সহকারী শিক্ষক
০১ অক্টোবর, ২০২৫ ০৬:৪৩ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
৫৭ : ১১
مَنۡ ذَا الَّذِیۡ یُقۡرِضُ اللّٰهَ قَرۡضًا حَسَنًا فَیُضٰعِفَهٗ لَهٗ وَ لَهٗۤ اَجۡرٌ كَرِیۡمٌ ﴿ۚ۱۱﴾
-আল-বায়ান
-তাইসিরুল
-মুজিবুর রহমান
-Sahih International
১১. এমন কে আছে যে আল্লাহকে দেবে উত্তম ঋণ? তাহলে তিনি বহু গুণে এটাকে বৃদ্ধি করবেন তার জন্য। আর তার জন্য রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার।(১)
(১) এটা আল্লাহ তা'আলার চরম উদারতা ও দানশীলতা যে, মানুষ যদি তাঁরই দেয়া সম্পদ তার পথে ব্যয় করে তাহলে তিনি তা নিজের জন্য ঋণ হিসেবে গ্ৰহণ করেন। অবশ্য শর্ত এই যে, তা “কর্জে হাসানা” (উত্তম ঋণ) হতে হবে। অর্থাৎ খাঁটি নিয়তে কোন ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ছাড়াই তা দিতে হবে, তার মধ্যে কোন প্রকার প্রদর্শনীর মনোবৃত্তি, খ্যাতি ও নাম-ধামের আকাংখা থাকবে না, তা দিয়ে কাউকে খোটা দেয়া যাবে না, দাতা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই দেবে এবং এছাড়া অন্য কারো প্রতিদান বা সন্তুষ্টি লক্ষ্য হবে না। এ ধরনের ঋণের জন্য আল্লাহর দুইটি প্রতিশ্রুতি আছে। একটি হচ্ছে, তিনি তা কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে ফেরত দেবেন। অপরটি হচ্ছে, এজন্য তিনি নিজের পক্ষ থেকে সর্বোত্তম পুরস্কারও দান করবেন। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে অনেকেই এটাকে বাস্তবে রুপান্তরিত করেছিলেন। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১১) কে আছে যে আল্লাহকে দেবে উত্তম ঋণ? তাহলে তিনি তা বহুগুণে তার জন্য বৃদ্ধি করবেন এবং তার জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। [1]
[1] আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেওয়ার অর্থ তাঁর পথে দান-খয়রাত করা। এই মাল যা মানুষ আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তা আল্লাহরই দেওয়া। তা সত্ত্বেও সেটাকে ঋণ বলে আখ্যায়িত করা আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহ বৈ কিছু নয়। তিনি এর প্রতিদান অবশ্যই দেবেন, যেমন ঋণ পরিশোধ করা অত্যাবশ্যক হয়।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান৫৭ : ১২
یَوۡمَ تَرَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتِ یَسۡعٰی نُوۡرُهُمۡ بَیۡنَ اَیۡدِیۡهِمۡ وَ بِاَیۡمَانِهِمۡ بُشۡرٰىكُمُ الۡیَوۡمَ جَنّٰتٌ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِهَا الۡاَنۡهٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡهَا ؕ ذٰلِكَ هُوَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ ﴿ۚ۱۲﴾
-আল-বায়ান
-তাইসিরুল
-মুজিবুর রহমান
-Sahih International
১২. সেদিন আপনি দেখবেন মুমিন নর-নারীদেরকে তাদের সামনে ও ডানে তাদের নূর ছুটতে থাকবে।(১) বলা হবে, আজ তোমাদের জন্য সুসংবাদ জান্নাতের, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তোমরা স্থায়ী হবে, এটাই তো মহাসাফল্য।
(১) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “তাদেরকে তাদের আমল অনুযায়ী নূর দেয়া হবে। তাদের কারও কারও নূর হবে পাহাড়সম। তাদের মধ্যে সবচেয়ে কম নূরের যে অধিকারী হবে তার নূর থাকবে তার বৃদ্ধাঙ্গুলীতে। যা একবার জলবে আরেকবার নিভবে।” [মুস্তাদরাকে হাকিম ২/৪৭৮]
তাফসীরে জাকারিয়া(১২) সেদিন তুমি বিশ্বাসী নর-নারীদেরকে দেখবে, তাদের সামনে ও ডানে তাদের আলো প্রবাহিত হবে।[1] (বলা হবে,) ‘আজ তোমাদের জন্য সুসংবাদ জান্নাতের; যার নিম্নে নদীমালা প্রবাহিত, সেখানে তোমরা স্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য।’ [2]
[1] এটা হাশরের ময়দানে পুলসিরাতে হবে। এই জ্যোতি তাদের ঈমান ও সৎকর্মের প্রতিদান হবে। এরই আলোতে তারা (জাহান্নামের উপর স্থাপিত পুলে) জান্নাতের পথ অতি সহজে অতিক্রম করে নেবে। ইবনে কাসীর ও ইবনে জারীর প্রভৃতি ইমামগণ وَبِأَيْمَانِهِمْ এর অর্থ এই বর্ণনা করেছেন যে, তাদের ডান হাতে থাকবে তাদের আমলনামা।
[2] এ কথা বলবেন সেই ফিরিশতাগণ, যাঁরা তাদের অভ্যর্থনার জন্য সেখানে উপস্থিত থাকবেন।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান৫৭ : ১৩
یَوۡمَ یَقُوۡلُ الۡمُنٰفِقُوۡنَ وَ الۡمُنٰفِقٰتُ لِلَّذِیۡنَ اٰمَنُوا انۡظُرُوۡنَا نَقۡتَبِسۡ مِنۡ نُّوۡرِكُمۡ ۚ قِیۡلَ ارۡجِعُوۡا وَرَآءَكُمۡ فَالۡتَمِسُوۡا نُوۡرًا ؕ فَضُرِبَ بَیۡنَهُمۡ بِسُوۡرٍ لَّهٗ بَابٌ ؕ بَاطِنُهٗ فِیۡهِ الرَّحۡمَۃُ وَ ظَاهِرُهٗ مِنۡ قِبَلِهِ الۡعَذَابُ ﴿ؕ۱۳﴾
-আল-বায়ান
-তাইসিরুল
-মুজিবুর রহমান
-Sahih International
১৩. সেদিন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীরা যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে বলবে, ‘তোমরা আমাদের জন্য একটু থাম, যাতে আমরা তোমাদের নূরের কিছু গ্ৰহণ করতে পারি। বলা হবে, তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও ও নূরের সন্ধান কর। তারপর উভয়ের মাঝামাঝি স্থাপিত হবে একটি প্রাচীর যাতে একটি দরজা থাকবে, যার ভিতরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে শাস্তি।(১)
(১) অর্থাৎ সেদিন স্মরণীয়, যেদিন আপনি মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে দেখবেন যে, তাদের নূর তাদের অগ্রে ও ডানদিকে ছুটোছুটি করবে। ‘সেদিন’ বলে কেয়ামতের দিন বোঝানো হয়েছে। নূর দেয়ার ব্যাপারটি পুলসিরাতে চলার কিছু পূর্বে ঘটবে। এ আয়াতের একটি তাফসীর আবু উমামা বাহেলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি একদিন দামেশকে এক জানাযায় শরীক হন। জানাযা শেষে উপস্থিত লোকদেরকে মৃত্যু ও আখেরাত স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যে তিনি মৃত্যু, কবর ও হাশরের কিছু অবস্থা বর্ণনা করেন। নিম্নে তার বক্তব্যের কিছু অংশ পেশ করা হলঃ
“অতঃপর তোমরা কবর থেকে হাশরের ময়দানে স্থানান্তরিত হবে। হাশরের বিভিন্ন মনযিল ও স্থান অতিক্রম করতে হবে। এক মনযিলে আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে কিছু মুখমণ্ডলকে সাদা ও উজ্জ্বল করে দেয়া হবে এবং কিছু মুখমণ্ডলকে গাঢ় কৃষ্ণবৰ্ণ করে দেয়া হবে। অপর এক মনাযিলে সমবেত সব মুমিন ও কাফেরকে গভীর অন্ধকার আচ্ছন্ন করে ফেলবে। কিছুই দৃষ্টিগোচর হবে না। এরপর নূর বণ্টন করা হবে। প্রত্যেক মুমিনকে নূর দেয়া হবে। মুনাফিক ও কাফেরকে নূর ব্যতীত অন্ধকারেই রেখে দেয়া হবে। আর এ উদাহরণই আল্লাহ তাঁর কুরআনে পেশ করেছেন। তিনি বলেছেন, “অথবা তাদের কাজ গভীর সাগরের তলের অন্ধকারের মত, যাকে আচ্ছন্ন করে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ, যার ঊর্ধ্বে মেঘপুঞ্জ, অন্ধকারপুঞ্জ স্তরের উপর স্তর, এমনকি সে হাত বের করলে তা আদৌ দেখতে পাবে না। আল্লাহ যাকে নূর দান করেন না তার জন্য কোন নূরই নেই।” [সূরা আন-নূর: ৪০]
অত:পর যেভাবে অন্ধ ব্যক্তি চক্ষুষ্মান ব্যক্তির চোখ দ্বারা দেখতে পায় না তেমনি কাফের ও মুনাফিক ঈমানদারের নুর দ্বারা আলোকিত হতে পারবে না। মুনাফিকরা ঈমানদারদের বলবে, “তোমরা আমাদের জন্য একটু থাম, যাতে আমরা তোমাদের নূরের কিছু গ্ৰহণ করতে পারি।” এভাবে আল্লাহ্ মুনাফিকদেরকে ধোঁকাগ্ৰস্থ করবেন। যেমন আল্লাহ বলেছেন, “তারা আল্লাহকে ধোঁকা দেয় আর আল্লাহ্ তাদেরকে ধোঁকা দিবেন।” [সূরা আন নিসা: ১৪২] তারপর তারা যেখানে নূর বন্টন হয়েছিল সেখানে ফিরে যাবে, কিন্তু উভয়ের মাঝামাঝি স্থাপিত হবে একটি প্রাচীর যাতে একটি দরজা থাকবে, ওটার ভিতরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে শাস্তি। এভাবেই মুনাফিক ধোঁকাগ্ৰস্ত হতে থাকবে। আর মুমিনদের মাঝে নূর বন্টিত হয়ে যাবে। [ইবনে কাসীর]
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, প্রত্যেক মুমিনকে তার আমল পরিমাণে নূর দেয়া হবে। ফলে কারও নূর পর্বতসম, কারও খর্জুর বৃক্ষসম এবং কারও মানবদেহসম হবে। সর্বাপেক্ষা কম নূর সেই ব্যক্তির হবে, যার কেবল বৃদ্ধাঙ্গুলিতে নূর থাকবে; তাও আবার কখনও জ্বলে উঠবে এবং কখনও নিভে যাবে। [ইবনে কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৩) সেদিন মুনাফিক (কপট) পুরুষ ও মুনাফিক নারী বিশ্বাসীদেরকে বলবে, ‘তোমরা আমাদের জন্য একটু থাম, যাতে আমরা তোমাদের আলো কিছু গ্রহণ করতে পারি।’[1] বলা হবে, ‘তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও[2] ও আলোর সন্ধান কর।’ অতঃপর উভয়ের মাঝামাঝি[3] স্থাপিত হবে একটি প্রাচীর যাতে একটি দরজা থাকবে, ওর অভ্যন্তরে থাকবে করুণা[4] এবং বহির্ভাগে থাকবে শাস্তি। [5]
[1] মুনাফিকরা কিছু দূর পর্যন্ত ঈমানদারদের সাথে তাদের আলোতে চলবে। অতঃপর মহান আল্লাহ মুনাফিকদের জন্য তাদের পথ অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দেবেন। তখন তারা মু’মিনদেরকে এ কথা বলবে।
[2] এর অর্থ হল, দুনিয়াতে গিয়ে এই ধরনের ঈমান ও সৎকর্মের পুঁজি নিয়ে এসো, যেমন আমরা নিয়ে এসেছি। অথবা বিদ্রূপের ছলে ঈমানদাররা বলবে যে, পিছনে যেখান থেকে আমরা এই জ্যোতি নিয়ে এসেছি, সেখানে গিয়ে তোমরাও তার খোঁজ কর।
[3] অর্থাৎ, মু’মিন ও মুনাফিকদের মাঝামাঝি।
[4] অর্থাৎ, জান্নাত; যেখানে ঈমানদারগণ প্রবেশ করবেন।
[5] অর্থাৎ, জাহান্নাম থাকবে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান৫৭ : ১৪
یُنَادُوۡنَهُمۡ اَلَمۡ نَكُنۡ مَّعَكُمۡ ؕ قَالُوۡا بَلٰی وَ لٰكِنَّكُمۡ فَتَنۡتُمۡ اَنۡفُسَكُمۡ وَ تَرَبَّصۡتُمۡ وَ ارۡتَبۡتُمۡ وَ غَرَّتۡكُمُ الۡاَمَانِیُّ حَتّٰی جَآءَ اَمۡرُ اللّٰهِ وَ غَرَّكُمۡ بِاللّٰهِ الۡغَرُوۡرُ ﴿۱۴﴾
-আল-বায়ান
-তাইসিরুল
-মুজিবুর রহমান
-Sahih International
* আমাদের অমঙ্গলের।
** শয়তান।
১৪. মুনাফিকরা মুমিনদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করবে, আমরা কি তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না? তারা বলবে, হ্যাঁ, কিন্তু তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে বিপদগ্ৰস্ত করেছ। আর তোমরা প্ৰতীক্ষা করেছিলে, সন্দেহ পোষণ করেছিলে এবং অলীক আকাংখা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিল, অবশেষে আল্লাহর হুকুম আসল।(১) আর মহাপ্ৰতারক(২) তোমাদেরকে প্ৰতারিত করেছিল আল্লাহ সম্পর্কে।
(১) এর দুটি অর্থ হতে পারে। একটি হচ্ছে, সেটিই তোমাদের জন্য উপযুক্ত জায়গা। আরেকটি অর্থ হচ্ছে, তোমরা তো আল্লাহকে তোমাদের অভিভাবক বানাওনি যে, তিনি তোমাদের তত্ত্বাবধান করবেন। এখন জাহান্নাম তোমাদের অভিভাবক। সে-ই তোমাদের যথোপযুক্ত তত্ত্বাবধান করবে। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]
(২) অর্থাৎ শয়তান। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৪) মুনাফিকরা বিশ্বাসীদেরকে ডেকে জিজ্ঞাসা করবে, ‘আমরা কি (দুনিয়ায়) তোমাদের সঙ্গে ছিলাম না?’[1] তারা বলবে, ‘অবশ্যই, কিন্তু তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে বিপদগ্রস্ত করেছ,[2] তোমরা প্রতীক্ষা করেছিলে,[3] সন্দেহ পোষণ করেছিলে[4] এবং আল্লাহর হুকুম (মৃত্যু) আসা[5] পর্যন্ত অলীক আশা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিল;[6] আর আল্লাহ সম্পর্কে মহাপ্রতারক (শয়তান) তোমাদেরকে প্রতারিত করেছিল। [7]
[1] অর্থাৎ, প্রাচীর খাড়া হয়ে যাওয়ার পর মুনাফিকরা মু’মিনদেরকে বলবে, ‘দুনিয়ায় কি আমরা তোমাদের সাথে নামায পড়তাম না এবং জিহাদ ইত্যাদিতে অংশ গ্রহণ করতাম না?’
[2] তোমরা তোমাদের অন্তরে কুফরী ও মুনাফিক্বী গুপ্ত রেখেছিলে।
[3] যে, মুসলিমরা কোন আপদ-বিপদের সম্মুখীন হোক।
[4] দ্বীনের ব্যাপারসমূহে। তাই তোমরা না কুরআনকে মেনেছ, আর না দলীলাদি ও মু’জিযাকে।
[5] অর্থাৎ, তোমাদের মৃত্যু আসা পর্যন্ত। অথবা শেষ পর্যন্ত মুসলিমরাই জয়ী থাকল এবং তোমাদের আশার বাসা ভেঙ্গে চূর্ণ হয়ে গেল।
[6] যাতে শয়তান তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিল।
[7] অর্থাৎ, আল্লাহর সহিষ্ণুতা ও তাঁর অবকাশদানের নীতির ফলে শয়তান তোমাদেরকে প্রতারণায় ফেলে রেখেছিল।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান৫৭ : ১৫
فَالۡیَوۡمَ لَا یُؤۡخَذُ مِنۡكُمۡ فِدۡیَۃٌ وَّ لَا مِنَ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡا ؕ مَاۡوٰىكُمُ النَّارُ ؕ هِیَ مَوۡلٰىكُمۡ ؕ وَ بِئۡسَ الۡمَصِیۡرُ ﴿۱۵﴾
-আল-বায়ান
-তাইসিরুল
-মুজিবুর রহমান
-Sahih International
১৫. সুতরাং আজ তোমাদের কাছ থেকে কোন মুক্তিপণ গ্রহণ করা হবে না এবং যারা কুফরী করেছিল তাদের কাছ থেকেও নয়। জাহান্নামই তোমাদের আবাসস্থল, এটাই তোমাদের যোগ্য(১); আর কত নিকৃষ্ট এ প্রত্যাবর্তনস্থল!
(১) এর দু'টি অর্থ হতে পারে। একটি হচ্ছে, সেটিই তোমাদের জন্য উপযুক্ত জায়গা। আরেকটি অর্থ হচ্ছে, তোমরা তো আল্লাহ্কে তোমাদের অভিভাবক বানাওনি যে, তিনি তোমাদের তত্ত্বাবধান করবেন। এখন জাহান্নাম তোমাদের অভিভাবক। সে-ই তোমাদের যথোপযুক্ত তত্ত্বাবধান করবে। [কুরতুবী; ফাতহুল কাদীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৫) আজ তোমাদের নিকট হতে কোন মুক্তিপণ গ্রহণ করা হবে না এবং যারা অবিশ্বাস করেছিল তাদের নিকট হতেও নয়। তোমাদের আবাসস্থল জাহান্নাম, এটাই তোমাদের চিরসঙ্গী।[1] আর কত নিকৃষ্ট এই পরিণাম!’
[1] এক অর্থে مَولى মতোয়াল্লীকে বলা হয়, যে অপরের কাজের দায়িত্বভার গ্রহণ করে। অর্থাৎ, এখন জাহান্নামের এই দায়িত্ব যে, তাদেরকে কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি আস্বাদন করাবে। কেউ বলেছেন, সর্বদা সাথে থাকে তাকেও ‘মাওলা’ বলা হয়। অর্থাৎ, এখন জাহান্নামের আগুনই তাদের চিরসাথী ও চিরসঙ্গী হবে। কেউ বলেছেন, মহান আল্লাহ জাহান্নামকেও জ্ঞান ও বোধশক্তি দান করবেন। তাই সে কাফেরদের উপর রাগ ও ক্রোধ প্রকাশ করবে। অর্থাৎ, সে তাদের তত্ত্বাবধায়ক হবে এবং তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিতে থাকবে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান৫৭ : ১৬
اَلَمۡ یَاۡنِ لِلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَنۡ تَخۡشَعَ قُلُوۡبُهُمۡ لِذِكۡرِ اللّٰهِ وَ مَا نَزَلَ مِنَ الۡحَقِّ ۙ وَ لَا یَكُوۡنُوۡا كَالَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡكِتٰبَ مِنۡ قَبۡلُ فَطَالَ عَلَیۡهِمُ الۡاَمَدُ فَقَسَتۡ قُلُوۡبُهُمۡ ؕ وَ كَثِیۡرٌ مِّنۡهُمۡ فٰسِقُوۡنَ ﴿۱۶﴾
-আল-বায়ান
-তাইসিরুল
-মুজিবুর রহমান
-Sahih International
১৬. যারা ঈমান এনেছে তাদের হৃদয় কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য নাযিল হয়েছে তার জন্য বিগলিত হওয়ার সময় আসেনি?(১) আর তারা যেন তাদের মত না হয় যাদেরকে আগে কিতাব দেয়া হয়েছিল—অতঃপর বহু কাল অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাদের অন্তরসমূহ কঠিন হয়ে পড়েছিল। আর তাদের অধিকাংশই ফাসিক।
(১) অর্থাৎ মুমিনদের জন্যে কি এখনও সময় আসেনি যে, তাদের অন্তর আল্লাহর যিকর এবং যে সত্য নাযিল করা হয়েছে তৎপ্রতি নম্র ও বিগলিত হবে? (تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ) এর অর্থ অন্তর নরম হওয়া, উপদেশ কবুল করা ও আনুগত্য করা। কুরআনের প্রতি অন্তর বিগলিত হওয়ার অর্থ এর বিধান তথা আদেশ ও নিষেধ পুরোপুরি পালন করার জন্যে প্রস্তুত হওয়া এবং এ ব্যাপারে কোন অলসতা বা দুর্বলতাকে প্রশ্রয় না দেয়া। [সা’দী]। এটা মুমিনদের জন্যে হুশিয়ারি। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তা’আলা কোন কোন মুমিনদের অন্তরে আমলের প্রতি অলসতা ও অনাসক্তি আঁচ করে এই আয়াত নাযিল করেন। ইমাম আমাশ বলেনঃ মদীনায় পৌঁছার পর কিছু অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য অর্জিত হওয়ায় কোন কোন সাহাবীর কর্মোদ্দীপনায় কিছুটা শৈথিল্য দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়।
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর উপরোক্ত বর্ণনায় আরও বলা হয়েছে, এই হুশিয়ারি সংকেত কুরআন অবতরণ শুরু হওয়ার তের বছর পরে নাযিল হয়। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমাদের ইসলাম গ্রহণের চার বছর পর এই আয়াতের মাধ্যমে আমাদেরকে হুশিয়ার করা হয়। [মুসলিম: ৩০২৭] মোটকথা, এই হুশিয়ারীর সারমর্ম হচ্ছে মুসলিমদেরকে পুরোপুরি নম্রতা ও সৎ কর্মের জন্যে তৎপর থাকার শিক্ষা দেয়া এবং এ কথা ব্যক্ত করা যে, আন্তরিক নমতাই সৎকর্মের ভিত্তি। শাদ্দাদ ইবনে আউস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মানুষের অন্তর থেকে সর্বপ্রথম নম্রতা উঠিয়ে নেয়া হবে। [তাবারী: ২৭/২২৮]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৬) যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে তাদের সময় কি আসেনি যে, আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তাদের হৃদয় ভক্তি-বিগলিত হবে?[1] এবং পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল তাদের মত তারা হবে না?[2] বহুকাল অতিক্রান্ত হয়ে গেলে যাদের অন্তর কঠিন হয়ে পড়েছিল।[3] আর তাদের অধিকাংশই সত্যত্যাগী। [4]
[1] এই সম্বোধন মু’মিনদেরকে করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য তাদেরকে আল্লাহর স্মরণের দিকে আরো বেশী মনোযোগী করা এবং পবিত্র কুরআন থেকে নির্দেশনা গ্রহণের প্রেরণা দেওয়া। خشوع এর অর্থ নরম অন্তরে আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়া। حَقّ (সত্য) বলতে কুরআন কারীম।
[2] যেমন ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা। অর্থাৎ, তোমরা তাদের মত হয়ে যেয়ো না।
[3] সুতরাং তারা আল্লাহর কিতাবে পরিবর্তন ঘটাল। এর বিনিময়ে দুনিয়ার সামান্য ও তুচ্ছ সম্পদ সঞ্চয় করাকে তারা নিজেদের পেশায় পরিণত করেছিল। তার (কিতাবের) বিধি-বিধানকে তারা পশ্চাতে ফেলে দিয়েছিল। আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে বড়দের অন্ধ অনুকরণ আরম্ভ করেছিল এবং তাদেরকেই নিজেদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছিল। মুসলিমদেরকে সতর্ক করা হচ্ছে যে, তোমরা এ রকম কাজ করো না। নচেৎ তোমাদের অন্তরও শক্ত হয়ে যাবে এবং তার ফলে ঐ কাজগুলো যা তাদের জন্য আল্লাহর অভিশাপের কারণ হয়েছিল, তোমাদেরকেও ভাল লাগবে।
[4] অর্থাৎ, তাদের অন্তর খারাপ ও তাদের কাজ-কর্ম বাতিল। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, {فَبِمَا نَقْضِهِم مِّيثَاقَهُمْ لَعنَّاهُمْ وَجَعَلْنَا قُلُوبَهُمْ قَاسِيَةً يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ عَن مَّوَاضِعِهِ وَنَسُواْ حَظًّا مِّمَّا ذُكِّرُوا} (المائدة: ১৩)
তাফসীরে আহসানুল বায়ান৫৭ : ১৭
اِعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰهَ یُحۡیِ الۡاَرۡضَ بَعۡدَ مَوۡتِهَا ؕ قَدۡ بَیَّنَّا لَكُمُ الۡاٰیٰتِ لَعَلَّكُمۡ تَعۡقِلُوۡنَ ﴿۱۷﴾
-আল-বায়ান
-তাইসিরুল
-মুজিবুর রহমান
-Sahih International
১৭. জেনে রাখা যে, আল্লাহই যমীনকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। আমরা নিদর্শনগুলো তোমাদের জন্য সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।(১)
(১) এখানে যে প্রসঙ্গে একথাটি বলা হয়েছে তা ভালভাবে বুঝে নেয়া দরকার। কুরআন মজীদে বেশ কিছু জায়গায় নবুওয়াত ও কিতাব নাযিলকে বৃষ্টির বরকতের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কেননা, ভূ-পৃষ্ঠের ওপর বৃষ্টিপাত যে কল্যাণ বয়ে আনে নবুওয়াত এবং কিতাবও মানবজাতির জন্য সে একই রকমের কল্যাণ বয়ে আনে। মৃত ভূ-পৃষ্ঠে যেমন রহমতের বৃষ্টির এক বিন্দু পড়তেই শস্য শ্যামল হয়ে ওঠে। ঠিক তেমনি আল্লাহর রহমতে যে দেশে নবী প্রেরিত হন এবং অহী ও কিতাব নাযিল হওয়া শুরু হয় সেখানে মৃত মানবতা অকস্মাৎ জীবন লাভ করে। [দেখুন: ইবন কাসীর; কুরতুবী]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৭) তোমরা জেনে রেখো যে, আল্লাহই পৃথিবীকে ওর মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। আমি নিদর্শনগুলি তোমাদের জন্য বিশদভাবে ব্যক্ত করেছি; যাতে তোমরা বুঝতে পার।
-
তাফসীরে আহসানুল বায়ান৫৭ : ১৮
اِنَّ الۡمُصَّدِّقِیۡنَ وَ الۡمُصَّدِّقٰتِ وَ اَقۡرَضُوا اللّٰهَ قَرۡضًا حَسَنًا یُّضٰعَفُ لَهُمۡ وَ لَهُمۡ اَجۡرٌ كَرِیۡمٌ ﴿۱۸﴾
-আল-বায়ান
-তাইসিরুল
-মুজিবুর রহমান
-Sahih International
১৮. নিশ্চয় দানশীল পুরুষগণ ও দানশীল নারীগণ এবং যারা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করে তাদেরকে দেয়া হবে বহু গুণ বেশী এবং তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার।
-
তাফসীরে জাকারিয়া(১৮) দানশীল পুরুষগণ ও দানশীল নারিগণ এবং যারা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করে, তাদেরকে দেওয়া হবে বহুগুণ বেশী[1] এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। [2]
[1] অর্থাৎ, একের পরিবর্তে কমপক্ষে দশগুণ এবং তার চাইতেও বেশী সাতশতগুণ বরং তার থেকেও অধিক মাত্রায়। এই বর্ধন নিয়তের ঐকান্তিকতা, প্রয়োজন এবং স্থান-কালের ভিত্তিতে হতে পারে। যেমন, পূর্বে আলোচনা হল যে, মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয়কারীদের পুণ্য ও সওয়াব তার পরে ব্যয়কারীদের তুলনায় বেশী হবে।
[2] অর্থাৎ, জান্নাত ও তার নিয়ামতসমূহ; যা কখনো শেষ ও ধ্বংস হবার নয়। আয়াতে مُصِّدِّقِيْنَ শব্দটি আসলে مُتَصَدِّقِيْنَ ছিল। ‘তা’ হরফটিকে স্বাদ এর মধ্যে সন্ধি ঘটানো হয়েছে।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান৫৭ : ১৯
وَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا بِاللّٰهِ وَ رُسُلِهٖۤ اُولٰٓئِكَ هُمُ الصِّدِّیۡقُوۡنَ ٭ۖ وَ الشُّهَدَآءُ عِنۡدَ رَبِّهِمۡ ؕ لَهُمۡ اَجۡرُهُمۡ وَ نُوۡرُهُمۡ ؕ وَ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡا وَ كَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِكَ اَصۡحٰبُ الۡجَحِیۡمِ ﴿۱۹﴾
-আল-বায়ান
-তাইসিরুল
-মুজিবুর রহমান
-Sahih International
১৯. আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে, তারাই সিদ্দীক।(১) আর শহীদগণ, তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের কাছে তাদের প্রাপ্য পুরস্কার ও নূর।(২) আর যারা কুফরী করেছে এবং আমাদের নিদর্শনসমূহে মিথ্যারোপ করেছে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী।
(১) এই আয়াত থেকে জানা গেল যে, প্রত্যেক মুমিনকে সিদ্দীক ও শহীদ বলা যায়। এই আয়াতের ভিত্তিতে কারও কারও মতে যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়ন করে, সেই সিদ্দীক ও শহীদ। কিন্তু পবিত্র কুরআনের অন্য একটি আয়াত থেকে বাহ্যতঃ বুঝা যায় যে, প্রত্যেক মুমিন সিদ্দীক ও শহীদ নয়; বরং মুমিনদের একটি উচ্চ শ্রেণীকে সিদ্দীক ও শহীদ বলা হয়। আয়াতটি এই, (وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَٰئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَٰئِكَ رَفِيقًا) “আর কেউ আল্লাহ্ এবং রাসুলের আনুগত্য করলে সে নবী, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ—যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন—তাদের সংগী হবে এবং তারা কত উত্তম সংগী!” [সূরা আন-নিসা: ৬৯]
এই আয়াতে নবী-রাসূলগণের সাথে মুমিনদের তিনটি শ্রেণী বিশেষভাবে উল্লেখিত হয়েছে যথা, সিদ্দীক, শহীদ ও ছালেহ। বাহ্যতঃ এই তিনটি ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণী। নতুবা ভিন্ন ভাবে বলার প্রয়োজন ছিল না। এ কারণেই কেউ কেউ বলেনঃ সিদ্দীক ও শহীদ প্রকৃতপক্ষে মুমিনদের বিশেষ উচ্চশ্রেণীর লোকগণকে বলা হয়, যারা মহান গুণগরিমার অধিকারী। [ইবন কাসীর; কুরতুবী] তাছাড়া কোন কোন হাদীস থেকেও এ তিন শ্রেণীর পার্থক্য ফুটে উঠে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “জান্নাতীরা তাদের উপরস্থিত খাস কামরায় অবস্থানকারীদের এমনভাবে দেখবে যেমন তোমরা পূর্ব বা পশ্চিম থেকে ধ্রুব তারাকে আকাশের দেশে চলতে দেখতে পাও; দু'দলের মর্যাদাগত পার্থক্যের কারণে। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তা কি নবীদের স্থান যেখানে অন্য কেউ পৌঁছতে পারবে না? তিনি বললেন, অবশ্যই হ্যাঁ, যার হাতে আমার আত্মা, তারা এমন কিছু লোক যারা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছে এবং রাসূলদের সত্যায়ন করেছে।” [বুখারী: ৩২৫৬, মুসলিম: ২৮৩১]
তবে আলোচ্য আয়াতে সব মুমিনকে সিদ্দীক ও শহীদ বলার তাৎপর্য এই যে, প্রত্যেক মুমিনকেও কোনো না কোনো দিক দিয়ে সিদ্দীক ও শহীদ বলে গণ্য এবং তাদের কাতারভুক্ত মনে করা হবে। কোন কোন মুফাসসির বলেন, আলোচ্য আয়াতে কামেল ও ইবাদতকারী মুমিন অর্থ নেওয়া সঙ্গত। নতুবা যে সব মুমিন অসাবধান ও খেয়ালখুশীতে মগ্ন তাদেরকে সিদ্দীক ও শহীদ বলা যায় না। এক হাদিস থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন “যারা মানুষের প্রতি অভিসম্পাত করে তারা শহীদদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।” [মুসলিম: ২৫৯৮]
ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু একবার উপস্থিত জনতাকে বললেনঃ তোমাদের কি হলো যে, তোমরা কাউকে অপরের ইযযতের উপর হামলা করতে দেখেও তাকে বাধা দাও না এবং তাকে খারাপ মনে করা না? জনতা আরয করলঃ আমরা কিছু বললে সে আমাদের ইযযতের উপরও হামলা চালাবে এই ভয়ে আমরা কিছু বলি না। ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেনঃ যারা এমন শিথিল, তারা সেই শহীদদের অন্তর্ভুক্ত হবে না, যারা কেয়ামতের দিন পূর্ববর্তী পয়গম্বরগণের উম্মতদের মোকাবেলায় সাক্ষ্য দিবে। কোন কোন মুফাসসির বলেন, আলোচ্য আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আমলে যারা ঈমানদার হয়েছে এবং তার পবিত্ৰ সঙ্গলাভে ধন্য হয়েছে, তাদেরকেই বোঝানো হয়েছে।
(২) অর্থাৎ তাদের মধ্য থেকে যে যে মর্যাদার পুরষ্কার ও যে মর্যাদার ‘নূরের উপযুক্ত হবে সে তা পাবে। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ পুরস্কার ও নূর লাভ করবে। তাদের প্রাপ্য অংশ এখন থেকেই তাদের জন্য সংরক্ষিত আছে। [ইবন কাসীর]
তাফসীরে জাকারিয়া(১৯) যারা আল্লাহ ও তাঁর সমস্ত রসূলে বিশ্বাস স্থাপন করে, তারাই তাদের প্রতিপালকের নিকট সিদ্দীক[1] (সত্যনিষ্ঠ) ও শহীদ। তাদের জন্য রয়েছে তাদের প্রাপ্য পুরস্কার ও জ্যোতি। আর যারা অবিশ্বাস করেছে ও আমার নিদর্শনাবলীকে মিথ্যাজ্ঞান করেছে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী।
[1] কোন কোন মুফাসসির এখানে ‘ওয়াকফ’ (স্টপ) করেছেন বা থেমেছেন এবং পরের শব্দ وَالشُّهَدَآءُ কে পৃথক বাক্য গণ্য করেছেন। صِدِّيق (সিদ্দীক) পূর্ণ ঈমান এবং পূর্ণ ও নির্মল সত্যবাদিতার অধিকারীকে বলে। (যিনি সত্য বলেন এবং সত্যকে সত্য বলে নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন।) হাদীসে এসেছে যে, ‘‘মানুষ সর্বদা সত্য বলে এবং সত্যের অনুসন্ধান ও প্রচেষ্টায় থাকে, এমনকি আল্লাহর নিকটেও তাকে (সিদ্দীক) সত্যবাদী বলে লিখে দেওয়া হয়।’’ (বুখারী-মুসলিম) অপর একটি হাদীসে সত্য স্বীকারকারীদের এমন মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে, যা তাঁরা জান্নাতে লাভ করবেন। নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, ‘‘জান্নাতীরা তাদের উপরের বালাখানার লোকদেরকে ঐভাবে দেখবে, যেভাবে তোমরা আকাশের পূর্ব অথবা পশ্চিম প্রান্তে উদ্দীপ্ত নক্ষত্ররাজিকে দেখ।’’ অর্থাৎ, তাঁদের পারস্পরিক মর্যাদায় এরূপ পার্থক্য হবে। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কি নবীদের মর্যাদা হবে; যা অন্যরা লাভ করতে পারবে না? তিনি (সাঃ) বললেন, ‘‘না, সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! সেটা তাদের স্থান যারা আল্লাহর উপরে ঈমান এনেছে এবং নবীদেরকে যথাযথভাবে সত্য জেনেছে।’’ (সহীহ বুখারীঃ সৃষ্টির সূচনা অধ্যায়)
তাফসীরে আহসানুল বায়ান৫৭ : ২০
اِعۡلَمُوۡۤا اَنَّمَا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَا لَعِبٌ وَّ لَهۡوٌ وَّ زِیۡنَۃٌ وَّ تَفَاخُرٌۢ بَیۡنَكُمۡ وَ تَكَاثُرٌ فِی الۡاَمۡوَالِ وَ الۡاَوۡلَادِ ؕ كَمَثَلِ غَیۡثٍ اَعۡجَبَ الۡكُفَّارَ نَبَاتُهٗ ثُمَّ یَهِیۡجُ فَتَرٰىهُ مُصۡفَرًّا ثُمَّ یَكُوۡنُ حُطَامًا ؕ وَ فِی الۡاٰخِرَۃِ عَذَابٌ شَدِیۡدٌ ۙ وَّ مَغۡفِرَۃٌ مِّنَ اللّٰهِ وَ رِضۡوَانٌ ؕ وَ مَا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الۡغُرُوۡرِ ﴿۲۰﴾
-আল-বায়ান
-তাইসিরুল
-মুজিবুর রহমান
-Sahih International
২০. তোমরা জেনে রাখ, নিশ্চয় দুনিয়ার জীবন খেল-তামাশা, ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক গৰ্ব-অহংকার, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছু নয়।(১) এর উপমা হলো বৃষ্টি, যার উৎপন্ন শস্য-সম্ভার কৃষকদেরকে চমৎকৃত করে, তারপর সেগুলো শুকিয়ে যায়, ফলে আপনি ওগুলো পীতবর্ণ দেখতে পান, অবশেষে সেগুলো খড়-কুটায় পরিণত হয়। আর আখেরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর ক্ষমা ও সস্তুষ্টি। আর দুনিয়ার জীবন প্রতারণার সামগ্ৰী ছাড়া কিছু নয়।(২)
(১) আলোচ্য আয়াতসমূহে বৰ্ণনা করা হয়েছে যে, ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া মোটেই ভরসা করার যোগ্য নয়। পার্থিব জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যা কিছু হয় এবং যাতে দুনিয়াদার ব্যক্তি মগ্ন ও আনন্দিত থাকে, প্রথমে সেগুলো ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে পার্থিব জীবনের মোটামুটি বিষয়গুলো যথাক্রমে এইঃ প্রথমে ক্রীড়া, এরপর কৌতুক, এরপর সাজ-সজ্জা, এরপর পারস্পরিক অহমিকা, এরপর ধন ও জনের প্রাচুর্য নিয়ে পারস্পরিক গর্ববোধ। لَعِبٌ শব্দের অর্থ এমন খেলা, لَهْوٌ এমন খেলাধুলা, যার আসল লক্ষ্য চিত্তবিনোদন زِينَةٌ বা অঙ্গ-সজ্জা, পোশাক ইত্যাদির মোহ সর্বজনবিদিত। প্রত্যেক মানুষের জীবনের প্রথম অংশ ক্রীড়া অর্থাৎ لَعِبٌ এর মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। এরপর لَهْوٌ শুরু হয়। এরপর সে অঙ্গসজ্জায় ব্যাপৃত হয় এবং শেষ বয়সে সমসাময়িক ও সমবয়সীদের সাথে وَتَفَاخُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ বা প্রতিযোগিতার প্রেরণা সৃষ্টি হয়। উল্লেখিত ধারাবাহিকতায় প্রতিটি অর্থেই মানুষ নিজ অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে। কিন্তু কুরআন পাক বলে যে, এই সবই হচ্ছে সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী। [দেখুন: সা’দী, তাবারী]
(২) দুনিয়ায় মানুষের কর্মকাণ্ড বর্ণনার পর পবিত্র কুরআন বর্ণিত বিষয়বস্তুর একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছে, (كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ الْكُفَّارَ نَبَاتُهُ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَاهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَامًا) এখানে غَيْث শব্দের অর্থ বৃষ্টি। الكفار শব্দটি মুমিনের বিপরীত অর্থে ব্যবহৃত হলেও এর অপর আভিধানিক অর্থ কৃষকও হয়। আলোচ্য আয়াতে কেউ কেউ এ অর্থই নিয়েছেন। আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, বৃষ্টি দ্বারা ফসল ও নানা রকম উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়ে যখন সবুজ ও শ্যামল বর্ণ ধারণ করে, তখন কৃষকের আনন্দের সীমা থাকে না। কোনো কোনপ তাফসীরবিদ الكفار শব্দটিকে প্রচলিত অর্থে ধরে বলেছেন যে, এতে কাফেররা আনন্দিত হয়। [কুরতুবী] এখানে প্রশ্ন হয় যে, সবুজ, শ্যামল ফসল দেখে কাফেররাই কেবল আনন্দিত হয় না, মুসলিমরাও হয়। জওয়াব এই যে, মুমিনের আনন্দ ও কাফেরের আনন্দের মধ্যে বিরাট ব্যবধান রয়েছে। ফলে দুনিয়ার অগাধ ধন-রত্ন পেয়েও মুমিন কাফেরের ন্যায় আনন্দিত ও মত্ত হয় না। তাই আয়াতে কাফের আনন্দিত হয় বলা হয়েছে।
এরপর এই দৃষ্টান্তের সারসংক্ষেপ এরূপ বর্ণনা করা হয়েছে যে, ফসল ও অন্যান্য উদ্ভিদ যখন সবুজ শ্যামল হয়ে যায়, তখন দর্শক মাত্রই বিশেষ করে কাফেররা খুবই আনন্দিত ও মত্ত হয়ে উঠে। কিন্তু অবশেষে তা শুষ্ক হতে থাকে। প্রথমে পীতবর্ণ হয়, এরপরে সম্পূর্ণ খড়-কুটায় পরিণত হয়। মানুষও তেমনি প্রথমে তরতাজা ও সুন্দর হয়। শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত এরূপই কাটে। অবশেষে যখন বার্ধক্য আসে, তখন দেহের সজীবতা ও সৌন্দর্য সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায় এবং সবশেষে মরে মাটি হয়ে যায়। দুনিয়ার ক্ষণভঙ্গুরতা বর্ণনা করার পর আবার আসল উদ্দেশ্য- আখেরাতের চিন্তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আখেরাতের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে, (وَفِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٌ) অর্থাৎ আখেরাতে মানুষ এ দুটি অবস্থার মধ্যে যে কোন একটির সম্মুখীন হবে। একটি কাফেরদের অবস্থা অর্থাৎ তাদের জন্যে কঠোর আযাব রয়েছে।
অপরটি মুমিনদের অবস্থা; অর্থাৎ তাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি রয়েছে। এরপর সংক্ষেপে দুনিয়ার স্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে, (وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ) অর্থাৎ এসব বিষয় দেখা ও অনুধাবন করার পর একজন বুদ্ধিমান ও চক্ষুষ্মান ব্যক্তি এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে পারে যে, দুনিয়া একটি প্রতারণার স্থল। এখানকার সম্পদ, প্রকৃত সম্পদ নয়, যা বিপদমুহুর্তে কাজে আসতে পারে। অতঃপর আখেরাতের আযাব ও সওয়াব এবং দুনিয়ার ক্ষণভঙ্গুরতার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি এরূপ হওয়া উচিত যে, মানুষ দুনিয়ার সুখ ও আনন্দে মগ্ন না হয়ে আখেরাতের চিন্তা বেশী করবে। পরবর্তী আয়াতে তাই ব্যক্ত করা হয়েছে। [ইবন কাসীর]
১৪
২৪ মন্তব্য