Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ অক্টোবর, ২০২৫ ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ

নিষ্ক্রিয় শিক্ষার্থীদের সক্রিয় করার পথ

নিষ্ক্রিয় শিক্ষার্থীদের সক্রিয় করার পথ

খুরশীদুজ্জামান আহমেদ

প্রধান শিক্ষক

কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়।

শিক্ষাঞ্চল কালীগঞ্জ, লালমনিরহাট।

 

ভূমিকাঃ  একই শ্রেণীকক্ষ, একই শিক্ষক, এমনকি একই পাঠ্যক্রমের অধীনে থেকেও দেখা যায় মাত্র অল্প কিছু শিক্ষার্থী সক্রিয়ভাবে পাঠে অংশ নিচ্ছে, আর বাকিরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। এটি বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর পেছনে লুকিয়ে আছে বহুবিধ কারণ যা শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং পারিপার্শ্বিকতার সাথে জড়িত। তবে আশার কথা হলো, কিছু কার্যকরী কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে এই নিষ্ক্রিয় শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রাণের সঞ্চার করা সম্ভব।

সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয়তার ফারাক সহজ কথায়, সক্রিয় শিক্ষার্থী মানে হলো যে সচল, কর্মরত বা ক্লাসের কাজে অংশগ্রহণ করে। তারা প্রশ্ন করে, আলোচনায় অংশ নেয় এবং সাধারণত চালকের ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে, নিষ্ক্রিয় শিক্ষার্থীরা অচল, অলস বা কোনো কাজে অংশ নেয় না। তারা সাধারণত দর্শক বা গ্রহীতার ভূমিকা পালন করে থাকে।

কেন শিক্ষার্থীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে? শিক্ষার্থীদের নিষ্ক্রিয়তার কারণগুলো বেশ জটিল এবং এর পেছনে একাধিক বিষয় জড়িত থাকে:

  • শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ভিন্নতা: প্রতিটি শিক্ষার্থী মানসিক, আবেগিক এবং জ্ঞানীয় দিক থেকে ভিন্ন হয়। তাদের শেখার ধরণও আলাদা; কেউ দেখে শেখে, কেউ শুনে, আবার কেউ হাতে-কলমে কাজ করে শিখতে ভালোবাসে । গতানুগতিক শিক্ষাদান পদ্ধতি অনেক সময় সব ধরনের শিক্ষার্থীর চাহিদা পূরণ করতে পারে না। এছাড়া, শিক্ষার্থীর পূর্বজ্ঞান, মনোযোগের ক্ষমতা, মানসিক অবস্থা এবং পারিবারিক পরিবেশও তার সক্রিয়তাকে প্রভাবিত করে।

  • পাঠদান পদ্ধতি: একঘেয়ে বক্তৃতা-ভিত্তিক পাঠদান পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের নিষ্ক্রিয় করে তোলে। পাঠের সাথে বাস্তব জীবনের সংযোগ স্থাপন করতে না পারলে বা শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার সুযোগ না দিলে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে ভীতি বা দূরত্বের সম্পর্ক থাকলেও শিক্ষার্থীরা গুটিয়ে যায়।

  • শ্রেণীকক্ষের পরিবেশ: অনেক সময় শ্রেণীকক্ষের ভৌত পরিবেশ, যেমন বসার ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায়। অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার অভাবও নিষ্ক্রিয়তার কারণ হতে পারে।

সমাধানের পথে: নিষ্ক্রিয়দের সক্রিয় করার কৌশল শিক্ষার্থীদের এই নিষ্ক্রিয়তা একটি সমস্যা হলেও এর সমাধান শিক্ষকের হাতেই রয়েছে। শাস্তি বা বকাঝকার পরিবর্তে সহানুভূতি এবং উদ্ভাবনী পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে সক্রিয় করে তোলা সম্ভব। এর মূলনীতি হলো শিক্ষক-কেন্দ্রিক শ্রেণীকক্ষকে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শ্রেণীকক্ষে রূপান্তর করা।

 

 

 

 

করণীয় পদক্ষেপসমূহ:

১. পাঠদান পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য আনা: একঘেয়ে বক্তৃতা পদ্ধতির পরিবর্তে আলোচনা, বিতর্ক, দলীয় কাজ ও প্রজেক্টের উপর জোর দিতে হবে । পাঠ্যবইয়ের বিষয়কে শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের সাথে যুক্ত করতে পারলে তাদের আগ্রহ বাড়বে। শিক্ষার্থীদের নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতে হবে ।

২. শ্রেণীকক্ষের পরিবেশে পরিবর্তন: গতানুগতিক সারিবদ্ধ বসার ব্যবস্থার বদলে শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট দলে বা গোল করে বসানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। শ্রেণীকক্ষে একটি ইতিবাচক ও সহযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা একে অপরকে সাহায্য করতে শিখবে। শিক্ষার্থীদের ভালো কাজ বা আঁকা ছবি দেয়ালে প্রদর্শন করে তাদের কাজের স্বীকৃতি দিলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

৩. ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্ব প্রদান: প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নাম ধরে সম্বোধন করা উচিত, এতে তারা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। যারা নিষ্ক্রিয় থাকে, তাদের সরাসরি ছোট ছোট প্রশ্ন করে পাঠে মনোযোগী করা যেতে পারে। পড়াশোনার বাইরেও শিক্ষার্থীদের অন্যান্য প্রতিভা, যেমন—আঁকা, গান বা খেলাধুলাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

৪. প্রযুক্তির ব্যবহার: আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে শ্রেণীকক্ষকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা যায়। পাঠ সম্পর্কিত ভিডিও, অ্যানিমেশন বা শিক্ষামূলক অ্যাপস ও গেমের মাধ্যমে পাঠদান করলে তা শিক্ষার্থীদের কাছে আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে।

৫. অভিভাবকদের সম্পৃক্তকরণ: শিক্ষার্থীর সার্বিক বিকাশের জন্য পরিবার ও শিক্ষকের মধ্যে সংযোগ থাকা জরুরি। নিষ্ক্রিয় শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করে তাদের সন্তানের আগ্রহ বা সমস্যার কথা জানতে হবে।

উপসংহার প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যেই লুকিয়ে আছে অপার সম্ভাবনা। প্রয়োজন শুধু ধৈর্য, সঠিক কৌশল এবং শিক্ষার্থীর মনস্তত্ত্ব বোঝার ক্ষমতা। একটি ইতিবাচক এবং অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে আমাদের শ্রেণীকক্ষগুলোকে আবারও প্রাণবন্ত ও সক্রিয় করে তোলা সম্ভব, যেখানে কোনো শিক্ষার্থীই পিছিয়ে পড়বে না।

 

মন্তব্য করুন