সহকারী শিক্ষক
০৪ আগস্ট, ২০২৫ ০১:২৭ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
সমাজ পরিবর্তনের ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখি—যারা নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সমাজের কল্যাণে কাজ করেছেন, তাদের অধিকাংশকেই জীবদ্দশায় তুচ্ছতাচ্ছিল্য, অপমান ও উপহাস সহ্য করতে হয়েছে। তারা ছিলেন সমাজের চোখে ‘পাগল’। অথচ, সময়ের ব্যবধানে সেই ‘পাগল’ বলেই খ্যাত মানুষগুলোকেই এক সময় সমাজ চিনেছে, শ্রদ্ধা জানিয়েছে, আর তাদের পদাঙ্ক অনুসরণে গৌরব অনুভব করেছে।
বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলেইকে উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক। তিনি যখন বলেছিলেন পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে, তখন চার্চ ও সমাজ তাঁকে ‘পাগল’, ‘বিধর্মী’ ও ‘অবজ্ঞাযোগ্য’ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু আজ বিজ্ঞান বলছে—তিনি ছিলেন সঠিক। এমনকি অ্যালবার্ট আইনস্টাইন—যার তত্ত্ব আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি—তাঁকেও তার সময়ের অনেক মানুষ বুঝতে পারেনি। তাঁকে বলা হতো গোঁয়ার, উদ্ভট চিন্তার মানুষ। তিনি বলেন, “If at first the idea is not absurd, then there is no hope for it.”
রাষ্ট্রনায়ক নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর জেল খেটেছেন শুধুমাত্র বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে। বহু মানুষ তাঁকে সন্ত্রাসবাদী, বিশৃঙ্খল, কিংবা উগ্রপন্থী মনে করত। অথচ ইতিহাস তাঁকেই দিয়েছে শান্তির প্রতীক হিসেবে সর্বোচ্চ স্বীকৃতি—নোবেল শান্তি পুরস্কার। ভারতের সমাজসংস্কারক রাজা রামমোহন রায় নারী অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় তীব্র বিদ্রূপের শিকার হন, কিন্তু আজ আমরা তাকেই আধুনিক ভারতের পথিকৃত হিসেবে স্বীকৃতি দিই।
আমাদের সমাজে এখনো এমন মনোবৃত্তি বিরাজমান যেখানে ব্যতিক্রমী চিন্তা, সাহসী উদ্যোগ কিংবা প্রচলিত ধ্যানধারণার বাইরে কোনো কাজ করতে গেলে মানুষ হাসে, কটাক্ষ করে, এমনকি সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে। কারণ, গড়ে তোলা সমাজ ব্যবস্থাটি অনেক সময় পরিবর্তনের চেয়ে স্থবিরতা আর ভীরুতা গ্রহণ করতে চায় বেশি। ফলে, নতুন ভাবনার, নবচিন্তার মানুষগুলো নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে, সমাজের ভয়ে তারা নিজেদের অন্তর্দ্বন্দ্বে নিঃশেষ হয়ে যায়।
তবে সুখবর হলো—এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। একবিংশ শতাব্দীর তরুণ প্রজন্ম আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন, যুক্তিবাদী এবং সাহসী। তারা নিজেরা প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, ন্যায্যতা ও মানবিকতাকে আত্মস্থ করেছে। আর এই নতুন প্রজন্মই পূর্ববর্তী সমাজে ‘পাগল’ আখ্যা পাওয়া সাহসীদের প্রতি সম্মান জানাতে শিখছে। তারা বুঝতে পেরেছে—প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলা, প্রচলিত ধ্যানধারণায় আঘাত হানা এবং ঝুঁকি নেওয়ার সাহস।
আজকের দিনে যারা নির্দ্বিধায় পরিবেশ, মানবাধিকার, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন বা সামাজিক বৈষম্য নিয়ে কাজ করছেন—তাদের সংখ্যা বাড়ছে। আর এই পরিবর্তনের রূপকার হচ্ছে তরুণরা। তারা মুখে নয়, কাজে বিশ্বাসী। নিজেদের চারপাশে তারা নেতিবাচকতার দেয়াল ভেঙে ফেলছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জটিলতা উপেক্ষা করেই তারা এগিয়ে চলেছে।
তবে শুধু তরুণদের সচেতনতা যথেষ্ট নয়। আমাদের সমাজকেও তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন—সবখানে যদি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা যায়, তাহলে এই পরিবর্তনের গতি আরো বাড়বে। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন শিক্ষকই পারে ছাত্রের মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে, তাকে উদ্বুদ্ধ করতে এবং বিপথে যাওয়ার আগেই পথ দেখাতে।
আমরা দেখতে পাই, ইতিহাসে যারা সমাজের কল্যাণে কাজ করেছেন, তারা কখনো বড় পদে থেকে নয়, বরং একেবারে সাধারণ জায়গা থেকেই বড় কাজ করেছেন। তারা ছিলেন শিক্ষক, সমাজকর্মী, লেখক কিংবা একটি গ্রামের সচেতন মানুষ। সুতরাং পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন মন মানসিকতা, দৃঢ়তা এবং উদ্দেশ্যের পবিত্রতা। পদমর্যাদা নয়, বরং মানুষের জন্য কিছু করার আন্তরিক ইচ্ছাই একজনকে সমাজের সত্যিকারের মানুষ বানায়।
বর্তমান বাংলাদেশেও এমন অনেক তরুণ আছেন যারা নিরবেই সমাজ বদলে দিচ্ছেন। কেউ কাজ করছেন শিশু শিক্ষায়, কেউ গ্রামের অসহায় মানুষের চিকিৎসায়, কেউ নারীদের অধিকার আদায়ে। তারা হয়তো সামাজিক স্বীকৃতি পান না, কিন্তু তারা আমাদের ভবিষ্যৎকে আলোকিত করছেন। এই তরুণদের উৎসাহিত করতে হবে, সম্মান জানাতে হবে। কারণ তারাই আমাদের আগামী দিনের নির্মাতা।
একদিন এই তরুণরাই সমস্ত সমালোচনার মাটিচাপা দিয়ে এক নতুন, উন্নত, কল্যাণকর সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে—এ বিশ্বাস রাখতেই হয়। আমরা চাই, ভবিষ্যতের কোনো শিশু যেন সমাজের জন্য কাজ করতে গিয়ে ‘পাগল’ বলার আঘাতে পিছিয়ে না পড়ে। আমরা চাই, চিন্তা ও কর্মে সাহসীদের জন্য এই সমাজ হোক নিরাপদ, সহযোগিতাপূর্ণ ও শ্রদ্ধাশীল।
পরিশেষে বলব, সমাজে কাজ করতে গেলে সমালোচনা হবে—এটাই বাস্তবতা। কিন্তু সমালোচনার ভয়ে যদি থেমে যাই, তবে সমাজ আর কখনোই এগোবে না। যারা ইতিহাস বদলায়, তারা কখনোই সবার মন জোগাতে পারে না। তারা শুধু সত্যের পথে হেঁটে যায়—আর একদিন সমাজ নিজেই তাদের স্বীকৃতি দেয়।
সাখাওয়াত হোসেন
শিক্ষক
১
১ মন্তব্য