সহকারী শিক্ষক
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০২:৩২ অপরাহ্ণ
মেসিডোনিয়ার ছোট্ট শিশুটি কীভাবে হয়ে উঠলেন মাদার তেরেসা
ঠিক ২৮ বছর আগে, ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পুরো বিশ্বকে কাঁদিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন মহীয়সী এক নারী। আর্তমানবতার সেবায় নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করা এই নারীর নাম মাদার তেরেসা। ঈশ্বরের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার ইচ্ছা থেকে ১২ বছরের যে কিশোরী সন্ন্যাসিনীর জীবন বেছে নিয়েছিলেন, তিনি ১৯২৯ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে জাহাজে চেপে সাগর পাড়ি দিয়ে চলে আসেন তৎকালীন ভারতবর্ষের কলকাতায়।
সেখানে মানুষের দুঃখ–দুর্দশা তেরেসাকে দারুণভাবে নাড়িয়ে দেয়। ভারতের মানুষের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি; ক্ষুধার্ত, আর্ত, রোগাক্রান্ত ও নিঃস্ব মানুষের ডাকে সাড়া দিতে কাজ শুরু করেন, সিস্টার মেরি তেরেসা থেকে হয়ে ওঠেন মাদার তেরেসা।
জন্ম ও শৈশব
১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট। অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন মেসিডোনিয়ার স্কোপিতে জন্ম হয় এক শিশুর। মা-বাবা নাম রাখেন অ্যাগনেস গনঝে বোজাক্সিউ, ডাক নাম গোনঝে। গোনঝে মূলত একটি তুর্কি শব্দ, যার অর্থ ‘ফুলের কলি’। তিন ভাই-বোনের মধ্যে অ্যাগনেস সবার ছোট। তাঁর বাবা নিকোলা বোজাক্সিউ ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ।
মায়ের নাম দ্রেইনা। তাঁরা ছিলেন আলবেনীয় বংশোদ্ভূত। মা-বাবা, ভাই-বোন মিলে সুখী পরিবার ছিল তাঁদের। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! মাত্র আট বছর বয়সে বাবাকে হারান অ্যাগনেস। শুধু বাসস্থানটুকু ছাড়া সর্বস্ব হারিয়ে মহাবিপদে পড়তে হয় পরিবারটিকে। মা ও বড় বোন মিলে কোনোমতে সংসার চালিয়ে নিতে থাকেন।
সন্ন্যাসিনী হওয়ার পথে যাত্রা
১২ বছর বয়সে সন্ন্যাসিনী হয়ে সৃষ্টিকর্তার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন অ্যাগনেস। এর প্রায় ছয় বছর পর ১৯২৮ সালে সেই সুযোগ আসে। ১৮ বছর বয়সে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করতে আয়ারল্যান্ডে যান। সেখানে গিয়ে লোরেটা সিস্টারদের সঙ্গে যোগ দেন।
‘সিস্টার্স অব লোরেটো’ হচ্ছে মিশনারি মেয়েদের দল। তাঁরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকায় ধর্মপ্রচারের কাজ করেন। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তেরেসাও এই কাজ করতে চান।
আয়ারল্যান্ডে প্রশিক্ষণ শেষে ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর ভারতবর্ষের উদ্দেশে জাহাজে চেপে বসেন তেরেসা, ১৯২৯ সালে ভারতের কলকাতায় পৌঁছান। এরপর সেখানকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন।
কলকাতায় তখন একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ বেকার হয়ে পড়েছে, গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। ঠিক ওই সময়ে দুর্দশাগ্রস্ত যে মানুষগুলোর দিক থেকে হাসপাতালও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তাদের শেষ আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন মাদার তেরেসা।
১৯৩১ সালে অ্যাগনেস সন্ন্যাসিনী হিসেবে প্রথম শপথ নেন। সেন্ট তেরেসার নামানুসারে ‘সিস্টার মেরি তেরেসা’ নাম গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত কলকাতার সেন্ট মেরি হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। পড়াতেন ভূগোল, ইতিহাস ও ক্যাথেসিজম। পাশাপাশি চলছিল বাংলা ও হিন্দি ভাষা রপ্ত করার চেষ্টা। একসময় তিনি স্কুলের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পান।
শিক্ষকতা করার ফাঁকে ফাঁকে প্রতিদিন কলকাতা শহরের বিভিন্ন বস্তিতে ঘুরে বেড়াতেন মাদার তেরেসা। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতায় দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল। হাজার হাজার মানুষ অনাহারে প্রাণ হারায়।
এমন এক পরিস্থিতিতে বস্তিবাসীর অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা নিজ চোখে দেখতে বস্তিতে বস্তিতে যেতেন তেরেসা। চেষ্টা করতেন তাঁদের সাহায্য করার। এভাবে ভারতবর্ষের মানুষের সঙ্গে তিনি আত্মার বন্ধনে জড়িয়ে পড়েন, তাঁদের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন। ক্ষুধার্ত ও নিঃস্ব মানুষের ডাকে সাড়া দিতে কাজ শুরু করেন।
মিশনারিজ অব চ্যারিটি
বছর চারেক পর ১৯৫০ সালে জনহিতৈষী প্রতিষ্ঠান ‘মিশনারিজ অব চ্যারিটি’ গড়ে তোলেন তেরেসা। ১৯৫২ সালে এই চ্যারিটির অধীনেই গড়ে ওঠে ‘নির্মল হৃদয়’। এটি মুমূর্ষু মানুষের আশ্রয় ও সেবাকেন্দ্র। ভারতীয় কর্মকর্তাদের সহায়তায় একটি পরিত্যক্ত হিন্দু মন্দিরকে সেবাকেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়।
নির্মল হৃদয়ের আদি নাম ‘হোম ফর দ্য ডাইং’। এটি ছিল দরিদ্রদের জন্য নির্মিত দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র। এ ছাড়া কুষ্ঠরোগীদের জন্য গড়ে তোলেন ‘শান্তিনগর’।
মাদার কখনো হাসপাতাল চালাননি; আমরা শুধু তাদের আশ্রয় দিই, যাদের হাসপাতালেও জায়গা হয় না…সিস্টার ও স্বেচ্ছাসেবীদের মূল লক্ষ্য থাকে খাবার দেওয়া এবং ব্যান্ডেজ বেঁধে দেওয়ার ওপর; কারণ, অনেক আহত মানুষ রোজ এখানে আসেন
...সিস্টার মেরি প্রেমা পিরিক, কলকাতায় মিশনারিজ অব চ্যারিটির সাবেক মাদার সুপিরিয়র
এরপর ধীরে ধীরে কলকাতার বাইরেও মিশনারিজ অব চ্যারিটির সেবা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেন মাদার তেরেসা। ১৯৬৫ সালে বিশ্বব্যাপী কাজ করার অনুমতি পান। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নগরে প্রথম শাখা খোলা হয়। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশে এই চ্যারিটির শাখা রয়েছে।
যত বিতর্ক-সমালোচনা
মাদার তেরেসার কাজ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন ব্রিটিশ-আমেরিকান লেখক, সাংবাদিক, সাহিত্য সমালোচক ও প্রাবন্ধিক ক্রিস্টোফার হিচেনস। তিনি তথ্যচিত্র হেলস অ্যাঞ্জেল (১৯৯৪) ও তাঁর বই ‘দ্য মিশনারি পজিশন: মাদার তেরেসা ইন থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস’–এ (১৯৯৫) মাদার তেরেসার বিরুদ্ধে দাতব্য তহবিলের অপব্যবহার, নিম্নমানের চিকিৎসাসেবা এবং যন্ত্রণা লাঘব না করে বরং কষ্টকে মহিমান্বিত করার অভিযোগ করেছেন।
আধুনিক গণমাধ্যমে এসব অভিযোগ বারবার জোরালোভাবে উপস্থাপিত হওয়ায় জনমনে তা প্রভাব ফেলেছে এবং অনেকে মাদার তেরেসার মিশনের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তেরেসার
মাদার তেরেসার মিশনারিজ অব চ্যারিটির অধীনে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলো আদতে কোনো হাসপাতাল নয়। বরং সেখানে মৃত্যুপথযাত্রীদের আশ্রয় দেওয়া, অসহায়দের মধ্যে খাবার বিতরণ, অনাথাশ্রম এবং গৃহহীন, প্রতিবন্ধী ও দুর্যোগকবলিত মানুষদের সহায়তা দেওয়া জন্য তৈরি।
তবে অনেকেই ভাবেন, মিশনারিজ থেকে হাসপাতাল পরিচালনা করা হয়। মাদার তেরেসার কার্যক্রম নিয়ে যাঁরা সমালোচনা করেন, তাঁদের মূল অভিযোগগুলোর একটি এটি।
স্বাধীনতার পর ভারত সরকার আফিমের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে কঠোর আইন প্রণয়ন করে। এমনকি আইনের মাধ্যমে চিকিৎসাজনিত কারণেও আফিমের ব্যবহার সীমিত করা হয়।
আমাদের ভুলে গেলে চলে না, মিশনারিজ অব চ্যারিটি হাসপাতাল নয় বরং হসপিস পরিচালনা করে। এ দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। হসপিস মৃত্যুপথযাত্রীদের আশ্রয়কেন্দ্র। এখানে রোগীকে সুস্থ করে তুলতে চিকিৎসা দেওয়া হয় না বরং জীবনের শেষ দিনগুলোতে একজন মানুষকে সর্বোচ্চ আরাম, মর্যাদা ও সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হেল্থ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসে স্পষ্ট করে বলা আছে, হসপিস কেয়ার বা মৃত্যুপথযাত্রীদের সেবা মূলত সেসব রোগীর জন্য, যাদের সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই। তাই তাদের সুস্থ করে তোলার চেষ্টা না করে তাদের যন্ত্রণা কিছুটা লাঘবের চেষ্টা করা হয়। তবে এ জন্য অবশ্যই চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপত্রে রোগীদের আয়ুসাধারণত ছয় মাস বা তার কম বলা হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় ১৭ লাখ মেডিকেয়ার সুবিধাভোগী হসপিস সেবা গ্রহণ করেন।
মাদার তেরেসার মিশনারিজ অব চ্যারিটিতে মূলত গরিব মানুষদের হসপিস সেবা দেওয়া হয়।
১৯৫২ সালে মাদার তেরেসা যখন তাঁর প্রথম হসপিস সেবা চালু করেন, তখন আধুনিক ‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার’ বা উপশমমূলক সেবা ধারণার অস্তিত্বই ছিল না। ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক সিসিলি সন্ডার্সের হাত ধরে প্রথম আধুনিক হসপিসের যাত্রা শুরু হয়।
‘প্যালিয়েটিভ কেয়ার’ বা উপশমমূলক পরিচর্যা ধারণার জনপ্রিয় হয় আরও পরে, ১৯৭৪ সালে। আর ব্যথানাশক ব্যবস্থাপনাকে মানসম্মত রূপ দিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘থ্রি-স্টেপ পেইন ল্যাডার’ চালু হয় ১৯৮৬ সালে। অথচ, এর ৩৪ বছর আগে মাদার তেরেসা ঠিক এ কাজটিই শুরু করেছিলেন। হাসপাতালও যাদের ফিরিয়ে দিত, তাদের আশ্রয় দিতেন মাদার তেরেসা।
মাদার তেরেসা সন্ত স্বীকৃতি পাওয়ার পর তাঁর ৩০ বছরের সহকর্মী বলেছিলেন, ‘তিনি ধর্মের অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন, ফলে তাঁর কাউকে ধর্মান্তরিত করার প্রশ্নই ওঠে না। সেটা কখনোই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না, আর তা–ই যদি হতো, আমার তো মনে হয়, গোটা ভারত এত দিনে খ্রিষ্টান হয়ে যেত।
২
৫ মন্তব্য