সহকারী শিক্ষক
১৭ জুলাই, ২০২৫ ০৯:৫৩ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
সময় চলে যায়, মূল্যবোধ কি ফেলে যায়?
সময় এক নদীর মতো নিঃশব্দে, অবিরাম বয়ে চলে। কেউ চায় না সে থেমে যাক, আবার কেউ
বোঝে না সে ঠিক কবে দূরে হারিয়ে গেল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বদলায়,
বদলায় সমাজ, আর আজ সে বদলে গেছে এমন এক রূপে, যেখানে
হৃদয়ের জায়গায় স্থান পেয়েছে পর্দার পিক্সেল, এবং সম্মানের স্থানে উঠেছে
অহংকারের ফেনা।আমরা যারা ৯০ দশকের শিশুরা, তারা বড় হয়েছি মাটির গন্ধে, বৃষ্টির
শব্দে, সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে দাদির মুখে শোনা গল্পে। আমাদের কাছে “আপনি” শব্দটি
ছিল শ্রদ্ধার চাদর, আর “ধন্যবাদ” ছিল মনের প্রসাদ।
আজকের দিনে—সেই চাদর ছিঁড়ে গেছে, আর সেই প্রসাদ
যেন এখন কেবল ইমোজির হাসিতে সীমাবদ্ধ।
হারিয়ে যাচ্ছে হৃদয়, গাঢ় হচ্ছে মুখোশ।
এককালে যে সমাজে মানুষ গৃহদ্বারে
দাঁড়িয়ে সুধী হতো, আজ সেখানে মানুষ নিজ গৃহেই একা। পাশের বাসায় কে থাকে জানা
নেই, অথচ হাজার মাইল দূরের “ফলোয়ারের” ছবিতে আমরা লাইক দিই, কমেন্ট করি—যেন সেটাই আজকের আত্মীয়তা।
মানুষের মুখে হাসি আছে, কিন্তু চোখে আর ভরসা নেই। শিশু কাঁদে মায়ের কোলে নয়, ফোনে
ইউটিউব না পেলে। বৃদ্ধ বাবা দাঁড়িয়ে থাকেন জানালার ধারে-একটা ডাক পাওয়ার আশায়, যা আসে না।
সম্মানের সংকট-প্রযুক্তি না শাসনের অভাব?
বাড়িতে বাবা-মার শাসন ছিল যেমন,
তেমনি ভালোবাসার আশ্রয়ও ছিল। এখন সেই শাসন যেন “মানসিক অত্যাচার” বলে বিবেচিত
হয়।
শিক্ষক যদি শাসন করেন, অভিভাবক বলেন,“আমার ছেলেকে
স্পর্শ করবেন না।” অথচ সেই শিক্ষকই তো ছিলেন ভবিষ্যৎ গঠনের কারিগর। আজকে সেই
কারিগরকে আমরা সন্দেহ করি, অপমান করি, ভুলে যাই শ্রদ্ধা না থাকলে শিক্ষা বৃথা।সবকিছু
কি প্রযুক্তির দোষে? নাকি আমরাই শিক্ষা ও পরিবার থেকে সেই আলো নিভিয়ে দিয়েছি?
আজকের সন্তান যেন অনেক জানে, কিন্তু অনুভব করতে শেখে না। সে সেলফি তুলতে জানে,
কিন্তু কারো চোখের জল পড়লে পাশে বসে থাকাটা শেখেনি।
নবীন প্রজন্ম—দোষারোপ না, দায়িত্ব বোঝা উচিত
৯০ দশকের আমরা জানি, মানুষকে সম্মান
দিলে সে ভালোবাসা ফিরিয়ে দেয়। আজকের প্রজন্ম সেটা শেখেনি, কারণ কেউ তাদের শেখায়নি।
আমরা যদি শুধু বলি,“এরা খারাপ”, তাহলে দায়িত্ব এড়িয়ে
যাই।
তবে হ্যাঁ, সময়ের দাবি আছে। যুগ বদলাবে। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমাদের ভেতরের
সৌন্দর্য যদি মরে যায়—তাহলে বেঁচে থাকার মানে কোথায়?আমরা
চাই যেন তারা শিখে ভালোবাসা কেবল ভালো ক্যাপশন নয়, বরং
নীরব স্নেহ। সম্মান কেবল সিনিয়রকে হ্যালো বলা নয়, বরং চোখে চোখ রেখে আন্তরিক
শ্রদ্ধা প্রকাশ। সামাজিক যোগাযোগ হোক হৃদয়ের, কেবল মোবাইলের না।
সময় থামে না, কিন্তু মানুষ থামতে জানে
সময় গেছে, যাচ্ছে, যাবে। কিন্তু
মূল্যবোধ যদি না থাকে, তবে মানুষ থাকবে কেবল অবয়বে,আত্মায় নয়।
আমরা যারা সেই পুরনো দিনের গল্প জানি, আমাদের দায়িত্ব এখন গল্প শোনানোর নয়,আবার গল্প গড়ার।
চলুন, পরের প্রজন্মকে শিখিয়ে যাই,তারা যেন
শুধু স্মার্ট না হয়, হৃদয়বানও হয়। যেন তারা জানে,
“সম্মান দিলে সম্মান পাওয়া যায়, ভালোবাসা
দিলে ভালোবাসা ফেরে।” যদি ইচ্ছা থাকে, আগামীকালকে বদলানো যায়
আজকের শিক্ষা দিয়ে। কিন্তু তার জন্য দরকার পরিবারে ভালোবাসা, শিক্ষায় মানবতা, আর
সমাজে একটুখানি সহানুভূতি।
৪
৬ মন্তব্য