প্রভাষক
০৬ অক্টোবর, ২০২৫ ০৮:১১ অপরাহ্ণ
ছাত্র–ছাত্রীদের পড়াশোনায় অনাগ্রহ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার
ছাত্র–ছাত্রীদের পড়াশোনায় অনাগ্রহ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার
মোহাম্মদ মনির হোসেন
প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, মেহের ডিগ্রি কলেজ, শাহরাস্তি, চাঁদপুর। +8801811656353
ধাপ–১: ভূমিকা:
শিক্ষা একটি জাতির অগ্রগতির প্রধান শক্তি। মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন সম্ভব নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বহু দেশে ছাত্র–ছাত্রীদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ভর্তি হার যতই বাড়ুক না কেন, নিয়মিত উপস্থিতি, শিক্ষার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব এবং শেখার আনন্দ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট:
ফিনল্যান্ডে স্কুলশিক্ষায় শিক্ষার্থীর আগ্রহ ধরে রাখতে “স্টুডেন্ট–সেন্টারড লার্নিং” পদ্ধতি ব্যবহার হয়; প্রতিটি শিশু নিজের গতিতে শেখে এবং শিক্ষকরা মূলত গাইড হিসেবে কাজ করেন। ফলে ড্রপআউট হার বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন। জাপানে শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা ও দলগত কাজের মাধ্যমে দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা হয়, যাতে তারা পড়াশোনাকে কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতি নয়, জীবনের অংশ হিসেবে দেখে। সিঙ্গাপুরে উচ্চমানের শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিভিত্তিক পাঠদান এবং প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা শিক্ষার্থীর কৌতূহল জাগিয়ে রাখে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারিক সমর্থন ও স্কুলের “after-school programs” পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধিতে কার্যকর । দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রাইভেট লার্নিং সেন্টার শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পারফরম্যান্সে বাড়তি উদ্দীপনা যোগ করে, যদিও অতিরিক্ত চাপের ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশে ভর্তি হার ৯৮% হলেও প্রাথমিক স্তরে ড্রপআউট হার এখনও প্রায় ১৫% (BANBEIS, 2023)। মাধ্যমিক স্তরে পরীক্ষাভীতি, পরিবারিক আর্থিক চাপ, গ্যাজেটের প্রতি আসক্তি এবং মানসম্পন্ন শিক্ষকের ঘাটতি শিক্ষার্থীর আগ্রহ কমিয়ে দেয়। গ্রামীণ এলাকায় বইপত্র ও প্রযুক্তির সীমিত প্রাপ্যতা এবং শহরে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার চাপ—দুটিই সমানভাবে সমস্যা সৃষ্টি করছে। এই সমস্যার পেছনে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, মানসিক ও শিক্ষণ-পদ্ধতিগত নানা উপাদান কাজ করে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক শ্রেণিতেই শেখার আনন্দ হারিয়ে ফেলে, যা পরবর্তীতে পুরো শিক্ষাজীবনে প্রভাব ফেলে। আবার ডিজিটাল বিনোদন এবং অগভীর কনটেন্টে সহজ প্রবেশাধিকারও দীর্ঘমেয়াদে মনোযোগ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ছাত্র–ছাত্রীদের পড়াশোনায় অনাগ্রহের সঠিক কারণ চিহ্নিত ও সমাধান প্রস্তাব করা জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। বিভিন্ন দেশের সফল নীতি ও কর্মসূচি থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক করা সম্ভব।
ধাপ–2: ছাত্র–ছাত্রীদের পড়াশোনায় অনাগ্রহের কারণ:
পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হ্রাস একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। এর পেছনে পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক প্রভাব, অর্থনৈতিক চাপ, প্রযুক্তির ব্যবহার, মানসিক স্বাস্থ্য এবং শিক্ষণ–পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা কাজ করে। নীচে এই কারণগুলো বিশদভাবে আলোচনা করা হলো:
২.১ পারিবারিক পরিবেশ
পরিবার শিক্ষার্থীর শেখার অভ্যাস গড়ে তোলে। যেখানে বাবা–মা শিক্ষার গুরুত্ব বোঝেন এবং সন্তানের প্রতি পর্যাপ্ত সময় দেন, সেখানে শিশুদের পড়াশোনার আগ্রহ বেশি দেখা যায়। বিপরীতে, পরিবারে যদি দ্বন্দ্ব, অবহেলা বা আর্থিক অনটন থাকে, শিশু পড়াশোনা থেকে মনোযোগ হারায়। বাংলাদেশে অনেক পরিবারে পিতামাতার শিক্ষাগত পটভূমি সীমিত; ফলে তারা সন্তানের পড়াশুনায় পরামর্শ দিতে পারেন না। যুক্তরাষ্ট্রে পারিবারিক সহায়তা শিক্ষার্থীর একাডেমিক পারফরম্যান্সে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে; গবেষণা বলছে, “parental involvement” থাকলে ফলাফলের উন্নতি হয়। ভারতে নিম্ন–আয়ের পরিবারের শিশুরা প্রায়শই গৃহস্থালির কাজে অংশ নেয়, যা স্কুলে উপস্থিতি কমিয়ে দেয়।
২.২ প্রযুক্তির প্রভাব
ডিজিটাল যুগে শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, ভিডিও গেম, রিলস, অনলাইন কনটেন্ট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়ছে। এই আসক্তি পড়াশোনার সময়কে প্রতিস্থাপন করছে এবং মনোযোগের ক্ষমতা হ্রাস করছে। Przybylski & Weinstein (2019)-এর গবেষণা অনুযায়ী, দিনে দুই ঘণ্টার বেশি গেম খেলা বা বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম পড়াশোনার আগ্রহ কমায়। দক্ষিণ কোরিয়ায় “গেমিং অ্যাডিকশন” নিয়ে সরকারী উদ্যোগ রয়েছে, যেখানে শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট গেমিং সময় নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা গ্রামীণ এলাকার কিশোর–কিশোরীদের মধ্যেও বিনোদনের প্রতি বেশি আকর্ষণ তৈরি করেছে।
2.3 অস্পষ্ট লক্ষ্য বা টার্গেটের অভাব
‘পড়ে কী লাভ হবে' বা কেন পড়ছি—এই ধরনের সুস্পষ্ট লক্ষ্য না থাকলে পড়াশোনার প্রতি উদাসীনতা তৈরি হয়।
2.4 চাকরি বাজারের বাস্তবতা:
উচ্চশিক্ষিত হওয়ার পরও উপযুক্ত চাকরি না পাওয়ার কারণে অনেকে পড়াশোনার গুরুত্ব কম মনে করে।
2.5 স্কুলে খেলার মাঠ ও সৃজনশীল কাজের অভাব:
খেলাধুলা ও অন্যান্য সৃজনশীল কাজের সুযোগ কম থাকলে পড়ালেখার বাইরে অন্য কোনো উপায়ে মানসিক চাপ কমানোর সুযোগ থাকে না।
২.6 পাঠ্যক্রম ও শিক্ষণ–পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা:
পাঠ্যসূচি যদি বাস্তব জীবনের সাথে সম্পর্কিত না হয়, শিক্ষার্থী শেখার উদ্দেশ্য বুঝতে পারে না। মুখস্থ নির্ভর শিক্ষা, জটিল ভাষা এবং একঘেয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিবেশ পড়াশোনাকে বিরক্তিকর করে তোলে। ফিনল্যান্ডে পাঠ্যক্রম “phenomenon-based learning” পদ্ধতিতে সাজানো হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজে শেখে। বাংলাদেশে এখনও অনেক স্কুলে শিক্ষক–কেন্দ্রিক ক্লাসরুম চালু আছে, যেখানে শিক্ষার্থীর মতামত শোনার সুযোগ কম। ফলে সক্রিয় অংশগ্রহণের বদলে তারা নিস্ক্রিয় শ্রোতা হয়ে যায়। জাপানে দলগত কার্যক্রম এবং শিল্প–সংস্কৃতির সমন্বয়ে শেখার কৌশল শিক্ষার্থীর কৌতূহল বাড়ায়।
২.7 অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক বৈষম্য:
অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে বাধা দেয়। নিম্ন–আয়ের পরিবারের সন্তানদের অনেকে আয়ের উৎসে সহায়তা করতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের দরিদ্র এলাকায় শিশুশ্রম এখনও শিক্ষার জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। ভারতে “Mid-Day Meal” এবং “Samagra Shiksha” কর্মসূচি আর্থিক চাপ কমিয়ে আগ্রহ বাড়াতে সহায়তা করছে (NITI Aayog, 2023)। আফ্রিকার কয়েকটি দেশে (যেমন কেনিয়া, তানজানিয়া) শিক্ষা খরচ মওকুফের পর ভর্তি হার বেড়েছে, তবে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত না হওয়ায় আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন।
২.8 মানসিক স্বাস্থ্য ও আবেগীয় সমস্যা:
মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষার্থীর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদ্বেগ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের অভাব বা পারফরম্যান্সের ভয় শিক্ষার্থীর শেখার ইচ্ছা কমিয়ে দেয়। যুক্তরাজ্যে স্কুলে “pastoral support teams” থাকে, যারা শিক্ষার্থীর মানসিক সমস্যা শনাক্ত করে কাউন্সেলিং প্রদান করে। বাংলাদেশে বেশিরভাগ স্কুলে কাউন্সেলর নেই, ফলে শিক্ষার্থীর মানসিক সহায়তা সীমিত।
২.9 সহপাঠী প্রভাব ও সামাজিক চাপ:
সহপাঠীদের আচরণ পড়াশোনার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে। যদি বন্ধুদের মধ্যে শেখার সংস্কৃতি থাকে, তবে আগ্রহ বাড়ে; বিপরীতে, অবহেলার সংস্কৃতি থাকলে অনাগ্রহ বৃদ্ধি পায়। যুক্তরাষ্ট্রে ইতিবাচক “peer mentoring programs” শিক্ষার্থীর আগ্রহ বাড়াতে সহায়ক। বাংলাদেশে গ্রুপ স্টাডির সংস্কৃতি সীমিত; অনেক শিক্ষার্থী প্রাইভেট কোচিংয়ে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা স্বতঃস্ফূর্ত শেখার মানসিকতা হ্রাস করে।
২.10 পরীক্ষাভীতি ও চাপ:
অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাকে আনন্দের পরিবর্তে ভয়ের বিষয় বানিয়ে তোলে। বাংলাদেশে এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে পরিবারিক ও সামাজিক প্রত্যাশা এত বেশি যে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে। ফিনল্যান্ডে মূল্যায়ন পদ্ধতি নমনীয়; এখানে শিক্ষার্থীর ক্রমাগত অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়, যা চাপ কমায়। পড়াশোনায় অনাগ্রহের পেছনে কোনো একক কারণ কাজ করে না; বরং এটি পারিবারিক, সামাজিক, প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক এবং মানসিক নানা উপাদানের সম্মিলিত প্রভাব। ফলে সমস্যার সমাধানও বহুমাত্রিক হতে হবে।
মোটকথা, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া না করার কারণগুলো বেশ জটিল এবং বহুবিধ। এর জন্য শুধু শিক্ষার্থীদের দোষারোপ না করে, সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবার, এবং সামাজিক পরিবেশের দিকেও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
ধাপ–3: আন্তর্জাতিক তুলনা ও প্রভাব
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহ কেবল একটি দেশের সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক একটি চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন দেশে সামাজিক–অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও প্রযুক্তির ব্যবহারের ধরন অনুসারে সমস্যার প্রকৃতি ও তীব্রতা ভিন্ন হয়ে থাকে। এই অধ্যায়ে বিভিন্ন অঞ্চলের তথ্য ও গবেষণার আলোকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হলো।
৩.১ উত্তর আমেরিকা (যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা):
যুক্তরাষ্ট্রে “National Center for Education Statistics (NCES)” ২০২3 সালের এক জরিপে জানায়, মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৩০% শিক্ষার্থী পড়াশোনাকে “boring” বলে মনে করে। এর পেছনে মূল কারণ ছিল স্ক্রিন টাইম, একঘেয়ে পাঠ্যসূচি এবং পরীক্ষার চাপ। কানাডার “Early Leavers Report” (2022) অনুসারে, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় ত্যাগের হার গ্রামীণ এলাকায় শহরের তুলনায় বেশি; প্রায় ৮% কিশোর-কিশোরী ১৬–১৭ বছর বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। পরিবারিক অনুপ্রেরণা ও স্কুলের পরামর্শমূলক কার্যক্রমের ঘাটতি এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। উভয় দেশেই স্কুলগুলো “Project-based Learning” ও “Mentorship Programs” চালু করেছে, যা পড়াশোনায় পুনরায় আগ্রহ জাগাতে সাহায্য করছে।
৩.২ ইউরোপ:
ফিনল্যান্ডে শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ তুলনামূলক কম। কারণ সেখানে শিক্ষাব্যবস্থা নমনীয়, শিক্ষক–শিক্ষার্থী অনুপাত ছোট, এবং পরীক্ষার চাপ প্রায় নেই। যুক্তরাজ্যে গবেষণা বলছে, নিম্ন–আয়ের পরিবারের সন্তানদের স্কুলে আগ্রহ কম; তবে “Pupil Premium” নীতি আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে উৎসাহ দেয়। জার্মানিতে পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণমূলক শিক্ষা (Vocational Education) মাধ্যমিক স্তর থেকে শুরু হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী সাধারণ তাত্ত্বিক পড়াশোনা বাদ দিয়ে বাস্তব প্রশিক্ষণ বেছে নেয়। এটি আগ্রহ ধরে রাখার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের পথও খুলে দেয়।
৩.৩ দক্ষিণ এশিয়া (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল):
বাংলাদেশে UNICEF (2023) জানিয়েছে, গ্রামীণ এলাকায় মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৩৪% শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে যায় না। শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহের পাশাপাশি আর্থিক অসুবিধা, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমও প্রভাব ফেলে। ভারতে “Annual Status of Education Report (ASER) 2022” বলছে, ১৪–১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে ২৫% স্কুলে যায় না; মূল কারণ অর্থনৈতিক চাপ ও পরীক্ষাভীতি। পাকিস্তানে শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ বাড়ছে বিশেষত মেয়েদের মধ্যে; নিরাপত্তাহীনতা ও সাংস্কৃতিক বাঁধা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। নেপালে শিক্ষার্থীরা উচ্চমাধ্যমিকের পর প্রায়শই বিদেশে পড়াশোনা বা কাজের জন্য চলে যায়, যার ফলে স্থানীয় স্কুলে উপস্থিতি কমে।
৩.৪ পূর্ব এশিয়া (চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া):
চীনে “Gaokao” পরীক্ষা কেন্দ্রিক শিক্ষার কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার প্রতি একধরনের ভয় পোষণ করে। অনেকেই মানসিক চাপের কারণে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। জাপানে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার আগ্রহ ধরে রাখতে ক্লাব কার্যক্রম এবং সংস্কৃতি–ভিত্তিক শিক্ষা চালু রয়েছে। এর ফলে একঘেয়েমি কমে। দক্ষিণ কোরিয়ায় অনলাইন গেমিং আসক্তি পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হ্রাস করছে। সরকার “Shutdown Law” প্রবর্তন করে কিশোরদের রাতের গেম খেলা সীমিত করেছে।
৩.৫ আফ্রিকা:
কেনিয়ায় ২০২2 সালের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২৩% পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে শিক্ষক সংকট, বড় ক্লাসরুম এবং পাঠ্যপুস্তকের অভাব। নাইজেরিয়া ও উগান্ডাতে দারিদ্র্য ও শিশুশ্রম শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহের মূল চালক। তবে “Universal Primary Education” কর্মসূচি ভর্তি বাড়ালেও মানসম্পন্ন শিক্ষা না থাকায় অনেক শিশু পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না।
৩.৬ লাতিন আমেরিকা:
ব্রাজিলে স্কুল ফাঁকি দেওয়ার হার প্রায় ১৮%। বিশেষত দরিদ্র শহুরে এলাকায় সহিংসতা ও অপরাধ শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট করে। চিলিতে গবেষণা বলছে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে আবেগীয় সম্পর্ক থাকলে পড়াশোনার আগ্রহ বাড়ে।
৩.৭ আন্তর্জাতিক সংস্থার দৃষ্টিভঙ্গি:
UNESCO (2023) বলেছে, বৈশ্বিকভাবে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন শিশু ও কিশোর কার্যকরভাবে শেখার বাইরে রয়েছে। World Bank-এর রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, “learning poverty” — অর্থাৎ ১০ বছর বয়সে একটি সাধারণ লেখা বুঝে পড়তে না পারার হার — নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে ৫৭%। এই পরিস্থিতি শিক্ষার্থীর অনাগ্রহের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
৩.৮ প্রযুক্তি ও অনলাইন শিক্ষার বৈশ্বিক প্রভাব:
COVID-19 মহামারির সময় অনলাইন শিক্ষা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়। তবে অনেক দেশে (যেমন বাংলাদেশ, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা) ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিভাইসের সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে আগ্রহ হারায়। আবার উন্নত দেশগুলোতে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিখন–উদ্দীপনা কমিয়ে দেয়।
বিভিন্ন দেশের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, পড়াশোনায় অনাগ্রহের কারণ প্রায় সর্বজনীন হলেও এর রূপ ও তীব্রতা স্থানভেদে আলাদা। উন্নত দেশে প্রযুক্তি ও একঘেয়েমি প্রধান কারণ, যেখানে উন্নয়নশীল দেশে দারিদ্র্য, শিশুশ্রম ও শিক্ষা–অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সমাধান তৈরির সময় প্রতিটি দেশের সামাজিক–অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে।
ধাপ–4: সমস্যার প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি:
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহ শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি পরিবার, সমাজ এবং জাতীয় উন্নয়নের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। নিচে এ সমস্যা থেকে উদ্ভূত স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলো আলোচিত হলো।
৪.১ ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রভাব
৪.১.১ শিক্ষাগত ফলাফল হ্রাস
পড়াশোনায় আগ্রহ না থাকলে উপস্থিতি কমে যায়, অ্যাসাইনমেন্ট অসম্পূর্ণ থাকে, এবং পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল আসে। ফলে শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস কমে এবং পড়াশোনা আরও বিরক্তিকর মনে হয়।
৪.১.২ শেখার দক্ষতার ঘাটতি
যারা মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে না, তাদের মৌলিক পড়া, লেখা, বিশ্লেষণ ও সমাধান–ক্ষমতা দুর্বল হয়। World Bank (2022) অনুসারে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে “learning poverty” ৫৭% পর্যন্ত পৌঁছেছে, অর্থাৎ ১০ বছর বয়সে অনেক শিশু সাধারণ লেখা বুঝে পড়তে পারে না।
৪.১.৩ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা
পড়াশোনায় অনাগ্রহ প্রায়শই হতাশা, আত্মসম্মানহীনতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেয়। আত্মবিশ্বাসের অভাবে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে অন্য কাজে মনোযোগী হয়। কিছু ক্ষেত্রে এটি স্কুল–ত্যাগ বা “dropout” পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায়।
৪.২ পারিবারিক পর্যায়ে প্রভাব
৪.২.১ অর্থনৈতিক চাপ
শিক্ষার্থী যখন পড়াশোনা থেকে সরে যায়, পরিবারকে প্রায়শই অতিরিক্ত আয়ের জন্য তার ওপর নির্ভর করতে হয়। স্বল্পমেয়াদে আয় বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার অভাবে উপার্জন সীমিত থাকে।
৪.২.২ সম্পর্কের টানাপোড়েন
পড়াশোনার প্রতি সন্তানের অনাগ্রহ পিতামাতার মধ্যে হতাশা তৈরি করে। অনেক সময় অতিরিক্ত শাসন বা চাপ পারিবারিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৪.৩ সামাজিক পর্যায়ে প্রভাব
৪.৩.১ দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি
যখন বড় অংশের শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে দেয় বা দক্ষতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়, তখন শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর অভাব দেখা দেয়। বাংলাদেশে এক জরিপ (BIDS, 2023) বলছে, বেকারদের প্রায় ৪৫%–এর উপযুক্ত দক্ষতা নেই। ইউরোপে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন ব্যক্তিরা সাধারণত স্থিতিশীল চাকরিতে যুক্ত হন, কিন্তু পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার দ্বিগুণ।
৪.৩.২ অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতা
শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন তরুণদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি। OECD (2022)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কুল–ত্যাগী কিশোরদের মধ্যে অপরাধমূলক আচরণের হার বিদ্যালয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
৪.৩.৩ সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি
যারা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না, তারা উচ্চ আয় বা মর্যাদাপূর্ণ পেশায় প্রবেশের সুযোগ হারায়। ফলে দারিদ্র্য থেকে মুক্তির পথ সংকীর্ণ হয় এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম বৈষম্য স্থায়ী হয়।
৪.৪ জাতীয় পর্যায়ে প্রভাব
৪.৪.১ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত
শিক্ষিত জনশক্তি অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। পড়াশোনায় অনাগ্রহী জনসংখ্যা যত বাড়ে, উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা তত কমে। UNESCO (2023) জানায়, প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন না করলে একজন শ্রমিকের গড় আয় ২০–৩০% কমে যায়।
৪.৪.২ স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাগত ঝুঁকি
অশিক্ষিত বা কম শিক্ষিত জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্য সচেতনতার দিক থেকে পিছিয়ে থাকে। ফলে স্বাস্থ্যব্যয় বাড়ে এবং জীবনমান কমে। পাশাপাশি, শিক্ষা বাল্যবিবাহ ও উচ্চ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে (UNICEF, 2022)।
৪.৪.৩ প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া
ডিজিটাল যুগে উদ্ভাবন ও তথ্যপ্রযুক্তি–ভিত্তিক কাজের জন্য উচ্চমানের শিক্ষা অপরিহার্য। পড়াশোনায় অনাগ্রহী তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি শেখার ক্ষমতা কম থাকে, ফলে জাতি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।
৪.৫ দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি
৪.৫.১ প্রজন্মগত দারিদ্র্য
যেসব শিশু শিক্ষার সুযোগ হারায়, তাদের সন্তানেরাও ভবিষ্যতে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সীমিত সুযোগ পায়। এই প্রজন্মগত দারিদ্র্য জাতীয় উন্নয়নের জন্য বড় বাধা।
৪.৫.২ গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের অভাব
শিক্ষা সচেতন নাগরিক তৈরির জন্য অপরিহার্য। যখন তরুণ প্রজন্ম শিক্ষার বাইরে থাকে, তারা সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় কম অংশগ্রহণ করে, ফলে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়।
৪.৫.৩ সংস্কৃতির অবক্ষয়
শিক্ষার মাধ্যমে সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। পড়াশোনায় অনাগ্রহী প্রজন্ম ঐতিহ্য, সাহিত্য ও শিল্পের প্রতি উদাসীন হতে পারে, যা জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পড়াশোনায় অনাগ্রহ কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও জাতির জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন একটি প্রজন্ম অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক স্থিতি ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই এই সমস্যার মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া অপরিহার্য।
ধাপ–5: সমাধান ও নীতিগত সুপারিশ
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহ দূর করা একটি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ, যা পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব। এই অধ্যায়ে কার্যকর সমাধান এবং নীতিগত প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হলো।
৫.১ পরিবারভিত্তিক উদ্যোগ
৫.১.১ পারিবারিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি
বাবা-মাকে সন্তানের পড়াশোনায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। নিয়মিত পড়ার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা, প্রশংসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা শিক্ষার্থীর মধ্যে উৎসাহ বাড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রে “Family-School Partnership” কর্মসূচি দেখিয়েছে যে, পিতামাতার সম্পৃক্ততা শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ও ফলাফলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৫.১.২ ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি
পরিবারে শিক্ষার মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সহিংসতা, অতিরিক্ত চাপ বা উপহাস এড়িয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে শেখার সুযোগ তৈরি করা দরকার।
৫.২ বিদ্যালয়ভিত্তিক উদ্যোগ
৫.২.১ শিক্ষণ-পদ্ধতির সংস্কার
পাঠ্যক্রমকে বাস্তব জীবনের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। “Project-based learning”, “Experiential learning” এবং “Gamified education” শিক্ষার্থীর আগ্রহ ধরে রাখতে সহায়ক।
৫.২.২ শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও প্রেরণা
শিক্ষকদের নতুন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত করতে হবে। শিক্ষক যেন কেবল তথ্য প্রদানকারী নয়, বরং অনুপ্রেরণাদাতা হয়ে ওঠেন। সফল শিক্ষক শিক্ষার্থীর কৌতূহল জাগিয়ে তোলে।
৫.২.৩ মানসিক স্বাস্থ্য সেবা
প্রতিটি বিদ্যালয়ে পেশাদার কাউন্সেলর নিয়োগ করা উচিত। উদ্বেগ, হতাশা বা আত্মবিশ্বাসের সমস্যায় ভুগলে শিক্ষার্থী যেন দ্রুত সহায়তা পেতে পারে।
৫.২.৪ প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার
ডিজিটাল আসক্তি প্রতিরোধের পাশাপাশি শিক্ষামূলক অ্যাপ, অনলাইন কোর্স এবং ভার্চুয়াল ক্লাসরুমের সঠিক ব্যবহার শেখার আগ্রহ বাড়াতে পারে।
৫.৩ সামাজিক উদ্যোগ
৫.৩.১ কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার
স্থানীয় পর্যায়ে গ্রন্থাগার, লার্নিং সেন্টার ও স্টাডি ক্লাব গড়ে তোলা শিক্ষার্থীর পড়াশোনার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
৫.৩.২ সমবয়সী সহায়তা
গ্রুপ স্টাডি প্রোগ্রাম চালু করে শিক্ষার্থীরা একে অপরকে শেখার অনুপ্রেরণা দিতে পারে।
৫.৩.৩ মিডিয়া ক্যাম্পেইন
গণমাধ্যমে শিক্ষা–বান্ধব প্রচারণা শিক্ষার্থীর পাশাপাশি পিতামাতা ও সমাজের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারে।
৫.৪ সরকারি ও নীতিগত সুপারিশ
৫.৪.১ আর্থিক সহায়তা ও বৃত্তি
অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ ও মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি চালু রাখতে হবে। ভারতের “Mid-Day Meal” প্রোগ্রাম শিশুদের স্কুলে উপস্থিতি বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
৫.৪.২ শিশুশ্রম নিয়ন্ত্রণ
সরকারকে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, কারণ এটি পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেয়।
৫.৪.৩ শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়ন
গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় মানসম্মত স্কুল, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং পর্যাপ্ত শিক্ষাসামগ্রী নিশ্চিত করা জরুরি।
৫.৪.৪ মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার
পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়নের পরিবর্তে ক্রমাগত মূল্যায়ন, মৌখিক পরীক্ষা ও প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করা যেতে পারে। এটি শিক্ষার্থীর উপর চাপ কমিয়ে শেখার আনন্দ ফিরিয়ে আনবে।
৫.৪.৫ শিক্ষা প্রযুক্তি নীতি
ডিজিটাল ডিভাইস ও ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার শেখানোর পাশাপাশি সময় ব্যবস্থাপনা বিষয়ক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।
৫.৫ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
৫.৫.১ সফল মডেল গ্রহণ
ফিনল্যান্ড, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশের সফল শিক্ষা কৌশল থেকে শেখার সুযোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ফিনল্যান্ডের শিক্ষার্থীমুখী পদ্ধতি এবং জাপানের ক্লাব কার্যক্রম বাংলাদেশের স্কুলে প্রয়োগযোগ্য।
৫.৫.২ গবেষণা ও নীতি বিনিময়
UNESCO, UNICEF এবং World Bank-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ কমাতে যৌথ গবেষণা ও নীতি বিনিময় কার্যকর হতে পারে।
৫.৬ ভবিষ্যতের জন্য রোডম্যাপ
1. স্বল্পমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা:
§ শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় ও সহজবোধ্য পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন।
§ স্কুলে নিয়মিত সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রম।
§ মানসিক স্বাস্থ্য সেবা চালু।
2. মধ্যমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা:
§ পাঠ্যক্রম সংস্কার এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ।
§ শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারে গাইডলাইন প্রণয়ন।
§ বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা বাড়ানো।
3. দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা:
§ স্কুল ত্যাগের হার শূন্যের কোঠায় নামানো।
§ শিক্ষার মান উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব।
§ জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশল শক্তিশালী করা।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহ একটি জটিল সমস্যা হলেও যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। পরিবার, শিক্ষক, সমাজ ও সরকার যদি সমন্বিতভাবে কাজ করে, তবে আগ্রহী ও দক্ষ শিক্ষার্থী গড়ে তোলা সম্ভব, যা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
৭
৭ মন্তব্য