Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ১১:২২ পূর্বাহ্ণ

রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া নিয়ে ৪০০ বছরের ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো

লোহিত রক্তকণিকা। আমাদের শরীরের এই পরিচিত কোষটিকে বিজ্ঞানীরা প্রায় ৪০০ বছর ধরে চেনেন। এতদিন সবাই জানতেন, আমাদের শরীরের কোথাও কেটে গেলে রক্ত জমাট বাঁধার কাজটা করে প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা। আর লোহিত রক্তকণিকা শুধু নিরব দর্শকের মতো বসে থাকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সম্প্রতি এমন এক আবিষ্কার করেছেন, যা এই ৪০০ বছরের পুরোনো ধারণাকেই বদলে দিয়েছে। তাঁরা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, রক্ত জমাট বাঁধার পেছনে লোহিত রক্তকণিকাও সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।

পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এ দলে আছেন রুস্তম লিটভিনভ। তিনি বলেন, ‘এই আবিষ্কার আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণাই বদলে দিচ্ছে। ফলে স্ট্রোক বা অনিয়ন্ত্রিত রক্তক্ষরণের মতো ভয়ংকর রোগের নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি খুঁজে বের করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।’

কিন্ত ৪০০ বছর ধরে যা জানা ছিল না, তা গবেষকেরা কীভাবে আবিষ্কার করলেন? আসলে আবিষ্কারের শুরুটা বেশ নাটকীয়। এতদিন বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন, কোথাও কেটে গেলে প্লাটিলেট কোষগুলো ছুটে এসে ফাইব্রিন নামে এক ধরনের জাল ক্ষতস্থানকে ভরাট করে দেয়। আর লোহিত রক্তকণিকাগুলো সেই জালে আটকে পড়া নিস্ক্রিয় দর্শকের মতো চুপচাপ বসে থাকে। ধারণাটি আসলেই সঠিক কিনা, তা পরীক্ষা করতে গবেষক জন ওয়েইসেল এবং রুস্তম লিটভিনভ একটি পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। এই পরীক্ষায় যে তাঁরা ব্যর্থ হবেন, তা জেনেও পরীক্ষা চালিয়ে গেলেন। প্লাটিলেট ছাড়াই কৃত্রিমভাবে রক্ত জমাট বাঁধানোর চেষ্টা করেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, কিছুই হবে না। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলেন, জমাট বাঁধা রক্ত ২০ শতাংশেরও বেশি সংকুচিত হয়েছে!ফলাফল নিশ্চিত করতে তাঁরা সাধারণ রক্ত নিয়েও পরীক্ষা করেন। কিন্তু এবার রাসায়নিক দিয়ে প্লাটিলেটের কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। অবিশ্বাস্যভাবে এবারও রক্ত জমাট বেঁধে সংকুচিত হলো! তখন তাঁরা বুঝতে পারলেন, লোহিত রক্তকণিকা শুধু নিস্ক্রিয় দর্শক নয়, এরা জমাট বাঁধা রক্তকে আরও শক্তিশালী করছে।কিন্তু প্লাটিলেট ছাড়া লোহিত রক্তকণিকা কীভাবে এই কাজ করছে? এই রহস্যের জট খুলতে দলটি শরণাপন্ন হলো একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের কাছে। তাঁর নাম প্রশান্ত পুরোহিত। তিনি রক্ত বা জেলের মতো নরম পদার্থের গঠন নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করে দেখান, এর পেছনের মূল কারণ ‘অসমোটিক ডিপ্লেশন’ নামে একটি প্রক্রিয়া। ব্যাপারটা অনেকটা ভ্যাকুয়াম প্যাকেটের মতো। ধরুন, অনেকগুলো বলকে একটা জালের ভেতর আঁটসাঁট করে রাখা হলো। এখন যদি আশপাশের তরল থেকে কিছু কণা সরে যায়, তাহলে বাইরে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। এই চাপের কারণে বলগুলোকে আরও শক্তভাবে এটে যাবে। 

লোহিত রক্তকণিকার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটে। যখন ফাইব্রিন জালিকা তৈরি হয়, তখন লোহিত রক্তকণিকাগুলো সেই জালে আঁটসাঁট হয়ে আটকে পড়ে। কোষগুলো খুব কাছাকাছি চলে আসায় তাদের মাঝখানের সরু জায়গা থেকে তরলের প্রোটিনগুলো বেরিয়ে যায়। ফলে কোষগুলোর বাইরের দিকে প্রোটিনের ঘনত্ব বেড়ে যায় এবং এক ধরনের ‘অসমোটিক চাপ’ তৈরি হয়। এই চাপই লোহিত রক্তকণিকাগুলোকে আরও শক্তভাবে চেপে ধরে। ফলে পুরো রক্ত জমাট বাঁধাটা আরও মজবুত ও স্থিতিশীল হয়। এসব কিন্তু প্লাটিলেটের সাহায্য ছাড়াই হয়!

মন্তব্য করুন

ব্লগ