সহকারী শিক্ষক
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৯:২০ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে শিক্ষার আলো আজ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারি উদ্যোগ, স্থানীয় জনগণের আগ্রহ আর শিক্ষক সমাজের নিরলস প্রচেষ্টায় আজ প্রায় প্রতিটি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় দেখা যায়। কিন্তু এসব বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসা প্রতিটি শিশুর পেছনের গল্প এক রকম নয়। কারও মা-বাবা মাঠে কাজ করে, কারও বাবা বিদেশে থাকে, কারও মা ঘরের কাজ সামলায়। আবার এমনও শিশু আছে যারা বাবা-মা হারিয়েছে, অথবা পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে অনাথ আশ্রম কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায় টিকে আছে। এই শিশুদের জন্য স্কুলের জীবন অনেক সময়ই ভিন্নতর হয়ে ওঠে।
গ্রামের স্কুলে বাবা-মা-হারা শিশুদের প্রথম যে সংকট দেখা দেয় তা হলো মানসিক একাকিত্ব। অন্য শিশুরা যখন স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে মা’র কোলে বসে খেতে পারে বা বাবার সঙ্গে বাজারে যায়, তখন এরা অনেক সময় নিরুপায় হয়ে থাকে। অনেকে হয়তো মামা-নানা বা দাদু-দিদার কাছে বড় হচ্ছে, কিন্তু তাতে অভাব পূরণ হয় না। কারণ বাবা-মায়ের স্নেহ, যত্ন, নিরাপত্তা – এই অনুভূতিগুলোই শিশুকে মানসিকভাবে দৃঢ় করে তোলে। স্কুলের পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে গেলে এই মানসিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু বাবা-মা-হারা শিশুদের মধ্যে অনেকে প্রায়ই ভাঙা মন নিয়ে ক্লাসে বসে থাকে।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক সমস্যা একটি বড় বাধা। গ্রামের স্কুলের অনেক বাবা-মা-সহ শিশুদেরই অভাব রয়েছে, কিন্তু যেসব শিশুর মা-বাবা নেই, তাদের অবস্থাটা আরও করুণ। অনেক ক্ষেত্রে আত্মীয়রা শুধু মৌলিক খাবার ও আশ্রয় দেয়, কিন্তু বই-খাতা, স্কুল ড্রেস কিংবা টিফিনের খরচ বহন করতে চায় না বা পারে না। ফলস্বরূপ, এরা অল্প বয়সেই নানা ধরণের বৈষম্যের মুখোমুখি হয়। ক্লাসে যদি বই না থাকে, তাহলে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহও নষ্ট হয়। অনেক সময় শিক্ষকরা নিজেরা সাহায্য করেন, কিংবা গ্রামের সমাজসচেতন মানুষ এগিয়ে আসেন, কিন্তু সব জায়গায় এমন সহায়তা পাওয়া যায় না।
তৃতীয়ত, সামাজিক দিক থেকে এরা প্রায়ই অবহেলার শিকার হয়। গ্রামে প্রচলিত আছে, বাবা-মা ছাড়া শিশু মানে দুঃখী, করুণ এবং নির্ভরশীল। সহপাঠীদের মধ্যেও এই ধারণা ছড়িয়ে পড়ে। অনেক শিশু হয়তো বন্ধুত্ব করতে চায়, আবার অনেকেই অবজ্ঞা করে। এই অবস্থায় অনাথ শিশুদের মধ্যে হীনমন্যতা জন্ম নেয়। তারা ভাবতে শুরু করে— আমি হয়তো দুর্বল, আমি হয়তো ভিন্ন। অথচ শিশুকালে এইরকম নেতিবাচক ধারণা একজনের ভবিষ্যৎ আত্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমি নিজেও এ চিত্র দেখেছি। আমার গ্রামের স্কুলে এক ছোট ছেলে পড়ত, যার বাবা নদীতে নৌকাডুবিতে মারা যায় আর মা পরের বছর অসুস্থ হয়ে চলে যায়। দাদু তাকে লালন-পালন করছিলেন, কিন্তু দাদুর বয়স বেশি হওয়ায় শিশুটির সঠিক যত্ন নিতে পারছিলেন না। ক্লাসে এসে সে প্রায়ই চুপচাপ বসে থাকত, অন্যদের সঙ্গে খেলায় অংশ নিতে চাইত না। শিক্ষকরা তাকে আলাদা করে ডেকে কথা বলতেন, খাতা-কলম কিনে দিতেন। ধীরে ধীরে সে কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলেও, তার চাহনিতে শূন্যতা ছিল স্পষ্ট। এই বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, বাবা-মা-হারা শিশুদের জন্য শুধু দয়া নয়, প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ।
এখন প্রশ্ন হলো, এ সংকট থেকে মুক্তি কোথায়? প্রথমত, গ্রামের স্কুলগুলোতে শিক্ষকদের মানবিক দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পড়া লেখা শেখানো নয়, শিশুদের মানসিক অবস্থা বুঝে তাদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি। অনেক সময় একটি সান্ত্বনার কথা, একটি আলতো হাত রাখাই শিশুকে সাহস জোগায়। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। গ্রামীণ সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা একটি পুরোনো ঐতিহ্য। যেমন— গ্রামে কারও বিয়ে হলে সবাই মিলে সাহায্য করে, কারও বাড়িতে শোক এলে সবাই পাশে দাঁড়ায়। ঠিক তেমনি বাবা-মা-হারা শিশুদের জন্য গ্রামের সামর্থ্যবান মানুষদের উচিত শিক্ষা সামগ্রী, টিফিন বা পোশাকের ব্যবস্থা করা।
তৃতীয়ত, সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগও জরুরি। বাংলাদেশ সরকার প্রাথমিক শিক্ষায় বিনামূল্যে বই দিচ্ছে, উপবৃত্তি দিচ্ছে— এটি একটি বড় সহায়তা। কিন্তু অনাথ শিশুদের জন্য আলাদা বিশেষ বরাদ্দ বা মনোযোগ দেওয়া দরকার। উদাহরণস্বরূপ, স্কুলে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে তারা মানসিকভাবে সহায়তা পায়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও যদি গ্রামে গিয়ে বাবা-মা-হারা শিশুদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করে, তাহলে তাদের জীবন কিছুটা সহজ হয়ে উঠতে পারে।
চতুর্থত, সহপাঠীদের সচেতন করাও জরুরি। স্কুলে শিশুদের শেখাতে হবে— বাবা-মা-হারা সহপাঠীকে করুণা নয়, সমানভাবে গ্রহণ করতে। ছোটদের মধ্যে সমবেদনা, ভালোবাসা, ভাগাভাগি করার মানসিকতা তৈরি করতে পারলে অনাথ শিশুরা একা অনুভব করবে না।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, গ্রামে বাবা-মা-হারা শিশুদের স্কুল জীবন একটি সংকটপূর্ণ সংগ্রামের নাম। তারা শুধু পড়াশোনার বই নিয়ে লড়াই করে না, বরং মানসিক একাকিত্ব, সামাজিক অবহেলা আর আর্থিক সংকটের সঙ্গে যুদ্ধ করে। তবুও তাদের চোখে স্বপ্ন থাকে, যদি কেউ একটু পাশে দাঁড়ায়, যদি সমাজ তাদের হাতে একটি বই তুলে দেয়, একটি মমতার ছায়া দেয়। তাই বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে এ শিশুদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রতিটি শিশু— সে মা-বাবা থাকুক বা না থাকুক— সমানভাবে শিক্ষার অধিকার রাখে। গ্রামের স্কুলের বেঞ্চে তাদের হাসি ফিরিয়ে আনা শুধু মানবিকতার কাজ নয়, বরং এটি আমাদের ভবিষ্যতের প্রতি বিনিয়োগ।
৭
৭ মন্তব্য