Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৯ আগস্ট, ২০২৫ ০৫:০১ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে অন্ধদের ব্রেইল শিক্ষা পদ্ধতি


মনিরুল হক,

  বাংলাদেশে শিক্ষা সবার জন্য অধিকার। কিন্তু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা অন্ধ শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা গ্রহণের প্রক্রিয়া সাধারণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় আলাদা। তারা চোখ দিয়ে পড়তে না পারলেও স্পর্শের মাধ্যমে জ্ঞান আহরণ করে। এজন্য ব্যবহৃত হয় বিশেষ এক পদ্ধতি হলো ব্রেইল শিক্ষা পদ্ধতি।

 

ব্রেইল কী?

ব্রেইল একটি বিশেষ লিখন-পঠন ব্যবস্থা, যেখানে অক্ষর, সংখ্যা ও চিহ্নগুলো বিন্দুর সাহায্যে প্রকাশ করা হয়। এই বিন্দুগুলো উঁচু হয়ে থাকে এবং আঙুলের স্পর্শে সহজে বোঝা যায়।

  • প্রতিটি অক্ষর বা সংখ্যার জন্য ছয়টি ছোট ঘরের (ডট) নির্দিষ্ট বিন্যাস থাকে।

  • শিক্ষার্থীরা আঙুলের ডগা দিয়ে স্পর্শ করে পড়াশোনা করে।

  • ১৯শ শতকে ফরাসি দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থী লুই ব্রেইল এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

 

বাংলাদেশে ব্রেইল শিক্ষার সূচনাঃ

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরকারি ও বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান ব্রেইল বই ছাপাতে শুরু করে। বিশেষ করে জাতীয় পাঠ্যপুস্তক ও পাঠ পরিকল্পনা বোর্ড (NCTB) প্রতিবছর অন্ধ শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল সংস্করণের পাঠ্যবই প্রকাশ করে।

 

ব্রেইল শিক্ষার পদ্ধতিঃ

বাংলাদেশে ব্রেইল শিক্ষা সাধারণত তিনভাবে পরিচালিত হয়ঃ

1.      প্রাথমিক স্তরেঃ

o    শিশুদের প্রথমে স্পর্শের মাধ্যমে বিন্দুগুলো চিনতে শেখানো হয়।

o    সহজ শব্দ ও বাক্য পড়তে দেওয়া হয়।

o    ব্রেইল স্লেট ও স্টাইলাস ব্যবহার করে লেখার অনুশীলন করানো হয়।

2.      মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরেঃ

o    বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ব্রেইল শেখানো হয়।

o    গণিত ও বিজ্ঞানের প্রতীক শেখাতে বিশেষ ব্রেইল কোড ব্যবহার করা হয়।

o    পরীক্ষায় ব্রেইল উত্তরপত্র ব্যবহার করা হয় বা লেখার জন্য সহায়ক (scribe) দেওয়া হয়।

3.      উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণঃ

o    বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা ব্রেইলের পাশাপাশি ডিজিটাল ব্রেইল রিডার বা স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যার ব্যবহার করে।

o    লাইব্রেরিতে ব্রেইল বইয়ের পাশাপাশি অডিও বইও পাওয়া যায়।

 

সহায়ক উপকরণঃ

  • ব্রেইল বই: প্রতিটি শ্রেণির জন্য আলাদা করে মুদ্রিত হয়।

  • ব্রেইল স্লেট ও স্টাইলাস: লেখার জন্য ব্যবহার করা হয়।

  • পারকিন্স ব্রেইল মেশিন: টাইপরাইটারের মতো একটি যন্ত্র, যা দ্রুত লিখতে সাহায্য করে।

  • ডিজিটাল ব্রেইল ডিসপ্লে: কম্পিউটারের সাথে যুক্ত হয়ে ব্রেইল আকারে লেখা প্রদর্শন করে।

 

ব্রেইল শিক্ষার চ্যালেঞ্জঃ

  • ব্রেইল বই ছাপানোর খরচ বেশি।

  • দেশে ব্রেইল মুদ্রণ যন্ত্র ও কাগজের সংকট রয়েছে।

  • প্রশিক্ষিত ব্রেইল শিক্ষকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।

  • অনেক শিক্ষার্থী এখনো ডিজিটাল ব্রেইল ডিভাইস ব্যবহার করার সুযোগ পায় না।

 

সরকার ও সংগঠনের উদ্যোগঃ

  • বাংলাদেশ সরকার প্রতিবছর ফ্রি ব্রেইল পাঠ্যবই সরবরাহ করে।

  • দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষায়িত স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেমন—

    • দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়, মিরপুর, ঢাকা

    • চট্টগ্রাম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী স্কুল

  • এনজিও যেমন সাইটসেভার্স, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ব্লাইন্ড কাউন্সিল (BNBC) এবং অন্যান্য সংগঠন নিয়মিত ব্রেইল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালায়।

 

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাঃ

বাংলাদেশে ব্রেইল শিক্ষা প্রতিনিয়ত উন্নত হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন অডিও-ই-বুক, স্ক্রিন রিডার, ডিজিটাল ব্রেইল ডিসপ্লে যোগ হওয়ায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা এখন মূলধারার শিক্ষার সাথে আরও সহজে যুক্ত হতে পারছে।

 

ব্রেইল শিক্ষা কেবল একটি পদ্ধতি নয়, এটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের আলোকিত জীবনের দরজা। বাংলাদেশে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে ব্রেইল শিক্ষার প্রসার ঘটছে। যদি পর্যাপ্ত বই, যন্ত্রপাতি ও দক্ষ শিক্ষক সরবরাহ করা যায়, তবে অন্ধ শিক্ষার্থীরাও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতোই সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।

 

মোঃ মনিরুল হক

সহকারী শিক্ষক

আমলাবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়

খোকসা, কুষ্টিয়া

০১৭২২২৭৩২৭২

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ