Loading..

ব্লগ

রিসেট

২০ আগস্ট, ২০২৫ ০৭:০৮ পূর্বাহ্ণ

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

article

যরত ইব্রাহীম (আঃ) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী


হযরত ইবরাহীম(আঃ) ছিলেন,নূহ(আঃ) এর ১১তম অধঃস্তন পুরুষ। নূহ (আঃ) থেকে ইবরাহিম (আঃ) পযর্ন্ত প্রায় ২০০০ বছরের ব্যবধান ছিল।হযরত সালেহর (আঃ) প্রায় ২০০ বছর পরে ইবরাহিম (আঃ) আগমন ঘটে। ইবরাহিম ছিলেন,’আবুল  আম্বিয়া’ বা নবীগনের পিতা এবং তার স্ত্রী ‘সারা’ ছিলেন  নবীদের মাতা। তার স্ত্রী সারার পুত্র ইসহাক (আঃ) পুত্র ইয়াকুব (আঃ) এর বংশধর ‘বনী ইসরাইল’ নামে পরিচিত।অপর স্ত্রী হাজেরার পুত্র ইসমাইল (আঃ) এর বংশে জন্ম নেনবিশ্ব ও শেষ নবী মোহাম্মদ(সঃ)। শেষ নবীর উম্মৎরাই ‘উম্মতে মোহাম্মদী’ বা মুসলিম উম্মাহ নামে পরিচিত । 
ইবরাহীম(আঃ) ছিলেন ইহুদী-খৃষ্টান-মুসলিম সব সম্প্রদায়ের পিতা। কেননা আদম(আঃ) থেকে ইবরাহিম(আঃ) পর্যন্ত ১০/১২ জন নবী ছাড়াশেষ নবী মোহাম্মাদ (সঃ) পর্যন্ত ১ লাখ ২৪ হাজার নবীদের মধ্যে প্রায় সকলেই ছিলেনইবরাহীম (আঃ) এর বংশধর।


 হযরত ইবরাহীম (আঃ) ইরাকের বসরার নিকটবর্তী ‘বাবেল’  শহরে জন্মগ্রহন করেন। এখানে তখন ক্যালেডিয় জাতি বাস করত।তাদের সম্রাট ছিলো নমরুদ। নমরুদ প্রায় ৪০০ বছর রাজত্ব করেন।হযরত ইবরাহিম (আ:) দেখলেন তার জাতি মূর্তি,নক্ষত্র পূজা ইত্যাদিতে ব্যস্ত। তাদের কাছে আল্লাহর একত্ববাদমহত্ত্ব ও কুদরত ইত্যাদি অকল্পনীয়। এ ধরনের পরিস্থিতে হযরত ইবরাহিম (আ:) আল্লাহর উপর ভরসা করে সাহসের সাথে তাদের সামনে সত্যের দাওয়াত উপষ্থিত  করলেন। দাওয়াত নিয়ে উপহাস করল ও আরো বেশী করে অবাধ্যতা করতে লাগলো। কিন্তু জাতি তার কথায় কর্নপাত করল না ।
হে আমার জাতি! এ আমি কি দেখছিতোমরা নিজ হাতে তৈরী করা মূর্তির পূজা করছো। তোমরা কি এমনই অজ্ঞতার নিদ্রায় বিভোর রয়েছ যেনিষ্প্রান কাঠকে নিজেদের যন্ত্রপাতির সাহায্যে কাটার পর মূর্তি তৈরী করছো। যদি সেটা সঠিক তোমাদের চাহিদা অনুযায়ী না হয় হয়তাহলে সেটা ভেংগে  আবার তৈরী করছো।তৈরীর পর আবার তাকে পূজা করছো।

দ্বীনের দাওয়াত
হযরত ইব্রাহিম(আ:) তাদের জিজ্ঞাসা করলেনমূর্তিগুলো তোমাদের কোন লাভ/ক্ষতি করতে পারে কিনা তারা উত্তর দিলআমরা তোমার সাথে কোন ধরনের তর্কে জড়িত হতে চাইনা।আমাদের পূর্ব-পুরুষরা এটা করেছে কাজেই আমরা এটা করছি।হযরত ইব্রাহিম(আ:) তাদের উত্তর দিলেনতোমাদের মূর্তিগুলোকে আমার কোন ক্ষতি করতে বল।

হযরত ইব্রাহিমের (আ:) এর জাতি মূর্তিপূজার সাথে নক্ষত্রেরও পূজা করতো।তারা মনে করতোমানুষের জন্ম-মৃত্যুলাভ-ক্ষতি,রিযিক,দূর্ভিক্ষ ইত্যাদি সবকিছুই এই সমস্ত নক্ষত্রের প্রভাবে হচ্ছে। কাজের তাদের সন্তুষ্ট রাখা উচিৎ।নবী তখন ঐ সমস্ত মানুষের বুঝার উপযোগী বিচিত্র পদ্ধতির আশ্রয় নিলেন।
রাত ছিল নক্ষত্রপূর্ন উজ্জল। হযরত ইব্রাহিম(আ:) নক্ষত্রের দিকে দেখে বল্লেনএটা কি আমাদের খোদা ?কারন এই নক্ষত্রটা বেশ উজ্জল ও প্রচুর আলো দেয়। খোদার হবার শক্তি  এই নক্ষত্রেরই আছে।সকাল হয়ে আসলেনক্ষত্রের আলো ম্লান হয়ে আসলো।অন্য শক্তির প্রভাবে যে চাদ-তার চলে যায় কিংবা পরিবেশের এভাবে যে এতদ্রুত বদলায় সে কখনো খোদা হতে পারেনা।সেই তুলনায় মানুষ অনেক বেশী স্তিথিশীল। এভাবে চাদ,সূর্য্য প্রতিটার ব্যাপারেই একই ভাবে তিনি প্রশ্ন  তুল্লেন।সমস্ত শক্তি-যুক্তি যখন শেষ হয়ে গেল ,তখন তারা নবীকে তাদের উপাস্য শক্তিগুলোর ভয় দেখাতে লাগলো যেতাদের দেবতা অবশ্যই এই অপমানের প্রতিশোধ গ্রহন করবে।

নবী তাদের বলেনতোমাদের এই শক্তিগুলো আমার কোন ক্ষতিই করতে পারবেনা।কাজেই এক আল্লহর ইবাদৎ কর আর শিরক ছেড়ে দাও। আল্লাহ বলেনআনআম-৭৫-৮৩   ৭৫  ইবরাহীমকে এভাবেই আমি যমীন ও আসমানের রাজ্য পরিচালন ব্যবস্থা দেখাতাম৷ আর এ জন্য দেখাতাম যেএভাবে সে দৃঢ় বিশ্বাসীদের অন্তরভুক্ত হয়ে যাবে৷  ৭৬   অতপর যখন রাত তাকে আচ্ছন্ন করলো তখন একটি নক্ষত্র দেখে সে বললোঃ এ আমার রব ৷ কিন্তু যখন তা ডুবে গেলোসে বললোঃ যারা ডুবে যায় আমি তো তাদের ভক্ত নই৷  ৭৭   তারপর যখন চাঁদকে আলো বিকীরণ করতে দেখলোবললোঃ এ আমার রব৷ কিন্তু যখন তাও ডুবে গেলো তখন বললোঃ আমার রব যদি আমাকে পথ না দেখাতেন তাহলে আমি পথভ্রষ্টদের অন্তরভুক্ত হয়ে যেতাম৷  ৭৮   এরপর যখন সূর্যকে দীপ্তিমান দেখলো তখন বললোঃ এ আমার রবএটি সবচেয়ে বড় ! কিন্তু তাও যখন ডুবে গেলো তখন ইবরাহীম চীৎকার করে বলে উঠলোঃ হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা! তোমরা যাদেরকে আল্লাহর সাথে শরীক করো তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই৷ ৭৯ আমি তো একনিষ্ঠভাবে নিজের মুখ সেই সত্তার দিকে ফিরিয়ে নিয়েছি যিনি যমীন ও আসমান সৃষ্টি করেছেন এবং আমি কখনো মুশরিকদের অন্তরভুক্ত নই৷  ৮০   তার সম্প্রদায় তার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হলো৷ তাতে সে তার সম্প্রদায়কে বললোঃ তোমরা কি আল্লাহর ব্যাপারে আমার সাথে বিতর্ক করছো অথচ তিনি আমাকে সত্য সরল পথ দেখিয়ে দিয়েছেন এবং  তোমরা যাদেরকে তাঁর সাথে শরীক করছো তাদেরকে আমি ভয় করি নাতবে আমার রব যদি কিছু চান তাহলে অবশ্যি তা হতে পারে৷ আমার রবের জ্ঞান সকল জিনিসের ওপর পরিব্যাপ্ত ৷ এরপরও কি তোমাদের চেতনার উদয় হবে না?  ৮১   আর তোমরা যাদেরকে আল্লাহর সাথে শরীক করেছো তাদেরকে আমি কেমন করে ভয় করবো যখন তোমরা এমন সব জিনিসকে আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বে শরীক করতে ভয় করো না যাদের জন্য তিনি তোমাদের কাছে কোন সনদ অবতীর্ণ করেন নিআমাদের এ দুদলের মধ্যে কে বেশী নিরাপত্তালাভের অধিকারী বলোযদি তোমরা কিছু জ্ঞানের অধিকারী হয়ে থাকো৷  ৮২   আসলে তো নিরাপত্তা ও নিশ্চিন্ততা তাদেরই জন্য এবং সত্য সরল পথে তারাই পরিচালিত যারা ঈমান এনেছে এবং যারা নিজেদের ঈমানকে জুলুমের সাথে মিশিয়ে ফেলেনি৷ ৮৩   ইবরাহীমকে তার জাতির মোকাবিলায় আমি এ যুক্তি প্রমাণ প্রদান করেছিলাম৷ আমি যাকে চাই উন্নত মর্যাদা দান করি৷ প্রকৃত সত্য হচ্ছে এই যেতোমার রব প্রজ্ঞাময় ও জ্ঞানী৷

নমরুদকে দ্বীনের দাওয়াত
তখন ইরাকের রাজাদের উপাধি ছিল নমরুদ।রাজার শুধুই রাজাই ছিল নাতারা নিজেদের খোদামালিক বলে দাবী  করতো। নমরুদ চিন্তা করলো,যদি ইব্রাহিমের (আ:) দাওয়াত  এভাবে চলতে থাকেতাহলে রাজত্ব শেষ হয়ে যাবে। কাজেই  নমরুদ ইব্রাহিম(আ:)কে হাজির করার জন্য বলেন। নমরুদ নবীকে প্রশ্ন করলেনকেন তুমি পূর্ব-পুরুষদের ধর্মের বিরোধিতা আর আমাকে খোদা মানতে কেন অন্বীকার করছো

নবী বলেনআমি এক আল্লাহর ইবাদৎ করি। তার সাথে কাউকে শরিক করিনা। সমস্ত বিশ্ব-জগৎ তার সৃষ্টি করা।তিনি সকলের স্রষ্টা ও মালিক। আমি ও তুমি তার সৃষ্টি করা একজন মানুষ।তুমি মূর্তির পূজা কর।তুমি কিভাবে খোদা হতে পার?

নমরুদ বল্লোতোমার খোদার এমন গুন বর্ননা কর যেটা আমার মধ্যে নাই নবী বলেনআমার মহান আল্লাহ জীবন –মৃত্যুর মালিক। নমরুদ জীবন-মৃত্যুর মালিক একথা প্রমান করার জন্য রাজ-দরবারে একজনকে হত্যা করলো।একজন মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত মানুষকে তার দন্ড মাফ করে দিয়া বললো জীবন-মৃত্যু নমরুদের হাতে।নবী বলেন মহান আল্লাহ সূর্য্যৃকে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে ঘোরান।তুমি এটাকে বিপরীতমুখী করএকথায় নমরুদ হতবাক ও নিরুত্তর হয়ে পড়ল।কারন নমরুদ কখনও একথা বলেনিযে সে সমস্ত বিশ্ব-জগতের স্রষ্টা।তবে আর কাউকে বিশ্বের স্রষ্টা বলে সে বলতোনা। বরং সে বলতো চন্দ্র-সূর্য্য,নক্ষত্র ইত্যাদি হোল আলাদা দেবতা।নমরুদ নিজেকে শুধু মানুষের দেবতা বলে দাবী করতো।নবীই প্রথম তাদের সামনে আল্লাহই বিশ্ব-জগতের নিয়ন্তা বলে তাদের সামনে সত্য তুলে   ধরেছিলেন।
নমরুদ অপমানে রাগান্বিত হয়ে উঠলো। যদিও তাদের কোন যুক্তি ছিলনা।সাধারন প্রজা থেকে নমরুদ পর্য্যন্ত সবাই দেবতাদের অপমান করা ও পূর্ব-পুরুষদের ধর্মের বিরোধিতা করার জন্য নবীকে আগুনে জালিয়া দেবার সিদ্ধান্ত গ্রহন করলো।সেই জায়গায় কয়েকদিন থেকে আগুন জ্বালাতে লাগলেন। তীব্র তাপে পাশের জায়গা,গাছপালা পর্যন্ত পুড়ে যাচ্ছিল। এখান ফেলে দিলে ইবরাহিম(আ:) একেবারে ছাই হয়ে যাবেনিশ্চিৎ হবার পর নমরুদ নবীকে আগুনে ফেলে দিলেন।মহান আল্লাহ আগুনকে নবীর জন্য ঠান্ডা হয়ে যেতে বলেন।আগুনের কুন্ড থেকে নবী বের হয়ে আসলেন।

কাবাগৃহ তৈরী:

পৃথিবীর সমস্ত মূর্তি-পূজার বিপরীতে,আল্লাহর একত্ববাদ সমুন্নত করে রাখার জন্য সর্বপ্রথম আল্লাহর ঘর হল ‘বাইতুল্লাহ শরীফ’।পিতা-পুত্র সবসময় কাবার নির্মান কাজে ব্যস্ত।গাথতে গাথতে দেয়াল যখন উপরে উঠে গেলএকখন্ড পাথরকে ভারা স্বরুপ করা হল। হযরত ইসমাইল(আ:) তাকে নিজ হাতে ধরে রাখতেন এবং হযরত ইব্রাহিম(আ:) তার উপর আরোহন করে গেথে যেতেন। বর্তমানে ‘হজরে আসওয়াদ’ যেখানে আছেততটুকু হবার পর হযরত জিবরাঈল(আ:)হযরত ইব্রাহিমকে (আ:) কে পথ দেখায় নিয়ে গেলেন ও নিকটস্থ পাহাড় থেকে ‘হজরে আসওয়াদ’ (বেহেস্ত থেকে আনা) সুরক্ষিত অবস্থায় বের করে তার সামনে দিলেনযথাস্থানে প্রতিস্থাপন করার জন্য।

বাইতুল্লাহ’ নির্মিত হবার পর মহান আল্হ হযরত ইব্রাহিমকে (আঃ ) কে বললেন, ইব্রাহিমী ধর্মের কেবলা ও তার সামনে মাথা নত করার প্রতীক।সুতরাং ‘কাবাতুল্লাহ’কে একত্ববাদের কেন্দ্র হিসাবে সাব্যস্ত করা হল।তখন পিতা-পুত্র উভয়েই দুয়া করলেন যেনমহান আল্লাহ তাদের ও তাদের সন্তানদের নামায কায়েম করা ও যাকাৎ আদায় করার হেদায়েৎ দান করেন। তারই ধারাবাহিকতায় হেদায়েৎপ্রাপ্ত দল সমস্ত পৃথিবী থেকে ‘কাবাতুল্লাহ’তে একত্রিত হয়ে হজ্জ করেপরকালের সুসংবাদের আশায় তাদের জীবনকে ধন্য করেন।

আল-ইমরান-৯৬-৯৭  ৯৬  নিসন্দেহে মানুষের জন্য সর্বপ্রথম যে ইবাদাত গৃহটি নির্মিত হয় সেটি মক্কায় অবস্থিত ৷ তাকে কল্যাণ ও বরকত দান করা হয়েছিল এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য হিদায়াতের কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছিল৷ ৯৭ তার মধ্যে রয়েছে সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ  এবং ইবরাহীমের ইবাদাতের স্থান আর তার অবস্থা হচ্ছে এই যেযে তার মধ্যে প্রবেশ করেছেসে নিরাপত্তা লাভ করেছে৷ মানুষের মধ্য থেকে যারা সেখানে পৌঁছার সামর্থ রাখেতারা যেন এই গৃহের হজ্জ সম্পন্ন করেএটি তাদের ওপর আল্লাহর অধিকার ৷ আর যে ব্যক্তি এ নির্দেশ মেনে চলতে অস্বীকার করে তার জেনে রাখা উচিতআল্লাহ বিশ্ববাসীর মুখাপেক্ষী নন ৷

হযরতইবরাহীম(আঃ) এর প্রায় ২০০ বছরের পুরা জীবনটাই  ছিল পরীক্ষার জীবন। তিনি ছিলেন মহান আল্লাহর উপর নির্ভরশীল।পরিবার,সমাজ,রাষ্ট্রশক্তির বিরোধিতা তাকে তার বিশ্বাস থেকে একচুল টলাতে পারেনি।

মুসলিম উম্মাহ এর জাতীর পিতা ও ইসলামের একজন কালজয়ী  নবী ও রাসুল এর নাম হযরত ইব্রাহিম (আঃ)।

মন্তব্য করুন

ব্লগ