Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ জুলাই, ২০২৫ ০২:২২ পূর্বাহ্ণ

শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন! অভিশাপ নাকি আশির্বাদ ?

স্কুল-জীবনের স্মার্টফোনঃ শিক্ষার পথ সহজ, নাকি বাঁধার দেয়াল?

 

মনিরুল হক,

বর্তমান বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের হাতে স্মার্টফোন থাকা যেন এক সাধারণ চিত্র হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির পাশাপাশি অনলাইন শিক্ষা, সহজতর যোগাযোগ এবং নানা তথ্যের সহজ প্রাপ্তি বাস্তবতায় এই ডিভাইসটি কিশোরদের জীবনযাপনে ব্যাপক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। তবে সুবিধার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানামাত্রিক চ্যালেঞ্জও। এই বড় আকারের ফিচারে স্মার্টফোনের কার্যকর ও ক্ষতিকর দুই দিকের পাঠ তুলে ধরা হলো।

 

সুবিধা: শিক্ষার্থী জীবনে স্মার্টফোনের ইতিবাচক প্রভাবঃ

১. শিক্ষা ও শেখার সুযোগ:

  • অনলাইন ক্লাস ও রিসোর্স: স্মার্টফোনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাস, ইউটিউব টিউটোরিয়াল, ই-বুক, ও বিভিন্ন অ্যাপের সাহায্যে পড়ালেখায় অগ্রসর হচ্ছে।

  • ধারাবাহিক যোগাযোগ: শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ/মেসেঞ্জারে গ্রুপ তৈরি করে নোট ও মতামত বিনিময় করা সহজ হয়েছে।

  • তথ্যপ্রাপ্তি সহজতর: জটিল প্রশ্ন বা সমস্যা গুগল/উইকিপিডিয়াতে সার্চ করে দ্রুত সমাধান পাওয়া যাচ্ছে।

২. নিরাপত্তা ও জরুরি যোগাযোগ:

  • স্বজনদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকা: পথিমধ্যে কোনো সমস্যা হলে বাবা–মায়ের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ সম্ভব।

  • জরুরি সহায়তা পাওয়া: বিপদে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা জরুরি নম্বরে ফোন দেওয়া সহজ হয়েছে।

৩. প্রযুক্তি-দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি

  • ডিজিটাল স্কিল: বয়স থেকেই শিক্ষার্থীরা আইটি, মোবাইল অ্যাপ, ভিডিও এডিটিং সহ বিভিন্ন দিক জেনে নিচ্ছে।

  • নতুন উদ্ভাবন: নানা হ্যাকাথন, অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে স্মার্টফোনেই।

অসুবিধা: স্মার্টফোন ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব:

১. আসক্তি ও সময় অপচয়:

  • YouTube, Facebook, Gaming: শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ দীর্ঘ সময় গেম, ইউটিউব, ফেসবুকে ব্যয় করছে, সময়ের অপচয় হচ্ছে।

  • পড়াশোনায় মনোযোগহানি: অতিরিক্ত ব্যবহারে পড়ার প্রতি আগ্রহ কমছে, পরিক্ষায় ফলাফল খারাপ হচ্ছে।

২. স্বাস্থ্যঝুঁকি:

  • ঘুমের সমস্যা: অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ঘুম কমে যাচ্ছে।

  • চোখ ও মাথাব্যথা: মোবাইলের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকার কারণে চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা–এমনকি নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।

  • দেহগত স্থূলতা: শারীরিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ায় মোটা হয়ে যাওয়া, ঘাড় ও পিঠে ব্যথার অভিযোগও বাড়ছে।

৩. সাইবার অপরাধ ও নিরাপত্তা:

  • বুলিং ও হয়রানি: স্মার্টফোন ব্যবহার করে সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি বেড়েছে, এতে মানসিক চাপ ও আত্মবিশ্বাসের সংকট দেখা দিচ্ছে।

  • কনটেন্ট ঝুঁকি: অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন অনুপযুক্ত ওয়েবসাইট, বিপজ্জনক গেম বা মিথ্যা তথ্যের ফাঁদে পড়ছে।

৪. পারিবারিক ও সামাজিক দূরত্ব:

  • সম্পর্ক হ্রাস: বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে আড্ডা, গল্প বা পারস্পরিক মেলবন্ধন হ্রাস পাচ্ছে; সবাই নিজ নিজ ফোনে ব্যস্ত।

  • সমাজবিচ্ছিন্নতা: শুধুমাত্র ভার্চুয়াল বন্ধুত্বে সন্তুষ্ট থাকায় সত্যিকারের সামাজিক দক্ষতা কমে যাচ্ছে।

গবেষণা বিশ্লেষণ: বাস্তব চিত্র:

কার্যকারিতা/ঝুঁকি

গবেষণায় প্রাপ্ত (%)

পড়াশোনার জন্য ব্যবহার

৩৯–৪৮

গেম/ভিডিও/সোশ্যাল মিডিয়া

৫৩–৭৫

ঘুমের সমস্যা

৪৫

চোখে সমস্যা

২০

মাথাব্যথা

১৭.৫

সদ্ব্যবহারে পরামর্শ

উচ্চ

 

করণীয়: নিরাপদ-সচেতন স্মার্টফোন ব্যবহার:

  • সীমিত ও কার্যকর ব্যবহারে স্বেচ্ছা নিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলা।

  • পড়াশুনার জন্য প্রযুক্তির সঠিক দিক বেছে নেওয়া ও অপব্যবহার থেকে বিরত থাকা।

  • অভিভাবক-শিক্ষকের দৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুন ও পর্যবেক্ষণ রাখা।

  • সাইবার নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিদ্যালয়ভিত্তিক ওয়ার্কশপ আয়োজন।

 

মাধ্যমিক পর্যায়ে স্মার্টফোন শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন সম্ভাবনার নবদিগন্ত খুলে দিচ্ছে, তেমনই নানাবিধ সমস্যা তৈরি করছে। এতদ্বারা প্রয়োজন পড়েছে স্মার্টফোন ব্যবহারের গুণগত ও নৈতিক দিকটি তুলে ধরার। অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সম্মিলিত উদ্যোগেই প্রযুক্তি হবে শিক্ষার সহায়ক, অন্তরায় নয়—এটাই প্রত্যাশিত।


মোঃ মনিরুল হক        

সহকারী শিক্ষক, ইংরেজি    

আমলাবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়   

খোকসা, কুষ্টিয়া।        

মোবাঃ ০১৭২২ ২৭৩২৭২    

মন্তব্য করুন