Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৮:৫৬ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষা ।


বাংলাদেশ আজ একবিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় এসে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। শিল্পায়ন, প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ এখন উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি। এ ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষা কেবল একটি বিকল্প পথ নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

কেন কারিগরি শিক্ষা জরুরি?

সাধারণ শিক্ষা আমাদের জ্ঞান বাড়ায়, কিন্তু কারিগরি শিক্ষা সরাসরি দক্ষতা তৈরি করে। একজন তরুণ যদি হাতে-কলমে বিদ্যুৎ, মেকানিক্স, কৃষি প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা গার্মেন্টস শিল্পে দক্ষতা অর্জন করে, তবে সে সহজেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারে। বাংলাদেশে বেকারত্বের অন্যতম বড় কারণ হলো দক্ষতার অভাব। তাই তরুণ প্রজন্মকে কারিগরি শিক্ষার আওতায় আনা সময়ের দাবি।

কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনে অবদানঃ

কারিগরি শিক্ষাপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তি শুধু চাকরির জন্য অপেক্ষা করে না, বরং নিজেই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। যেমন—

  • একজন প্রশিক্ষিত কৃষি প্রযুক্তিবিদ উন্নত বীজ, সেচ ব্যবস্থা ও আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়াতে পারে।

  • একজন আইটি দক্ষ তরুণ ফ্রিল্যান্সিং বা সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে।

  • একজন কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবক মেকানিক্স, ইলেকট্রনিকস বা নির্মাণশিল্পে কাজ করে পরিবারসহ সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে।

এইভাবে কারিগরি শিক্ষা সরাসরি বেকারত্ব কমিয়ে দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা রাখে।

শিল্পোন্নয়নে ভূমিকাঃ

বাংলাদেশের গার্মেন্টস, ওষুধশিল্প, নির্মাণশিল্প, আইটি খাত, সব ক্ষেত্রেই দক্ষ জনশক্তির চাহিদা ক্রমবর্ধমান। কিন্তু দক্ষতা ঘাটতির কারণে অনেক সময় আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি বিশেষজ্ঞদের উপর নির্ভরশীল হয়। কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে দেশীয় জনশক্তি এই শূন্যস্থান পূরণ করবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দেশীয় শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।

প্রবাসী শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তিঃ

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ বিদেশে কাজ করছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশই অদক্ষ বা আধা-দক্ষ। ফলে তারা কম মজুরি পায়। অথচ কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করলে এরা উচ্চ বেতনে কাজ করতে পারত। দক্ষ শ্রমিক বিদেশে গিয়ে কেবল ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয় না, বরং দেশের জন্যও বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স নিয়ে আসে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথেঃ

সরকার “স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১” ভিশন সামনে রেখে এগোচ্ছে। এখানে কারিগরি শিক্ষা অপরিহার্য। আইসিটি, রোবটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ই-কমার্স, সাইবার সিকিউরিটি, সব ক্ষেত্রে দক্ষ তরুণদের প্রয়োজন। এই দক্ষতা সাধারণ শিক্ষার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়, এর জন্য দরকার হাতে-কলমে প্রশিক্ষণভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা।

সামাজিক মর্যাদা ও মানসিকতার পরিবর্তনঃ

দীর্ঘদিন ধরে সমাজে কারিগরি শিক্ষাকে দ্বিতীয় সারির শিক্ষা হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু এখন সময় এসেছে এই মানসিকতা পরিবর্তনের। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালেই দেখা যায়, সেখানে দক্ষ কারিগররা সমানভাবে সম্মানিত। বাংলাদেশেও যদি কারিগরি শিক্ষার মর্যাদা বৃদ্ধি করা যায়, তবে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই শিক্ষার দিকে ঝুঁকবে।

করণীয়ঃ

বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষাকে উন্নয়নের মূলধারায় আনতে হলে কয়েকটি উদ্যোগ জরুরি—

1.   কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষক দিয়ে সমৃদ্ধ করা।

2.   মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তি ও কারিগরি বিষয়ে ভিত্তি গড়ে তোলা।

3.   কারিগরি শিক্ষার উপর ভিত্তি করে উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়ানো।

4.   আন্তর্জাতিক মানের সনদ প্রদান করে বিদেশে চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি করা।

 

বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি নির্ভর করছে দক্ষ মানবসম্পদের উপর। সাধারণ শিক্ষা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, কারিগরি শিক্ষা তার চেয়েও বেশি সময়োপযোগী। এটি কেবল ব্যক্তিকে নয়, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকেও এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে কারিগরি শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।


মোঃ মনিরুল হক

সহকারী শিক্ষক 

আমলাবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়

খোকসা, কুষ্টিয়া

মোবাঃ ০১৭২২ ২৭৩২৭২







মন্তব্য করুন

ব্লগ