Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ জুন, ২০২৫ ০৭:০৫ পূর্বাহ্ণ

ড্রাগন চাষ পদ্ধতি। কিভাবে ড্রাগন চাষ করবেন

ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. উপযুক্ত জমি ও মাটি নির্বাচন:

ড্রাগন ফল চাষের জন্য সুনিষ্কাশিত উঁচু বা মাঝারি উঁচু উর্বর জমি নির্বাচন করতে হবে। দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি ড্রাগন ফল চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো। মাটির pH ৬.০-৭.০ এর মধ্যে থাকা উচিত। জলাবদ্ধতা এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ এটি গাছের ক্ষতি করে।

২. চারা তৈরি ও রোপণ:

 * চারা তৈরি: ড্রাগন ফল সাধারণত কাটিং (শাখা কলম) এর মাধ্যমে বংশ বিস্তার করে। বীজ থেকে চারা তৈরি করা গেলেও তাতে ফল আসতে অনেক সময় লাগে। বয়স্ক এবং শক্ত শাখা ১ থেকে ১.৫ ফুট কেটে হালকা ছায়াতে বেলে দোআঁশ মাটিতে গোড়ার দিকের কাটা অংশ পুঁতে সহজেই চারা উৎপাদন করা যায়।

 * রোপণের সময়: মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য অক্টোবর মাস ড্রাগন ফল রোপণের জন্য উপযুক্ত সময়।

 * গর্ত তৈরি: চারা রোপণের আগে ১.৫ মিটার দৈর্ঘ্য, ১.৫ মিটার প্রস্থ ও ১ মিটার গভীরতার গর্ত তৈরি করে ২০-২৫ দিন খোলা রাখতে হবে।

 * গর্ত ভরাট: প্রতি গর্তে ২৫-৩০ কেজি পচা গোবর, ২৫০ গ্রাম টিএসপি, ২৫০ গ্রাম এমওপি, ১৫০ গ্রাম জিপসাম এবং ৫০ গ্রাম জিংক সালফেট সার গর্তের মাটির সাথে ভালো করে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করে দিতে হবে। প্রয়োজনে সেচ দিতে হবে।

 * চারা রোপণ: গর্ত ভরাটের ১০-১৫ দিন পর প্রতি গর্তে ৫০ সেমি দূরত্বে ৪টি করে চারা সোজাভাবে মাঝখানে লাগাতে হবে।

৩. সাপোর্ট সিস্টেম:

ড্রাগন ফল একটি লতানো ক্যাকটাস জাতীয় গাছ। তাই এর বেড়ে ওঠার জন্য সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। প্রতিটি খুঁটির মাঝখানে একটি সিমেন্টের ৪ মিটার লম্বা খুঁটি পুততে হবে। চারা বড় হলে খড় বা নারিকেলের রশি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে, যাতে কাণ্ড খুঁটিকে আঁকড়ে ধরে বাড়তে পারে। প্রতিটি খুঁটির মাথায় একটি করে মোটরসাইকেলের পুরাতন টায়ার মোটা তারের সাহায্যে আটকে দিতে হবে। তারপর গাছের মাথা ও অন্যান্য ডগা টায়ারের ভেতর দিয়ে বাইরের দিকে ঝুলিয়ে দিতে হবে, কারণ ঝুলন্তভাবে ফল বেশি ধরে।

৪. সার প্রয়োগ:

ড্রাগন ফল গাছের বয়স অনুযায়ী সারের পরিমাণ ভিন্ন হয়:

 * ১-৩ বছর: মাদা প্রতি গোবর সার ৪০-৫০ কেজি, ইউরিয়া ৩০০ গ্রাম, টিএসপি ২৫০ গ্রাম, এমওপি ২৫০ গ্রাম।

 * ৩-৬ বছর: মাদা প্রতি গোবর সার ৫০-৬০ কেজি, ইউরিয়া ৩০০ গ্রাম, টিএসপি ৩০০ গ্রাম, এমওপি ৩০০ গ্রাম।

 * ৬-৯ বছর: মাদা প্রতি গোবর সার ৬০-৭০ কেজি, ইউরিয়া ৪০০ গ্রাম, টিএসপি ৩৫০ গ্রাম, এমওপি ৩৫০ গ্রাম।

 * ১০ বছরের ঊর্ধ্বে: মাদা প্রতি গোবর সার ৭০-৮০ কেজি, ইউরিয়া ৫০০ গ্রাম, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, এমওপি ৫০০ গ্রাম।

চারা রোপণের ১ মাস পর থেকে ১ বছর পর্যন্ত প্রতি গর্তে তিন মাস পর পর ১০০ গ্রাম করে ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে।

৫. সেচ ব্যবস্থাপনা:

ড্রাগন ফল খরা ও জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। তাই শুষ্ক মৌসুমে ১০-১৫ দিন পর পর সেচ দিতে হবে। বর্ষাকালে কম সেচ দিতে হবে এবং খেয়াল রাখতে হবে যেন গাছের গোড়ায় পানি না জমে। ড্রাগন গাছের শিকড় অগভীর হওয়ায় ১৫-৩০ সেমি গভীরতায় পানি নিশ্চিত করতে হবে। ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতি বেশ কার্যকরী।

৬. পরিচর্যা:

 * আগাছা দমন: নিয়মিত আগাছা অপসারণ করতে হবে।

 * ছাঁটাই: গাছের আকার ও আকৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে, মরা বা রোগাক্রান্ত ডালপালা অপসারণ করতে এবং ফলের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নিয়মিত ছাঁটাই করতে হবে। গাছকে একটি ছাতার মতো আকার দিতে হবে।

 * পোকা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ: এফিড এবং স্কেলের মতো সাধারণ পোকা থেকে গাছকে রক্ষা করতে হবে। রুট রট (মূল পচা) এবং স্টেম ক্যানকারের (কাণ্ডের ঘা) মতো রোগের দিকে নজর রাখতে হবে এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

৭. ফল সংগ্রহ:

ড্রাগন ফল সাধারণত চারা রোপণের ৬-১৮ মাসের মধ্যে ফল দিতে শুরু করে। ফল পুরোপুরি পেকে গেলে সংগ্রহ করতে হবে। বাংলাদেশে মে থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। কৃত্রিম আলোর সাহায্যে অফ সিজনেও ফল উৎপাদন সম্ভব।

বিশেষ টিপস:

 * প্রতিদিন গাছকে অন্তত ৬-৮ ঘণ্টা সরাসরি সূর্যালোক দিতে হবে।

 * ফল আসার আগে এবং পরে পটাশিয়াম সার প্রয়োগ করলে ফলের আকার এবং স্বাদ ভালো হয়।

 * ছাদে বা টবে চাষের ক্ষেত্রে, টবের নিচে পর্যাপ্ত নিষ্কাশনের ছিদ্র নিশ্চিত করতে হবে।

এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করে ড্রাগন ফল সফলভাবে চাষ করা সম্ভব।


মন্তব্য করুন