না। সবাই গ্রেডিং এর বেঞ্চমার্ককে ছুঁতে চায়, ভালো গ্রেড পেতে যতটুকু লেখাপড়াকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে তার বাইরে চিন্তা ভাবনা করতে চায় না।
আমাদের সমস্যাটা আরও ভয়াবহ। কারিকুলাম, পাঠ্যবই আধুনিক নয়, অনেক টিচাররাই মানসম্পন্ন নন, অভিভাবকদের মধ্যে বিকৃত প্রতিযোগীতামূলক মনোভাব, এডুকেশনের সাথে বাস্তব জীবনের কোন সম্পর্ক নেই- এর কোনকিছু সংস্কার না করে আমরা এডুকেশন সিস্টেমের অন্যতম একটা সেনসিটিভ জায়গায় আঘাত করলাম। বাংলাদেশে ডিমান্ড এবং সাপ্লাইয়ের সামঞ্জস্যতা নেই। চাহিদার তুলনায় সম্পদ সীমিত। যৌথ পরিবারের সংস্কৃতি, পরিবারে একে অন্যের প্রতি যে দায়বদ্ধতা, মানবিক অনুভূতি- তাতে শুধুমাত্র নিজেকে নিয়ে ভাবার অবকাশ নেই। তাই যতই আমরা চাই না কেন, প্রতিযোগীতাকে সম্পূর্ণরূপে জীবন থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তুতি আমাদের নেই। তাই মূল্যায়ন পদ্ধতি, পরীক্ষার রেজাল্ট, চাকুরি পাওয়া- আমাদের মত একটি দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যায়ন পদ্ধতির মধ্যে যদি বড় ধরণের ভুল কিছু থাকে, তাহলে এর খেসারত প্রজন্মের পর প্রজন্মকে দিয়ে যেতে হবে।
এই ভুলটাই হয়েছে। যেহেতু আমাদের এডুকেশন ফিলোসফিতে বড় ধরণের কোন পরিবর্তন আসেনি তাই শুধুমাত্র মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনে উন্নত বিশ্বের সাথে নিজেদের ফলাফলটাকে তুলনা করা ছাড়া এর আর কোনো সুফল আমরা পাইনি। শিক্ষাক্ষেত্রে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি, মূল্যায়ন পদ্ধতির ভিত্তিরও কোন সংস্কার হয়নি- এসব পরিবর্তন না করে এভাবে ডিভিশন থেকে গ্রেডিং সিস্টেমে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা আসলে নেই। ফলাফলের প্রকাশভঙ্গী ছাড়া আগের মার্কিং পদ্ধতির সাথে বর্তমান গ্রেডিং পদ্ধতির মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। আগে আশির উপরে নম্বর পেলে আগে যেখানে লেটার মার্কস বলা হতো, এখন সেখানে বলা হচ্ছে জিপিএ ৫। অর্থাৎ শুধু মূল্যায়নের স্কেলটি পরিবর্তিত হয়েছে। আশি-কে এখন পাঁচ বা এ+ বলা হচ্ছে- এর বেশি কিছু নয়।
২০০১ সালে যখন প্রথমবারের মত এসএসসিতে গ্রেডিং সিস্টেম চালু হয় তখন ফোর্থ সাবজেক্ট বা চতুর্থ বিষয়ের নাম্বার যোগ করা হলো না। যেখানে লেখাপড়ায় এমনিতেই অনেক কম্পিটিশন, সেখানে পুরো একটা বিষয়ের নাম্বারই যোগ হবে না, এটার মত অযৌক্তিক আর কি হতে পারে। যাই হোক, এরপরের বছর থেকে চতুর্থ বিষয়ের নাম্বার যোগ করা শুরু হলো। ফলে প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা রেজাল্টের ক্ষেত্রে অন্য যে কোন ব্যাচের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হলেন। এরপর পরীক্ষায় সৃজনশীল পদ্ধতি এসেছে, পিইসি, জেএসসি পরীক্ষা সংযোজন হয়েছে, কারিকুলাম, পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন হয়েছে, সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে পাবলিক পরীক্ষার খাতা দেখার স্ট্র্যাটেজিও চেঞ্জ হয়েছে। এর মধ্যে নকল, প্রশ্ন ফাঁস, রাজনৈতিক অস্থিশীলতা, শিক্ষকদের খাতা দেখার উদারনীতি, বিভিন্ন বোর্ডে বিভিন্ন মানের প্রশ্ন পত্র- এই সবকিছুতে ভর করে বছর বছর ভয়াবহ হারে জিপিএ ফাইভের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু পড়াশোনার মান বাড়েনি। অর্থাৎ ২০০১ সালে জিপিএ ৩.৫ পাওয়া আর ২০১২ সালে জিপিএ ৩.৫ পাওয়া কখনোই একই বিষয় নয়। আবার ২০০৯ সালের ঢাকা বোর্ডের জিপিএ ৩.৫ আর যশোর বোর্ডের জিপিএ ৩.৫ এর মধ্যে কোন সমন্বয় নেই। তাহলে দেশের মধ্যেই আমরা জিপিএ এর মান তুলনা করতে পারি না, আন্তর্জাতিকভাবে মান তুলনা করবো কিভাবে? অথচ আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডের নামে এই পদ্ধতিই আমরা বছরের পর বছর ধরে রেখেছি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সুলতান মাহমুদ রানা ও ড. একরাম হোসেনের লেখা, দৈনিক সমকালে প্রকাশিত একটি আর্টিকেলে জানা যায়, “বর্তমানে গ্রেডিং পদ্ধতি শুধু এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষাতেই চালু নেই, স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়েও চালু হয়েছে। তবে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত মোট মান জিপিএ ৫, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোট মান জিপিএ ৪ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত স্নাতক (পাস) পরীক্ষায় মোট মান জিপিএ ৫ ধরা হয়েছে। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত জিপিএ সমান হলেও পরীক্ষার ভেদে মূল্যমান সমান হয় না। কেননা স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষার প্রাপ্ত জিপিএ ৪ এবং স্নাতক (পাস) জিপিএ ৪ এক নয়। এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক (সম্মান), স্নাতক (পাস), মাস্টার্স সব পরীক্ষায়ই প্রাপ্ত জিপিএ ৩.৫ হলেও সব পরীক্ষার মূল্যমান কিন্তু সমান নয়। কেননা, কোথাও স্কেল ৫ আবার কোথাও ৪ রয়েছে।”
দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত এক সংবাদে দেখা যায়, “গত দেড় দশকে শিক্ষার্থী মূল্যায়ন পদ্ধতিও অন্তত তিনবার পরিবর্তন করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে- গ্রেডিং পদ্ধতি, এসবিএ (স্কুলভিত্তিক মূল্যায়ন) ও ধারাবাহিক মূল্যায়ন। ২০০৭ সালে এসবিএ চালু করতে গেলে এক শ্রেণীর শিক্ষকের দুর্নীতিতে হোঁচট খায়। এ পদ্ধতি অনুযায়ী শিক্ষক স্কুলেই শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করে নম্বর দেবেন। তখন শিক্ষকরা এ পদ্ধতিকে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে নেন। পরে সমালোচনার মুখে এক বছরেই তা স্থগিত করা হয়। এখন ধারাবাহিক মূল্যায়নের নামে এ পদ্ধতিই আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে, যা স্বাস্থ্য ও শারীরিক শিক্ষা, চারু ও কারুকলা, ক্যারিয়ার শিক্ষা বিষয়ের মাধ্যমে চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।”

২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থী মূল্যায়নে ‘স্টান্ডার্ডাইজেশন’ (প্রমিতকরণ) নামে নতুন পদ্ধতির কথা প্রকাশ করেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী। গ্রেডিং সিস্টেম বহাল রেখেই শিক্ষার্থীর ফল তৈরি করা হবে। এই পদ্ধতি অনুযায়ী, খাতায় প্রাপ্ত নম্বর সরাসরি শিক্ষার্থীকে দেয়া হবে না। এ ক্ষেত্রে কোনো বিষয়ে শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত নম্বর থেকে ওই বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বরের গড় সংখ্যা দিয়ে বিয়োগ করা হবে। এরপর প্রাপ্ত ফল ওই বিষয়ে সব শিক্ষার্থীর নম্বর প্রাপ্তির তারতম্য (স্টান্ডার্ড ডেভিয়েশন) দিয়ে ভাগ করা হবে। এরপর যা আসবে সেটিই শিক্ষার্থীকে দেয়া হবে। এই পদ্ধতি আনা হলে প্রতিবছর কত শতাংশ শিক্ষার্থীকে জিপিএ-৫ দেয়া হবে তা সরকারিভাবে নির্ধারণ করা হবে।
এ পদ্ধতি প্রবর্তনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটের (বেডু) পরিচালক রবিউল কবীর চৌধুরী। তিনি সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে আমরা শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত নম্বর সরাসরি যোগ করে ফলাফল দিয়ে থাকি। পৃথিবীর কোথাও এটা করা হয় না। এতে একজন শিক্ষার্থীকে প্রকৃত অর্থে মূল্যায়ন করা হয় না। ফলে আমরা ভালো ছাত্র আর দুর্বল ছাত্রকে চিহ্নিত করতে পারি না। তাই স্টান্ডার্ডাইজেশন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী মূল্যায়নের চিন্তা করছে সরকার। বর্তমানে আইইএলটিএস, টোফেল, স্যাট, জিআরই এমনকি ইংরেজি মাধ্যমের ‘ও’ এবং ‘এ’ লেবেল পরীক্ষাসহ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন পরীক্ষায় এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্টান্ডার্ডাইজেশন’ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী মূল্যায়নে কয়েকটি দিক বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে, প্রশ্নপত্রের মান বা তা কতটা কঠিন-সহজ ছিল, পরীক্ষকের নম্বর দেয়ার প্রবণতা বা তিনি কম-বেশি নম্বর দিয়েছেন কিনা ইত্যাদি। এ ছাড়া পরীক্ষার হলের পরিবেশ, উত্তর দেয়ার জন্য শিক্ষার্থীর প্রশ্ন নির্ধারণের ক্ষমতা (সহজ না কঠিন প্রশ্ন বেছে নিয়েছে) বিবেচনায় নেয়া হয়। ক্লাসরুমে পাঠদান (শিক্ষক কতটা সফলভাবে পড়িয়েছেন), জেন্ডার, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। বর্তমানে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার ফল পায়। কিন্তু এটা তার সত্যিকার প্রাপ্ত নম্বর নয়। প্রতিবছর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ভর্তির চিত্র দেখলেই বোঝা যায়। কেননা, সেখানে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সঙ্গে অন্য গ্রেডের শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়। এর মানে হচ্ছে, কম জিপিএধারীরা ভালো ছাত্র ছিল। তাই অর্থপূর্ণ নম্বর দিতেই উল্লিখিত পদ্ধতি প্রবর্তনের ঘোষণা আসছে। এটা প্রয়োগ করলে শিক্ষার্থীর র্যাঙ্ক অর্ডারে (যে রেজাল্ট করার কথা) কোনো পরিবর্তন আসবে না।
অনেকেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন, স্কুলে যে প্রতি বছরের শেষে শিক্ষকেরা প্রত্যেক ছাত্রের মূল্যায়ন রিপোর্ট বানান, এটাকে পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে বা উচ্চশিক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কাজে লাগানো যায় কি না। কিন্তু আশঙ্কা করা হয় যে, স্কুলের পরীক্ষার রেজাল্টকে গুরুত্ব দিলে স্কুলে স্কুলে যে প্রতিযোগীতা, নিজের স্কুলের রেজাল্ট ভালো দেখানোর যে প্রবণতা- এগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে দুর্নীতির নতুন দুয়ার খুলে দেওয়া হবে। আমরা যদি শিক্ষার সত্যিকারের লক্ষ্যে পৌঁছতে চাই, শিক্ষার্থীদের সত্যিকার অর্থেই শিক্ষিত করতে চাই, দেশের উন্নয়নের কথা ভেবে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি চাই, তাহলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষায় হোঁচট খাচ্ছে, এই সমস্যার সমাধানেই গ্রেডিং সিস্টেমের আগমন। এখন তাহলে দেখা যাক, দেশের বাইরে পড়তে চাইলে পরীক্ষার ফলাফল কিভাবে মূল্যায়িত হয়? মূলত উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়তো, ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং, কোর্সের আউটলাইন, সিলেবাস, কোর্স লেভেল সম্পর্কিত , কোর্স এসেসমেন্টের পদ্ধতি (পরীক্ষা, রচনা, প্রজেক্ট ওয়ার্ক ইত্যাদি), গ্রেডিং সিস্টেম সংক্রান্ত তথ্য, কোর্সের মেয়াদ, লেকচার-ঘন্টা, ল্যাবরেটরিতে কাজের ঘন্টা, ফিল্ডওয়ার্ক, কো-কারিকুলার এক্টিভিটি- এই সব কিছুর উপরে পয়েন্ট দেওয়া হয়। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, শুধুমাত্র গ্রেড পয়েন্ট দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষায় কোন লাভ হয় না। যদি সত্যিই বাংলাদেশের এডুকেশনকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকে, তাহলে বাকি সমস্ত সেক্টরে নজর দিতে হবে।
গ্রেডিং সিস্টেম পাবলিক পরীক্ষার মূল্যায়নে ভূমিকা রাখলেও এটা বাদে আমাদের স্কুল-কলেজে যে ইন্টার্নাল এক্সামিনেশন হয় তা কি যথার্থ? এই ধরণের পরীক্ষাগুলোতে শিক্ষক কর্তৃক নির্বাচিত কয়েকটি প্রশ্ন দেওয়া হয়। এই ধরণের নির্বাচিত প্রশ্ন সিলেবাসের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের ওপর রচনা করা হয়। ফলে পাঠ্যবস্তুর অন্যান্য অংশের জ্ঞান স্টুডেন্টদের আছে কি না, তা জানা যায় না। অনেকে বলতে পারেন, বাকি পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে পুরো সিলেবাস তো কভার হয়ে যায়। কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে, প্রত্যেক পরীক্ষাতেই নিজের ইচ্ছামত কয়েকটি প্রশ্ন সিলেক্ট করে লেখার অপশন থাকে, অনেক সময় কপালগুণে প্রশ্ন কমন পড়তে পারে, যাদের এক্সাম স্ট্র্যাটেজি ভালো তাদের পরীক্ষা ভালো হওয়ার সুওযাগ থাকে। এক্সাম স্ট্র্যাটিজি ভালো থাকাকে সাধুবাদ জানানোই যায়, কিন্তু এক্সামের মূল লক্ষ্য যেহেতু জ্ঞান পরিমাপ করা, সেক্ষেত্রে টিচারের পছন্দের কিছু প্রশ্ন পড়ে, কোনো কোনো চ্যাপ্টার সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে, কিছু চ্যাপ্টারের বিশেষ কিছু অংশ ভালো করে পড়ে বাকি অংশ বাদ দিয়ে (যেখানে পুরো চ্যাপ্টার ভালো করে না বুঝলে বিষয়টা সম্পর্কে জানাই হবে না) যদি পরীক্ষায় ভালো করা যায়, সেখানে মেধা চিহ্নিত করা দুরূহ কাজ।
আমাদের দেশের মূল্যায়ন পদ্ধতি পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ত্রুটিপূর্ণ করে দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় পাশের জন্যই পড়ে, শিক্ষকেরাও পরীক্ষায় পাশ করানোর জন্যই পড়ান। এর বাইরে আর কিছু নেই। এই মূল্যায়ন পদ্ধতিতে সহযোগিতার কোন স্থান নেই। অথচ উচ্চশিক্ষায় বা চাকুরি ক্ষেত্রে কম্পিটিশন আছে বলেই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সব বিষয়ে কম্পিটিশন করে বড় হতে হবে- তা তো নয়। প্রতি বছর শেষের পরীক্ষাগুলো আমাদের সবাইকে একটা ছাঁচে ফেলে দিয়েছে। এই অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার কোন যৌক্তিকতা নেই।
এইসব পরীক্ষার ফলাফলের উপর তেমন নির্ভর করা যায় না। এই ক্লাসে পড়ে, একই স্টুডেন্টের, এই বিষয়ে দুইবার পরীক্ষা নিলে এবং একই টিচার দ্বারা উত্তরপত্র মূল্যায়ন করালে দেখা যাবে, দুইটি পরীক্ষার নাম্বারে ভিন্নতা আছে। আর এই কাজটাই যদি দুইজন পরীক্ষককে দিয়ে করানো যায়, তাহলে বলা যায় না সে একটা পরীক্ষায় ফেল আরেকটা পরীক্ষায় পাশ করে বসতে পারে। এই ধরণের মূল্যায়ন পদ্ধতি স্টুডেন্ট এবং টিচারের ব্যক্তিগত নানারকম বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করে। বিশেষ কোন প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষার্থী যা লেখে, সেই উত্তর বিচার করার সময় টিচার তার নিজস্ব ব্যক্তিগত ধারণা, মতবাদ, রুচি ইত্যাদির দ্বারা প্রভাবিত হন। ফলে, এই ধরণের পরিমাপে পার্সোনাল এরর থেকে যায়। টিচারের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন এবং পরীক্ষা দেওয়ার সময় শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত মানসিক অবস্থা রেজাল্টকে প্রভাবিত করে। এ থেকে বোঝা যায়, আমাদের মূল্যায়ন পদ্ধতির আদতে কোন নির্ভরযোগ্যতা নেই।
শিক্ষার্থীদের যে পরীক্ষায় নাম্বার দেওয়া হয়, এটার কোন নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা নীতিমালা আমাদের নেই। কোন শিক্ষার্থী কোন বিশেষ বিষয়ে যে নাম্বার পেলো, তার ভ্যালুটা আসলে কি তা স্পষ্ট না। দু’জন শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত নম্বরের পার্থক্য কি প্রকাশ করছে, তাও বোঝা মুশকিল। দু’জন স্টুডেন্টের প্রাপ্ত নম্বর এক হলেই তাদের জ্ঞান এক এটা বলা যায় না, আবার দুইজনের নম্বরের পার্থক্য থাকলেই তাদের জ্ঞানের পার্থক্য আছে তাও বলা যায় না। এছাড়াও পরীক্ষায় কয়টি প্রশ্ন থাকবে, সময় কত থাকবে তা নির্দিষ্ট থাকে। পরীক্ষার প্রশ্নের রকমভেদে সময়ের বন্টন করা হয় না। কোন কারণে প্রশ্নের উত্তরের তুলনায় সময় কম থাকলে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। ফলে তাদের জানা থাকলেও তারা জ্ঞান প্রকাশের সুযোগ পায় না।
এই ধরণের মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বাৎসরিক যে পরীক্ষা নেওয়া হয় তারও কোন যৌক্তিকতা নেই। মাত্র তিন বা চার ঘন্টা সময়ের মধ্যে পাঁচ ছয়টি প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর পুরো বছরের পারফরমেন্সকে বিবেচনা করা হয়। ফলে, কোন স্টুডেন্ট যদি ওই নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে কোন বিশেষ দৈহিক বা মানসিক কারণে নিজেকে প্রকাশ করতে না পারে তাহলে সে অযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়। সে ক্লাসে কেমন মনোযোগী ছিলো, আচরণ কেমন ছিলো — এগুলো কোনটাই ধরা হয় না। ফলে স্টুডেন্টরা দৈনন্দিন ক্লাসে তেমন আগ্রহ খুঁজে পায় না।
স্কুল কলেজের পরীক্ষাগুলোতে বোঝার চেয়ে মুখস্ত করাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। সিলেবাস অনেক বড় থাকে সময়ের তুলনায়, পরিবারের চাপ থাকে ভালো রেজাল্ট করবার জন্য, সবচেয়ে বড় কথা সবার সামনে রেজাল্ট দিয়ে কিছু কিছু স্টুডেন্ট চোখে আঙুল তুলে দেখানো হয় যে, তুমি খারাপ স্টুডেন্ট- এইসব কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুখস্ত করে শর্টকাটে ভালো রেজাল্ট করার প্রবণতা দেখা যায়।
মূল্যায়ন পদ্ধতির সাথে সিলেবাসের এক গভীর যোগাযোগ আছে। পরীক্ষায় ভালো করা বলতে আমরা আসলে ভালোভাবে সিলেবাস শেষ করাকে বুঝি। অর্থাৎ ভালো করে বললে একজন শিক্ষার্থী এক বছরে কি কি যোগ্যতা অর্জন করলে তাকে পরবর্তী শ্রেণীর জন্য যোগ্য বলে ধরে নেওয়া হবে সেটাই মূলত সিলেবাস বা পাঠ্যসূচীতে থাকে। আমাদের দেশে বেশিরভাগ স্কুলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নির্দেশ অনুযায়ী সিলেবাস মানা হয় না। অনেকে অবাক হতে পারেন যে, বইতে যা আছে স্কুলে তো তাই পড়ানো হয়। তাহলে সিলেবাস অন্যরকম হবে কিভাবে? ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রকাশিত প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ের শিক্ষক সংস্করণ অনুযায়ী,
পাঠ ৪ ‘আতা গাছে তোতা পাখি’ ছড়াটির অর্জন উপযোগী যোগ্যতা হলো-
- শোনা (ছড়া ও কবিতা শুনে আনন্দ লাভ করবে)
- বলা (পাঠ ও পাঠবহির্ভূত ছড়া স্পষ্টভাবে বলতে পারবে)
শিখনফল
- শোনা (ছড়া শুনে আনন্দ লাভ করবে এবং তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে)
- বলা (পাঠ্যবইয়ের ছড়া স্পষ্টভাবে বলতে পারবে, পাঠ্যবইবহির্ভূত ছড়া স্পষ্টভাবে বলতে পারবে)
অথচ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি স্কুলে এই ছড়াটি ক্লাসে এবং পরীক্ষায় না দেখে লিখতে হয়। ছড়াটি বইয়ের প্রথম অংশে আছে, ক্লাস ওয়ানের ছোট শিশুটিকে বছরের শুরুতেই একটা ছড়া না দেখে লেখার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। অথচ সিলেবাস মোটেই এমন হওয়ার কথা ছিলো না। নীতিমালায় থাকুক বা না থাকুক বয়সের তুলনায় সিলেবাসকে জটিল করে তুলে আদতে কি লাভ হচ্ছে? শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি জ্ঞানী হয়ে যাচ্ছে? তারা লেখাপড়ায় অনেক এগিয়ে যাচ্ছে? আসলে পরিপক্কতার তুলনায় তার উপরে এমন অযৌক্তিক চাপ দিয়ে তাকে ধ্বংসের পথেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কেবল!
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে এম মামুন হোসেনের লেখা যায় যায় দিনে প্রকাশিতব্য ‘বেশি পাবলিক পরীক্ষা দিতে হয় বাংলাদেশের শিশু কিশোরদের’ শীর্ষক লেখায় দেখা যায়, ”দক্ষিণ এশিয়ার সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেয় বাংলাদেশের শিশু-কিশোররা। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় শেষ করার আগেই শিক্ষার্থীরা পঞ্চম, অষ্টম, দশম ও দ্বাদশ শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেয়। এগুলো হচ্ছে প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী, জেএসসি/জেএসডি, এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রীলংকায় একাদশ ও ত্রয়োদশ শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। আর ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ ও ভুটানের শিক্ষার্থীরা দশম ও দ্বাদশ শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেয়। নেপালের শিক্ষার্থীরা অষ্টম, দশম ও দ্বাদশ শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। গত কয়েক দশকে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পরীক্ষার সংখ্যা কমানো হয়েছে। ভুটান প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক শ্রেণিতে পরীক্ষার সংখ্যা কমিয়েছে। ভারতের অনেক রাজ্যে আগে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বার্ষিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত করা হতো। কিন্তু ভারতের সব রাজ্যে দশম শ্রেণির আগে বোর্ড পরীক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে পাঠ্যবই মুখস্তভিত্তিক পরীক্ষা ব্যবস্থা বিদ্যমান। এ পদ্ধতি শিক্ষার্থীর পরিপূর্ণ দক্ষতা প্রকাশ করে না বলে বিশ্বব্যাংকের নিরীক্ষায় বলা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়েছে, শ্রেণিকক্ষে উন্নত শিক্ষণ কিংবা শেখার চর্চা নেই। শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন পরীক্ষার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল। একজন শিক্ষার্থীকে পঞ্চম শ্রেণি শেষ করতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, অষ্টম শ্রেণির ক্ষেত্রে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), দশম শ্রেণির ক্ষেত্রে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) এবং দ্বাদশ শ্রেণির ক্ষেত্রে উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। ২০০৯ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা এবং ২০১০ সালে অষ্টম শ্রেণিতে জেএসসি পরীক্ষা চালু করা হয়েছে। এর আগে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষা নেয়া হতো।”
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সমূহ হতাশা থাকলেও আশাও রয়েছে প্রচুর। তবে সবার আগে শিক্ষাক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। উপর্যুপরি কাঁটাছেড়া বন্ধ করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, চৌদ্দ বা ষোল বছর ধরে স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সটিতে লেখাপড়াতেই শিক্ষা শেষ নয়, লেখাপড়ার উপরে ভিত্তি করেই এদেশের গড় মানুষকে পুরো জীবন চলতে হয়। তাই এডুকেশন সিস্টেমের প্রত্যেকটি বিষয় তীব্র সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
৪
৪ মন্তব্য