মহান আল্লাহ যুগে যুগে বিভিন্ন নবী-রসুল পাঠিয়েছেন। তারা মানুষকে মহান আল্লাহর দিকে ডাকতেন এবং যাবতীয় মন্দ কাজ বর্জন করতে বলতেন। শয়তানের দুষ্ট চক্রান্ত ছিলো সবসময়ই তৎপর। সে একের পর এক মন্দ কর্ম নিয়ে মানুষের সামনে হাজির হয়। আর এতে কিছু মানুষ আটকে যায়, লুফে নেয় শয়তানের প্রস্তাব।
শয়তানের জঘন্যতম একটি মন্দকর্ম হলো ‘সমকামিতা’। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে এ পাপাচারের ইতিহাস সম্পর্কে একদিকে যেমন মানুষকে অবগত করেছেন, অন্যদিকে এই পাপাচারে লিপ্ত গোষ্ঠীকে তিনি কীভাবে শাস্তি দিয়ে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করেছেন সে সম্পর্কেও বলে দিয়েছেন যাতে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি। এটা এতোই নোংরা পাপ যে অপরাধীরা এর শাস্তি দুনিয়াতেই পেয়েছিলো।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি লুত (আ.) কে পাঠিয়েছিলাম যখন তিনি তার সম্প্রদায়কে বললেন, তোমরা চরম অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতার কাজ করছো যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ কখনো করেনি। তোমরা কামপ্রবৃত্তি পূরণ করার জন্য মেয়েদের কাছে না গিয়ে পুরুষদের কাছে যাচ্ছ। প্রকৃতপক্ষে তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী জাতি। (সুরা আরাফ: ৮০-৮১)
হজরত লুত (আ.)- এর সম্প্রদায় বাস করত সাদ্দূম নগরীতে। তারা ডাকাতি করতো, প্রকাশ্য সভা বানিয়ে অশ্লীলতা-বেহায়াপনা করতো। তারা সর্বপ্রথম এমন একটি গর্হিত পাপ করে যা এর পূর্বে কোনো মানুষ করেনি।
কওমে লুতের ওপর আল্লাহর গজব
তৎকালীন ইরাক ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী এক জায়াগায় এ জাতিটির বসবাস ছিল। কেন্দ্রীয় শহর ছিল ‘সাদুম’ নগরী। সাদুম ছিল সবুজ শ্যামল এক নগরী। বর্তমানে এ এলাকাকে ডেট সি বা মৃত সাগর বলা হয়। কারণ এখানে পানির পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল। ফলে ভূমি ছিল অত্যন্ত উর্বর। শস্যে ভরপুর। এমন প্রাচুর্যময় জীবনযাত্রায় বেপরোয়া করে তোলে তাদের। শুধু তাই নয়, পৃথিবীতে তাদের মধ্যেই সর্বপ্রথম সমকামিতার প্রবণতা দেখা দেয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে এই জঘন্য অপকর্ম তারা প্রকাশ্যে করে আনন্দ লাভ করত। পৃথিবীতে তারাই প্রথম সমকামিতার পথ উন্মুক্ত করে। হযরত লুত আ. তাদের এ পাপকাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। আল্লাহর ভয় দেখান। কিন্তু তারা লুত আ. এর আদেশ অমান্য করে। সেই ঘটনার বিবরণ দিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোরআনে বলেন, ‘হে আমার উম্মত! আল্লাহকে ভয় করো আর সঙ্গে সঙ্গে আমার অনুগত্য করো। এই আহ্বানের ফলে আমি তোমাদের থেকে কোনো বিনিময় চাই না, আমার বিনিময় বিশ্বের একমাত্র মালিক আল্লাহ দেবেন। (সুরা শুআরা আয়াত নম্বর ১৬৩-১৬৪)।
আল্লাহর পথে আহ্বান করে পরকালীন মুক্তি ও সুখময় জীবনের কথা বলেন লুত আ.। কিন্তু তারা নবীর কথা কানেই নেয়নি। উলটো তারা সমকামিতার মত ঘৃণিত কাজ বৃদ্ধি করে দেয়। লুত আ. তাদেরকে তাদের বিকৃত রুচি তথা সমকামিতা থেকে বারণ করেন। এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে খবর দেন। কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেন, ‘লুত আ. তার সম্প্রদায়কে ডেকে বললো হে আমার জাতি! তোমরা এমন জঘন্য অরুচিকর অশ্লীলতা শুরু করছো, তোমাদের পূর্বে পৃথিবীতে কেউ এমন রুচিহীন কাজ করেনি।
নিশ্চয় তোমরা কামভাব পূরণার্থে পুরুষের সঙ্গ গ্রহণ করছো, নিজেদের মাঝে গর্হিত কাজ করছো। (এই কথা শোনার পর) তার জাতি লুত আ.কে জবাব দেয়, যদি তুমি সত্যবাদী হও তাহলে আমাদের ওপর গজব আনয়ন করো। তিনি বললেন, হে আল্লাহ! এই বিপদগ্রস্ত জাতির ব্যাপারে আমাকে রক্ষা করুন। (সুরা আনকাবুত আয়াত নম্বর ২৮-২৯)।
যে কারণে তাদের উপর নেমে আসে এ ভয়ংকর শাস্তি
আল্লাহর নবী লুত আলাইহিস সালাম তাদের বারবার সমকামিতার মত পাপাচার থেকে দূরে সরে আসতে বলেছেন, কিন্তু তারা নবীর কথা না শুনে উলটো তাকে কষ্ট দেয়। কোরআনে আল্লাহ বলেন, তার সম্প্রদায় এ ছাড়া কোনো উত্তর দিল না যে, বের করে দাও এদেরকে শহর থেকে। এরা খুব সাধু থাকতে চায়। (সুরাতুল আরাফ আয়াত নম্বর ৮২)। আল্লাহর নবীর বিরোধিতা করে তাদের পাপাচারে সহযোগিতা করতেন লুত আ.-এর স্ত্রী। এর ফলে আল্লাহ তাআলা একদিন ভোর বেলা তাদের ভয়ংকর ভূমিকম্প দিয়ে ধ্বংস করে দেন। ভূমিকম্প এতো শক্তিশালী ছিল যে তাদের পুরো নগরটি সম্পূর্ণ উল্টে যায়।
কওমে লুত এই বিকৃতি রুচির কাজে এতোটাই পাগলপারা ছিল, এই গর্হিত কাজের কোনো সময় স্থান কাল ব্যক্তি পরিচয় ছিল না। যখন যাকে পেত তার সঙ্গেই এই বিকৃতরুচির কাজ করতো।
একদিন হজরত লুত আ. এর নিকট আল্লাহর আদেশে ফেরেশতা আসলো। তারা সেই ফেরেশতার সঙ্গেও এই কাজ করার জন্য দৌড়ে আসে। সেই ঘটনার বিবরণ দিয়ে আল্লাহ কোরআনে বলেন, লুত আ. এর নিটক ফেরেশতা আসার পর শহরবাসী খুশিতে দৌড়ে আসে।
হজরত লুত আ. বললেন, এরা আমার মেহমান, আমাকে লাঞ্ছিত করো না। মেহমানের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো, আমাকে দুঃখিত করও না। তারা বললো, আমরা কি আপনাকে দুনিয়াবাসীর সমর্থন করতে নিষেধ করিনি? তিনি উত্তরে বললেন, যদি তোমরা একান্ত কিছু করতেই চাও, তবে আমার কন্যারা উপস্থিত আছে। আল্লাহ বলেন, আপনার জীবনের কসম তারা নিজস্ব ভাবনায় মত্ত। (সুরাতুল হিজর আয়াত নম্বর ৬৮-৭২)।
তারা কোনোভাবেই এ মনোবাসনা থেকে বিরত হচ্ছিল না। এরপরই আল্লাহর পক্ষ থেকে গজব নেমে আসে। এক শক্তিশালী ভূমিকম্প পুরো নগরটি সম্পূর্ণ উল্টে দেয়। ঘুমন্ত মানুষের ওপর তাদের ঘরবাড়ি আছড়ে পড়ে।
পাশাপাশি আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো কঙ্কর নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। ওই মহাপ্রলয়ের হাত থেকে কেউ রেহাই পায়নি। ওই জনপদের ধ্বংসাবশেষ এখনো বিদ্যমান। সেই ঘটনার বিবরণ দিয়ে আল্লাহ বলেন, আপনি আপনার পরিবার নিয়ে শেষ রাত্রিতে চলে যান, আপনি তাদের জন্য ফিরে আসবেন না, আর আপনাদের মধ্যে হতে কেউ যেন পেছন ফিরে না দেখে। আপনারা যেখানে আদেশ প্রাপ্ত হয়েছেন সেখানে চলে যান। আমি লুতকে এই বিষয়ে জানিয়ে দিই, সকাল হলেই তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়া হবে। (সুরাতুল হিজর, আয়াত নম্বর ৬৫-৬৭)।
তাদের উপর গজবের বিবরণ মহান আল্লাহ বেশ কয়েকটি আয়াতে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ বলেন, সূর্যোদয়ের সময় তাদেরকে প্রচণ্ড একটি শব্দ এসে পাকড়াও করলো। আমি জনপদটিকে উল্টো করে দিলাম। তাদের উপর বর্ষণ করলাম কঙ্কর প্রস্তরের প্রবল বৃষ্টি। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল জাতির জন্য রয়েছে নির্দেশনাবলি। (সুরাতুল হিজর আয়াত নম্বর ৭৩-৭৫)।
৪
৪ মন্তব্য