Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ অক্টোবর, ২০২৫ ০৮:০৮ অপরাহ্ণ

“বাংলাদেশের শিক্ষার মান তলানিতে”

বাংলাদেশের শিক্ষার মান তলানিতে

মোহাম্মদ মনির হোসেন

প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, মেহের ডিগ্রি কলেজ, শাহরাস্তি, চাঁদপুর। +8801811656353


​স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরেও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। শিক্ষায় অভিগম্যতা এবং সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে ঈর্ষণীয় সাফল্য এলেও, শিক্ষার গুণগত মান (Quality) নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বারবার। বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এদেশের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে বহুলাংশে পিছিয়ে। জ্ঞান সূচক ও বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের নাজুক অবস্থান কার্যত ইঙ্গিত দেয়—"বাংলাদেশের শিক্ষার মান তলানিতে"। এই লেখনির মাধ্যমে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা, সমস্যা ও এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করবে।

১. শিক্ষার মানের অবনতির চিত্র ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড

​বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বাংলাদেশের শিক্ষার মানের ক্রমাগত অবনতিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়:

শিখন ঘাটতি (Learning Poverty): বিশ্বব্যাংকের চলতি বছরের (২০২৪) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১৮ বছর বয়সী একজন শিক্ষার্থী আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করলেও তার অর্জিত জ্ঞানের মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মাত্র ৬.৫  বছরের সমতুল্য। অর্থাৎ, শিক্ষায় আন্তর্জাতিক মানে বাংলাদেশ কমপক্ষে ৪.৫ বছর পিছিয়ে। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সপ্তম শ্রেণির সমান।

দক্ষতার অভাব ও বেকারত্ব: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে যত বেকার রয়েছে, তার মধ্যে ১৩.৫ শতাংশই স্নাতক ডিগ্রিধারীএটি স্পষ্ট করে যে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষতা (Soft Skills, Analytical Ability, Critical Thinking) তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে ব্যর্থতা: যুক্তরাজ্যভিত্তিক কিউএস বা টাইমস হায়ার এডুকেশন (Times Higher Education) এর মতো বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে বিশ্বের সেরা ১০০০ বা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে স্থান করে নিতে পারছে না। এটি দেশের উচ্চশিক্ষার দুর্বল গবেষণা সংস্কৃতি ও নিম্নমানের পাঠদান পদ্ধতির প্রমাণ দেয়।

সৃজনশীলতার নিম্ন সূচক: দেশে প্রায় ১৭ বছর ধরে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চালু থাকলেও, সৃজনশীল ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে তলানিতে। মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের হতে না পারা এর প্রধান কারণ।

২. শিক্ষার মানের অবনতির মূল কারণসমূহ

​শিক্ষার মান তলানিতে যাওয়ার পেছনে একাধিক গভীর ও কাঠামোগত কারণ দায়ী। এর মধ্যে প্রধান কারণগুলোকে নিম্নোক্তভাবে বিশ্লেষণ করা যায়

শিক্ষক ও শিক্ষাদানের মান:

শিক্ষক হচ্ছেন শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণ। কিন্তু এই ক্ষেত্রে দুর্বলতা প্রকট:

অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত শিক্ষক: শিক্ষকদের একটি বড় অংশ আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি এবং নতুন কারিকুলাম সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত নন। অনেক শিক্ষকই পুরোনো মুখস্থনির্ভর পদ্ধতিতে অভ্যস্ত।

মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় অনাগ্রহ: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহ দেখান না।

রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ: উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে (বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধা, গবেষণা এবং একাডেমিক যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতি প্রাধান্য পাওয়ায় গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষক তৈরি হচ্ছে না।

ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি:

পরীক্ষামুখী ও সনদনির্ভর শিক্ষা: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত GPA 5-সর্বস্বঅভিভাবক থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সকলের লক্ষ্য কেবল ভালো ফলাফল বা 'গোল্ডেন এ প্লাস' অর্জন করা। এর ফলে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনের চেয়ে মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো করার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়।

সৃজনশীল পদ্ধতির অপপ্রয়োগ: ২০০৯ সালে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হলেও, এটিকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ না করে এটিকে এক প্রকার গাইড-নির্ভরতা ও নোট-মুখস্থের নতুন পথ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এটি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতাকে দমন করেছে।

অপর্যাপ্ত বাজেট ও গবেষণায় স্বল্প বিনিয়োগ:

কম বাজেট বরাদ্দ: জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী, একটি দেশের শিক্ষাখাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪% থেকে ৬%অথচ বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপি'র মাত্র ২.০৮% (২০২৩-২৪ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী), যা দক্ষিণ এশিয়ার গড় থেকেও অনেক কম।

গবেষণায় শূন্য বিনিয়োগ: উচ্চশিক্ষায় গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্দ অত্যন্ত অপ্রতুল। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই গবেষণা প্রায় নেই বললেই চলে। ফলস্বরূপ, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক জ্ঞান অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সীমিত।

অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও ডিজিটাল বৈষম্য:

শ্রেণিকক্ষ ও উপকরণের অভাব: দেশের বিশেষ করে গ্রামীণ স্কুলগুলোতে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই এবং প্রায় ৩৫% শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণের সংকট রয়েছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী থাকায় পাঠদানের কার্যকারিতা কমে যায়।

ডিজিটাল বিভাজন: শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য প্রকট। দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগের অভাব গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের আরও পিছিয়ে দিচ্ছে।

৩. শিক্ষার মান অবনতির ভয়াবহ প্রভাব

​শিক্ষার গুণগত মান তলানিতে যাওয়ার ফলে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জাতিগত ও অর্থনৈতিক জীবনে:

মানবসম্পদ উন্নয়নে বাধা: শিক্ষার মান খারাপ হওয়ায় দেশের বিশাল সংখ্যক জনসংখ্যা দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে পারছে না। এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

বৈদেশিক নির্ভরতা বৃদ্ধি: দক্ষ জনশক্তির অভাবে বিদেশী বিশেষজ্ঞরা এদেশে এসে কাজ করছেন এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে নিয়ে যাচ্ছেন। অপরপক্ষে, দেশের শিক্ষিত যুবকরা কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশায় ভুগছেন।

জ্ঞাননির্ভর সমাজ প্রতিষ্ঠা ব্যাহত: মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা একটি জ্ঞাননির্ভর, বিশ্লেষণাত্মক ও সমালোচনা মূলক চিন্তাভাবনা সম্পন্ন সমাজ গঠনে বাধা দেয়। ফলে সমাজের সামগ্রিক প্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়।

শিক্ষার্থী বিদেশমুখীতা: দেশের উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে হতাশার কারণে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, যা দেশের মেধা পাচারকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

৪. উত্তরণের পথ ও সমাধান

​শিক্ষার মান উন্নয়নে একটি সমন্বিত ও দূরদর্শী জাতীয় পরিকল্পনা অপরিহার্য। রাতারাতি এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নিলে দীর্ঘমেয়াদে এর ফল পাওয়া যাবে:

শিক্ষকের মান উন্নয়ন ও মর্যাদা বৃদ্ধি

আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো: প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকদের জন্য আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে, যেন মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে উৎসাহিত হন।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা আবশ্যক।

প্রশিক্ষণের আধুনিকায়ন: শিক্ষকদের জন্য আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি এবং শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা বিকাশের ওপর নিয়মিত ও মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

কারিকুলাম ও পদ্ধতির সংস্কার

কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা: শিক্ষাকে সনদসর্বস্বতা থেকে বের করে এনে কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক (Vocational and Skills-based) করতে হবে। পাঠ্যক্রমে সফট স্কিলস, ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন: মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা বাদ দিয়ে এমন মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করতে হবে যা শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা, প্রয়োগিক জ্ঞান ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনাকে প্রাধান্য দেয়। নতুন কারিকুলামে শিখনকালীন মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়ায় তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি

বাজেট বৃদ্ধি: শিক্ষাখাতে জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ৪% অথবা জিডিপি' ৬% বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে, যা ইউনেস্কোর সুপারিশের কাছাকাছি।

গবেষণায় বিনিয়োগ: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা বরাদ্দ কয়েক গুণ বাড়াতে হবে এবং গবেষণার মান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।

জবাবদিহিতা ও সুশাসন

নিয়মিত মনিটরিং: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষকদের উপস্থিতি ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত ও কঠোর জবাবদিহিতা ও মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শিক্ষাঙ্গন: শিক্ষাঙ্গনকে অপরাজনীতি ও অস্থিরতা মুক্ত রাখতে হবে, যাতে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকে।

​বাংলাদেশের শিক্ষার মান তলানিতেএই কঠোর সত্যটি একটি জাতীয় সংকট। জনসংখ্যাকে 'জনশক্তিতে' পরিণত করতে হলে এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে মানসম্মত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থীসকলকেই এই সত্য উপলব্ধি করতে হবে। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি জ্ঞানভিত্তিক, দক্ষ ও নৈতিক মানবসম্পদ গড়ে তোলাই হতে পারে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তিস্থাপন। এখন সময় এসেছে সস্তা পরিসংখ্যানের সাফল্য উদযাপন না করেগুণগত মানের গভীর সংকটে মনোনিবেশ করা এবং একটি কার্যকর জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।


 

মন্তব্য করুন