Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৭ আগস্ট, ২০২৫ ০৭:০৩ পূর্বাহ্ণ

নাজাসাত বিষয়ক ষষ্ঠ শ্রেণি

নাজাসাতের পরিচয় ও গুরুত্ব :

নাজাসাত (النجاسة) আরবি শব্দ, যার অর্থ অশুচিতা, অপবিত্রতা বা নোংরামি। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়, নাজাসাত হলো এমনসব বস্তু যা শরীর, পোশাক, বা নামাজের স্থানের পবিত্রতাকে নষ্ট করে দেয়। পবিত্রতা (তাহারাত) হলো ইসলামের একটি মৌলিক স্তম্ভ, কারণ পবিত্রতা ছাড়া নামাজ, কুরআন স্পর্শ করা বা আল্লাহর ইবাদত করা সম্ভব নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, "যারা পাকসাফ এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে, আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন।" (সূরা তাওবা: ১০৮) তাই একজন মুসলিমের জন্য নাজাসাত থেকে নিজেকে ও নিজের পরিবেশকে পবিত্র রাখা অত্যাবশ্যক।

নাজাসাতের প্রকারভেদ

শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, নাজাসাত প্রধানত দুই প্রকার:

১. নাজাসাতে হাকিকী (প্রকৃত বা দৃশ্যমান নাপাকি) এগুলো হলো সেইসব নাপাকি যা চোখে দেখা যায় এবং যার অস্তিত্ব অনুভূত হয়। এগুলো সাধারণত মানুষের স্বাভাবিক রুচি ও প্রকৃতির কাছে ঘৃণ্য। এই প্রকারের নাজাসাতকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হয়:

  • নাজাসাতে গালিযা (শক্ত নাপাকি): এ ধরনের নাপাকি দূর করার ব্যাপারে ইসলামী আইনশাস্ত্রে কঠোরতা অবলম্বন করা হয়। এই নাপাকির সামান্য পরিমাণও যদি শরীর বা কাপড়ে লেগে যায়, তবে তা অপবিত্র হয়ে যায় এবং নামাজ সহিহ হয় না। নাজাসাতে গালিযা-এর কিছু উদাহরণ হলো:

    • মানুষের মল ও মূত্র।

    • প্রবাহিত রক্ত, যেমন: মাসিক বা প্রসব পরবর্তী রক্ত।

    • বীর্য, পুঁজ ও বমি (যদি মুখ ভরে আসে)।

    • মদ বা যেকোনো নেশাজাতীয় তরল পদার্থ।

    • মৃত প্রাণীর দেহ (তবে মাছ ও পঙ্গপাল এই বিধানের বাইরে)।

    • শুকর ও কুকুরের লালা এবং দেহ।

    • যেসব প্রাণীর গোশত খাওয়া হালাল নয়, তাদের পেশাব ও পায়খানা।

  • নাজাসাতে খফিফা (হালকা নাপাকি): এই প্রকারের নাপাকি দূর করার বিধান কিছুটা শিথিল। যদি কোনো অঙ্গ বা কাপড়ের এক-চতুর্থাংশের কম পরিমাণ স্থানে এই নাপাকি লাগে, তাহলে নামাজ সহিহ হয়ে যায়। তবে সম্ভব হলে তা ধুয়ে ফেলাই উত্তম। নাজাসাতে খফিফা-এর কিছু উদাহরণ হলো:

    • যেসব পাখির গোশত খাওয়া হারাম, তাদের বিষ্ঠা (মল)।

    • যেসব পশুর গোশত খাওয়া হালাল, তাদের পেশাব (যেমন: গরু, ছাগল, উট)।

২. নাজাসাতে হুকমী (বিধানগত বা অদৃশ্য নাপাকি) এই প্রকারের নাপাকি চোখে দেখা যায় না, তবে শরীয়তের বিধান অনুযায়ী তা অপবিত্রতার কারণ। এটি মূলত শারীরিক অবস্থার সাথে সম্পর্কিত, যা পবিত্রতা অর্জনের জন্য অজু বা গোসলের প্রয়োজন হয়। নাজাসাতে হুকমীকে হাদাসও বলা হয়, এবং এটি দুই প্রকার:

  • হাদাসে আসগার (ছোট হাদাস): এটি সেই অবস্থা যখন কোনো ব্যক্তির অজু ভেঙে যায়। অজু ভঙ্গের কারণগুলো হলো:

    • প্রস্রাব বা পায়খানা করা।

    • শরীর থেকে বায়ু ত্যাগ করা।

    • শরীরের কোনো স্থান থেকে রক্ত, পুঁজ বা অন্য কিছু বের হওয়া।

    • মুখ ভরে বমি করা।

    • ঠেস দিয়ে ঘুমিয়ে পড়া। এই হাদাস থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য অজু করতে হয়।

  • হাদাসে আকবার (বড় হাদাস): এটি এমন অপবিত্র অবস্থা যার কারণে গোসল ফরজ হয়ে যায়। যেমন:

    • সহবাস বা যৌন সম্পর্ক স্থাপন।

    • স্বপ্নদোষের মাধ্যমে বীর্যপাত হওয়া।

    • মহিলাদের মাসিক (হায়েয) বা প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ (নিফাস) শেষ হওয়া। এই হাদাস থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য গোসল করতে হয়।

নাজাসাত থেকে পবিত্রতা অর্জনের নিয়ম

নাজাসাত দূর করার পদ্ধতি নির্ভর করে নাপাকির ধরন এবং যে বস্তুতে লেগেছে তার প্রকৃতির ওপর।

  • তরল নাজাসাত: তরল নাপাকি (যেমন: পেশাব, রক্ত) কাপড় বা শরীরে লাগলে তা তিনবার ধুতে হবে এবং প্রতিবার ভালোভাবে নিংড়িয়ে নিতে হবে। এর ফলে নাপাকির রঙ, গন্ধ ও স্বাদ সম্পূর্ণরূপে দূর হয়ে যাবে।

  • শক্ত নাজাসাত: যদি নাপাকি শক্ত বা দৃশ্যমান হয় (যেমন: মল), তাহলে তা প্রথমে ঘষে বা চেঁচে ফেলে দিতে হবে। এরপর পানি দিয়ে এমনভাবে ধুতে হবে যেন নাপাকির কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট না থাকে।

  • মসৃণ বা কঠিন পৃষ্ঠ: কোনো মসৃণ জিনিস (যেমন: আয়না, কাঁচ) বা কঠিন বস্তু (যেমন: জুতা) থেকে নাপাকি দূর করতে চাইলে পানি দিয়ে মুছে বা ঘষে পরিষ্কার করা যেতে পারে, যতক্ষণ পর্যন্ত নাপাকির চিহ্ন সম্পূর্ণ দূর না হয়।

  • জমিনে নাজাসাত: মাটিতে নাপাকি লেগে গেলে সেই স্থানের ওপর পর্যাপ্ত পানি ঢেলে দিলে তা পবিত্র হয়ে যায়।

গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা (বিধান):

  • নাজাসাত থেকে পবিত্রতা অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক, বিশেষ করে নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতের জন্য।

  • কোনো বস্তু পবিত্র কি না, তা নিয়ে সন্দেহ হলে তাকে পবিত্র ধরে নেওয়া উচিত, যতক্ষণ না অপবিত্রতার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।

  • যদি কোনো নাপাকি এমন স্থানে লাগে যেখানে তা দূর করা কঠিন (যেমন: রাস্তার কাঁদা বা পানি), তবে তা ক্ষমাযোগ্য হতে পারে।

  • যদি কোনো খাদ্যদ্রব্যে নাপাকি লেগে যায় (যেমন: ঘি-এর মধ্যে ইঁদুর পড়ে মারা গেলে), তবে নাপাকির অংশ এবং তার চারপাশের কিছু অংশ ফেলে দিলে বাকি খাদ্য পবিত্র থাকে।

মন্তব্য করুন