Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ জুলাই, ২০২৫ ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ

হাওরে জেলে ও কৃষক সন্তানদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনার হালচাল

হাওরে জেলে ও কৃষক সন্তানদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে  পড়াশোনার হালচাল:

হাওর অঞ্চলের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে বেড়ে ওঠা জেলে ও কৃষক পরিবারগুলোর ছেলে-মেয়েরা আজও শিক্ষার আলো থেকে অনেকটাই দূরে। যদিও বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে জাতীয়ভাবে বিস্তর উন্নয়ন হয়েছে, হাওরের বাস্তবতায় শিক্ষা এখনো একটি দুর্লভ সম্পদ। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে নিয়মিত পাঠ গ্রহণে ব্যর্থ হচ্ছে। এই ব্লগে  আলোচনা করবো কীভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষিকাজ, পারাপার ব্যবস্থা ও মৌসুমি বাস্তবতা হাওরের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে প্রভাব ফেলছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ: বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রতিনিয়ত

হাওর অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে দীর্ঘমেয়াদী প্লাবন, আকস্মিক জলোচ্ছ্বাস, এবং নদীর তীব্র ঢেউ ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত প্রায় অসম্ভব করে তোলে। অনেক এলাকায় বিদ্যালয় সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পানির কারণে। ফলে শিক্ষার্থীদের একটানা স্কুলে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। বৈরি আবহাওয়ার কারণে ছুটির নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই ছেড়ে দিতে হয় ফলে নির্ধারিত সময়ে সিলেবাস সম্পূর্ণ করা যায় না ।

ঝুঁকিপূর্ণ নৌযাত্রা: বিশেষ করে দুর্বল কাঠামোর নৌকায় যাতায়াত করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পড়তে হয়।অভিভাবকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়, যার ফলে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া আরও সীমিত হয়ে পড়ে।

 ফসল রোপণ ও ঘরে তোলা: শিক্ষার সঙ্গে সময়ের দ্বন্দ্ব

হাওরের কৃষিজীবী পরিবারগুলোর জীবিকা ধানচাষের উপর নির্ভরশীল। ধান রোপণ ও ঘরে তোলার মৌসুমে কৃষকদের ছেলে-মেয়েরা পরিবারের সহায়ক শক্তি হিসেবে মাঠে নেমে পড়ে। ফলে স্কুলমুখী হওয়া তাদের পক্ষে আর সম্ভব হয় না।অনেক শিক্ষার্থী ১৫-২০ দিন পাঠচ্যুতি ঘটে।পরীক্ষার সময় এই শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে, ফলে ফেল করে বা স্কুল ছেড়ে দেয়।

অব্যবস্থাপনায় ভরা পারাপার ব্যবস্থা

বর্ষাকালে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে হয় নৌকা, ডিঙি বা হাঁটু পানির পথ মাড়িয়ে। কোথাও কোথাও সেতু বা রাস্তার অভাব শিক্ষার পথ আরও দুর্গম করে তোলে।অনেক গ্রামে এখনো বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ অপ্রতুল, ফলে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমও কার্যকর নয়।মেরামতবিহীন নৌকা বা খেয়া পারাপার ব্যবস্থায় দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে সবসময়।

 

বজ্রপাতঃ

হাওরে অন্যান্য স্থানের তুলনায় খোলা জায়গা বেশি থাকায় বজ্রপাতের সংখাটা বেশি পরিমানে হয়ে থাকে বিধায় একটু বৃষ্টিপাত হলেই শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায় ,যার ফলে বিদ্যালয়ের সার্বিক ফলাফল আশানুরূপ হয়না ।রাষ্ট্রের পবলিক পরীক্ষা প্রতিযোগিতায় ও এর প্রভাব পড়ে ।এর ফলে শহর ও হাওরের শিক্ষার্থীদের মেধার তারতম্য পরিলক্ষিত হয়।

 ফলে যা ঘটেঃ

শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বাড়ে, বিশেষ করে মেয়েদের।অনেকে অর্ধশিক্ষিত অবস্থায় বিয়ে, বা মৎস্যজীবী কাজে যুক্ত হয়ে পড়ে।শিক্ষকদের পক্ষে ধারাবাহিক পাঠদান অসম্ভব হয়ে পড়ে।

 সম্ভাবনার আলো: করণীয় কিছু প্রস্তাবঃ

1.  ভাসমান বিদ্যালয় / নৌকা স্কুল চালু করা যেতে পারে বর্ষায়।দুই শিফটে ক্লাস আয়োজন করা যেতে পারে ফসল মৌসুমে বিবেচনা করে।

2.  স্কুলে হোস্টেল বা আবাসিক সুবিধা চালু করা যেতে পারে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য।

3.  সোলার বিদ্যুৎ ও মোবাইল শিক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিজিটাল ক্লাস গ্রহণ।

4.  স্থানীয় এনজিও ও সরকারী সমন্বয়ে টিউটরিং/সন্ধ্যা পাঠদান চালু করা যেতে পারে।

 উপসংহার

হাওরের জেলে ও কৃষক পরিবারগুলোর ছেলে-মেয়েরা মেধায় পিছিয়ে নয়তারা পিছিয়ে পড়ছে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা ও গঠনগত অব্যবস্থার কারণে। এই শিশুদের জন্য একটি কার্যকর ও সংবেদনশীল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুললে তারা-ই হতে পারে আগামী দিনের দক্ষ নাগরিক। হাওরের ভবিষ্যৎ গড়তে হলে, শিক্ষার বাঁধা গুলো ভেঙে প্রত্যেক শিশুর হাতে পৌঁছে দিতে হবে শিক্ষা নামক বাতি।

 

 ্মোঃ তাজুল ইসলাম ভূঁইয়া 

সহকারি প্রধান শিক্ষক

লাইমপাশা উচ্চ বিদ্যালয় 

ইটনা, কিশোরগঞ্জ।




মন্তব্য করুন