সহকারী শিক্ষক
১১ জুলাই, ২০২৫ ১০:৫৭ অপরাহ্ণ
সুরা ইখলাস অর্থসহ ব্যাখ্যা
ইখলাস হলো কুরআনের ১১২তম সুরা।
সুরা ইখলাস এর অর্থ ও ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
সুরা ইখলাস (১১২তম সুরা)
আরবি:
بِسۡمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ ١
ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ ٢
لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ ٣
وَلَمۡ يَكُن لَّهُۥ كُفُوًا أَحَدُۢ ٤
বাংলা উচ্চারণ:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
১. কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ।
২. আল্লাহুস সামাদ।
৩. লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ।
৪. ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ।
বাংলা অর্থ:
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।
১. বলুন, তিনিই আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়।
২. আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী।
৩. তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি।
৪. এবং তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।
ব্যাখ্যা:
সুরা ইখলাস কুরআনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুরা, যা আল্লাহর একত্ববাদ (তাওহীদ) সম্পর্কে মৌলিক ধারণা প্রদান করে। এর চারটি আয়াতে আল্লাহ তাআলার সত্তা ও গুণাবলির সংক্ষিপ্ত কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
* ১. কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ (বলুন, তিনিই আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়):
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলার একত্ব ঘোষণা করা হয়েছে। 'আহাদ' শব্দটি 'এক' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তবে এর অর্থ সাধারণ 'এক' থেকে ভিন্ন। এটি এমন একত্বকে বোঝায় যার কোনো দ্বিতীয় নেই, যা অবিভাজ্য এবং যার কোনো অংশীদার নেই। আল্লাহ তাঁর সত্তা, গুণাবলি ও কর্মে একক, অতুলনীয়। তাঁর কোনো শরীক নেই, না তাঁর প্রভুত্বে, না তাঁর উপাসনায়।
* ২. আল্লাহুস সামাদ (আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী):
'সামাদ' শব্দের বিভিন্ন অর্থ রয়েছে, যেমন— অমুখাপেক্ষী, আশ্রয়স্থল, চিরস্থায়ী, যার কাছে সকল প্রয়োজন তুলে ধরা হয় এবং যিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা কারো উপর নির্ভরশীল নন। তিনি সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা, এবং সকল সৃষ্টি তাঁর উপর নির্ভরশীল। প্রতিটি জীব তাঁর কাছে তাদের প্রয়োজন পূরণের জন্য আসে, কিন্তু তাঁর কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। তিনি চিরন্তন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ।
* ৩. লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ (তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি):
এই আয়াতটি আল্লাহ তাআলার বংশগত সম্পর্কহীনতার উপর জোর দেয়। এর মাধ্যমে ত্রিত্ববাদ (যেমন খ্রিস্টানদের ধারণা) এবং অন্যান্য পৌত্তলিক বিশ্বাস (যেমন দেব-দেবীকে আল্লাহর সন্তান মনে করা) প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এমন এক সত্তা, যিনি জন্ম-মৃত্যু, প্রজন্ম বা বংশের ধারণার ঊর্ধ্বে। তাঁর কোনো পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা বা স্ত্রী নেই। তিনি চিরঞ্জীব এবং সকল সৃষ্টির স্রষ্টা, জন্মদাতা নন।
* ৪. ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ (এবং তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই):
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলার অনন্যতা ও অতুলনীয়তা ঘোষণা করা হয়েছে। 'কুফু' শব্দের অর্থ সমকক্ষ, সমান বা তুলনীয়। অর্থাৎ, মহাবিশ্বে কোনো কিছুই তাঁর সমকক্ষ বা তুলনীয় নয়—না সত্তায়, না গুণাবলিতে, না ক্ষমতায়, না প্রজ্ঞায়। কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা শক্তি তাঁর সাথে কোনোভাবেই তুলনীয় নয়। তিনি সকল দিক থেকে একক ও অদ্বিতীয়।
সুরা ইখলাসের গুরুত্ব:
* তাওহীদের মূল ভিত্তি: এই সুরাটি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস তাওহীদকে সংক্ষেপে ও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এটি আল্লাহ তাআলার একত্ব, অমুখাপেক্ষিতা, জন্ম ও বংশ থেকে মুক্তি এবং অতুলনীয়তার ধারণা প্রদান করে।
* কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ: হাদিসে এসেছে, সুরা ইখলাস কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান। এর কারণ হলো, কুরআন মূলত তিনটি প্রধান বিষয় নিয়ে আলোচনা করে: তাওহীদ (একত্ববাদ), রিসালাত (নবুয়ত) এবং আখিরাত (পরকাল)। সুরা ইখলাস একত্ববাদকে সম্পূর্ণভাবে বর্ণনা করে, তাই এটি কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের মর্যাদার অধিকারী।
* শিরক থেকে মুক্তি: এই সুরা পাঠ ও এর অর্থ অনুধাবন মানুষকে শিরক (আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন) থেকে রক্ষা করে এবং আল্লাহর প্রতি বিশুদ্ধ বিশ্বাসকে সুদৃঢ় করে।
সংক্ষেপে, সুরা ইখলাস হলো আল্লাহর পরিচয় এবং তাঁর একত্বের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু ব্যাপক বর্ণনা। এটি প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আল্লাহর সত্তা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান লাভের একটি অপরিহার্য ভিত্তি।
৭১
১৪৫ মন্তব্য