আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর দিবসটি পালিত হয়। এই দিন বিশ্বের সব শিক্ষকের অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। আদর্শ সমাজ গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। আজ আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি মানবতার মহান শিক্ষক,পৃথীবিকে সভ্যতার আলো পৌঁছিয়ে দেওয়ার মুক্তির দূত প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)কে। স্মরণ করছি আমার শৈশবের শিক্ষক আমার প্রথম শিক্ষক আমার বাবা-মা সহ প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত যাদের হাতে আমার শিক্ষা জীবন গঠিত হয়েছে ও যাদের থেকে আমি একটি শব্দ ও শিখেছি সেই
সকল মহান শিক্ষকদেরকে। তাদের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। আর যারা ইন্তেকাল করেছেন তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশে দেশে যখন নতুন ভাবনা নিয়ে পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়, তখন ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থার (ইউনেস্কো) এক সভায় বিশ্বের শিক্ষকদের জন্য একটি ‘সনদ’ প্রণয়নের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা ঘোষণা করে, ‘শিক্ষা লাভ মানুষের মৌলিক অধিকার এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশের হাতিয়ার।’ এরই ফলে ১৯৫২ সালে বিশ্ব শিক্ষক সংঘ (ডাব্লিউটিপি) গঠিত হয়। এরপর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বিশেষজ্ঞদের এক সভায় শিক্ষকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা এবং তা সমাধানের জন্য কিছু প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর ইউনেস্কোর এক সভায় শিক্ষকতা পেশার জন্য কী দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং কী অধিকার ও মর্যাদা, তা নিয়ে ১৪৬ ধারা-উপধারাবিশিষ্ট একটি সুপারিশমালা প্রণয়ন করা হয়। এই ইউনেস্কো/আইএলও’র সুপারিশকেই ‘শিক্ষক সনদ’ বলা হয়। বিশ্বের ১৭২টি দেশের ২১০টি শিক্ষক সংগঠনের প্রতিনিধিত্বশীল সংস্থা এডুকেশন ইন্টারন্যাশনালের (EI) ক্রমাগত অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ইউনেস্কোর তৎকালীন মহাপরিচালক ড. ফ্রেডারিক মেয়রের যুগান্তকারী ঘোষণার ফলে ওই বছর থেকে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। এর লক্ষ্য শিক্ষক সনদ বাস্তবায়ন করা। ১৯৯৫ সালে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রথমবারের মতো সরকারি উদ্যোগে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপিত হয়।
ইউনেস্কো গতিশীল মনের অধিকারী কর্তব্যনিষ্ঠ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক সমাজের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ২০২৫ সালে ৩১তম বিশ্ব শিক্ষক দিবসের মূল বিষয় হিসেবে ‘Reacasting Teaching as a Collaborative Profession বা শিক্ষকতা পেশা: মিলিত প্রচেষ্টার দীপ্তি’ নির্ধারণ করেছে। এই দিবসটি উদ্যাপনকালে সারা বিশ্বের শিক্ষকদের মতো আমাদের দেশের শিক্ষকদেরও অতীতের সব অর্জন ও ব্যর্থতার সমীক্ষা করতে হবে এবং সেই সঙ্গে বিশ্বমানের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে সম্মিলিতভাবে সচেষ্ট হতে হবে।
শিক্ষককে 'মানুষ গড়ার কারিগর' এবং 'আলোর দিশারি' হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষকতা সৃষ্টিকর্তার দেয়া মহান দায়িত্ব। আমি গর্বিত পৃথিবীর সকল পেশার মধ্যে সেরা পেশার একজন হতে পেরে। আমি আরো গর্ব বোধ করি এই জন্য যে, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি নিজেই এ পরিচয় তুলে ধরে ঘোষণা করেছেন- বুয়েছতু মুয়াল্লেমুন 'শিক্ষক হিসেবে আমি প্রেরিত হয়েছি (ইবনু মাজাহ :২২৫)।'
শিক্ষকদের কল্যাণার্থে তাঁর অন্যতম একটি দোয়া ছিল – “ হে আল্লাহ! সকল শিক্ষককে ক্ষমা করো। তাঁদের দীর্ঘজীবী নেক হায়াত দান করো।’’ পবিত্র ইসলাম ধর্মও শিক্ষকদের উচ্চ আসনে আসীন করেছে। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেন- “ তোমরা জ্ঞান অর্জন কর এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য আদব-শিষ্টাচার শিখো। তাকে সম্মান কর যার থেকে তোমরা জ্ঞান অর্জন কর। (আল-মুজামুল আউসাত :৬১৮৪)
পবিত্র কুরআন মাজীদের প্রথম নাজিলকৃত আয়াত হচ্ছে- (خَلَقَ الَّذِي رَبِّكَ بِاسْمِ اقْرَأْ), "পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন"। যা জ্ঞানার্জনের প্রতি ইসলামের অটুট আহ্বানের প্রতীক। পবিত্র কুরআনের সূরা আর-রহমানের দ্বিতীয় আয়াত, যা আল্লাহ তা'আলা বলেন- (ٱلْقُرْءَانَ عَلَّمَ) (যার অর্থ "তিনি শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন"। তিনি মানুষ ও জ্বিনকে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। يَعْلَمُونَ لَا وَالَّذِينَ يَعْلَمُونَ الَّذِينَ يَسْتَوِي هَلْ قُلْ
যুমার-আয়াত- ০৯, বল- যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? (يُوحَىٰ إِ وَحْيٌ لَّا هُوَ إِنْ الْهَوَىٰ ۚعَنِ يَنطِقُ وَمَا সুরা নজম । অর্থাৎঃ ( রাসুল সাঃ ) নিজ প্রবৃত্তি হতে কিছুই বলেন না বরং তিনি যা বলেন তা আল্লাহর পক্ষ হতে ওহী বটে । জ্ঞানীর কলমের কালী শহীদের রক্তের চেয়ে উত্তম। একজন আবেদের ইবাদত অপেক্ষা একজন জ্ঞানীর ঘুম উত্তম। বিদায় হজের ভাষণে রাসুল (সঃ) বলেন- رَسُولِهِ وَسُنَّةَ اللَّهِ كِتَابَ بِهِمَا تَمَسَّكْتُمْ مَا تَضِلُّوا لَنْ أَمْرَيْنِ فِيكُمْ تَرَكْتُ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি তোমাদের মধ্যে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা সে দু’টি জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না- আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রসূলের হাদীস।
শিক্ষক নামটি বেশ ওজনদার। second mother খ্যাত শিক্ষক, প্রাণিত্বকে মনুষ্যত্বে কনভার্ট করার মহান দায়িত্বে ব্রত। শিক্ষকের কাজ সম্পর্কে বলতে গেলে Burtrand Russell –এর কথাটি না বললেই নয়। তিনি বলেন- শিক্ষকের কাজ দুটি। (১) শিক্ষার্থীদের পাঠের প্রতি আগ্রহী করে তোলা। (২) সেই আগ্রহকে নিবৃত করা । কিতাবে- কলমে কাজ দুটোকে সহজ মনে হলেও প্রাক্টিকালি কাজ দুটো খুবই কঠিন। যারা এ দুটো কাজ সুচারুরূপে করতে পারেন তারাই শিক্ষক। তাদের পদতলে শিক্ষার্থীরা মাথা ঝুঁকাতে বাধ্য। শিক্ষকদের ও মনে রাখা উচিৎ , “ সবাই যদি পারদকে স্বর্ণ করতে জানে তাহলে স্বর্ণের দামটা থাকবে কোথায় ?” অর্থাৎ প্রকৃত শিক্ষক হয়ে উঠা বহু সাধনার বিষয়।
অসম্ভব সুন্দর যাদু দেখায় জুয়েলাইট । হাতের যাদুর কাঠি হয়ে উঠে ফুলের তোড়া, ডিম থেকে ফুটে হয় ছানা-বাচ্চা, একটি রশিকে ১০ টুকরো করে নিমিষেই জোড়া লেগে দেয়। আর আমরা শিক্ষকরা জুয়েলাইটের চেয়েও বড় যাদুকর। চুম্বুকের মত আকর্ষন করার ক্ষমতা আছে আমাদের। আমাদেরকে কখনো অভিনেতা হতে হয়, কখনো কৃষক হতে হয়,কখনো ডাক্তার হতে হয় কখনো বা আবার খেলোয়াড় হতে হয়,কখনো চিত্র শিল্পী, কখনো কণ্ঠ শিল্পী হতে হয়ে। শিশুর শিখন আনন্দদায়ক ও স্থায়ী করার জন্য এক এক সময় এক এক রকম ভূমিকা রাখতে হয়। আমরা শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে কথার তুবড়ি ছুটিয়ে শিক্ষার্থীদের বিমোহিত করি। একশ আকাশ, একশ নদী, অযুত স্বপ্ন বুকে পুষতে বাধ্য করি । আমরা শিক্ষকরা হচ্ছি রাস্তার মত, রাস্তা যেমন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে পথিককে তার গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দেয় শিক্ষকরাও তেমনি তাদের শিক্ষার্থীদেরকে স্বপ্নের পথে হাঁটিয়ে নিজ লক্ষ্যে পৌঁছে দেয় আর আমরা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকি। তাই আমরা শিক্ষকরা গর্ব করে বলতেই পারি- We can make a difference.We can make nation. শিক্ষকরাই অন্যের সন্তানের সফলতায় গর্ব বোধ করতে পারে। নিজের জীবনের স্বপ্ন নেই কিন্তু শিক্ষার্থীদের জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করা শিক্ষকদের কাজ।
জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মার্কেল বলেছেন-শিক্ষকরা সাধারণ মানুষ নয়,তাই যোগ্যতা ছাড়া শিক্ষকতা পেশা গ্রহণ করা কাম্য নয়। জার্মানির বিচারক,চিকিতসক ও প্রকৌশলীরা যখন সেদেশের সর্বোচ্চ বেতন ভোগী শিক্ষকদের সমতুল্য বেতন প্রদানের অনুরোধ জানান তখন তত কালীন চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মার্কেল তাদের বলেন- যারা আপনাদের শিক্ষাদান করেছেন তাদের সঙ্গে কিভাবে আপনাদের তুলনা করি? প্রকৃত পক্ষে আদর্শ শিক্ষক ই হলেন সমাজের শ্রেষ্ঠ সন্তান।
‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতার কবি কাজী কাদের নেওয়াজ বলেন- ‘শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার, দিল্লির পতি সে তো কোন ছার।’ ‘আজ হতে চির উন্নত হলো, শিক্ষাগুরুর শির, সত্যই তুমি মহান উদার, বাদশাহ আলমগীর।’ এই পংক্তি গুলোতে কবি কাজী কাদের নেওয়াজ উদার হৃদয় বাদশাহ আলমগীরের প্রশংসা করার পাশাপাশি ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন শিক্ষকতা পেশার।
তুলনা বিচারে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষকতায় প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির পাল্লাই ভারী। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে ও শিক্ষকরা এখনো তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। দৈনিক টিপিন ভাতা পান মাত্র ৬.৬৬ টাকা, ভ্যাকেশনাল ডিপার্টমেন্টের নামে অর্জিত ছুটি থেকে বঞ্চিত ও অবসরে আর্থিকভাবে ক্ষতগ্রস্থতা, উচ্চতর স্কেল পাওয়ার ক্ষেত্রে বঞ্চিত, গ্রেডেশনে সিনিয়র জুনিয়র সমস্যা,পদোন্নতির ক্ষেত্রে জটিলতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত দীর্ঘসূত্রীতা, রয়েছে আরো নানা চরম বৈষম্য। এ ছাড়া রয়েছে মান-মর্যাদার প্রশ্ন। আরো কম যোগ্যতার কর্মচারী আরো উপরের গ্রেডে বেতন পাওয়া, সম যোগ্যতায় ১০ম গ্রেড পাওয়া কর্মচারী ও আছে অনেক।
আর এসব কারণে প্রাথমিকে অনেক শিক্ষক ঝরে পড়ে। আমরা শিক্ষার্থী ঝরে পড়া নিয়ে কাজ করলে ও শিক্ষক ঝরে পড়া নিয়ে কী কাজ করি?
অন্তবর্তী কালীন সরকার বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্রাচার্যের নের্তৃত্ব গঠিত জাতীয় শ্বেতপত্র কমিটি তাদের দেওয়া প্রতিবেদনে বলেছেন-শিক্ষকতা এমন একটি পেশা যেখানে মনোযোগ ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে গড়ে তোলা হয়। সেজন্য তাদের বেতন দেওয়ায় কার্পন্য করা যাবে না। এমন কি বেতন কাঠামোর গ্রেড ও অন্য পেশার সঙ্গে তুলনা করা ও বাস্তব সম্মত নয়। শিক্ষকদের স্বাভাবিক জীবনধারা নিশ্চিত করলেই কেবল যথাযথ বুদ্ধিবৃত্তিক আউটপুট পাওয়া সম্ভব। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিন্ম ও এশিয়ার মধ্যে ৪৫ তম।
শ্বেতপত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটরস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও বলেন- পেট ঠিক তো সব ঠিক। এটা খুব সরল কথা। আবার এটাই খুব কঠিন কথা। স্ত্রী-সন্তান ও নিজের পেট না চললে দেশ ও জাতীর জন্য ভবাটা খুব কঠিন। তারপর ও আমি মনে করি বাংলাদেশের শিক্ষকরা শত প্রতিকূলতার মধ্যে ও টিকে আছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে অন্তবর্তী কালীন সরকারের মাননীয় অর্থ উপদেষ্টা ও প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন- ভুখা পেটে আর কতদিন পড়াবেন শিক্ষকরা। উনারা কী শুধু শিক্ষকদেরকে সহানুভুতীরবানী শোনাবেন? নাকি শিক্ষকদের জন্য কিছু করবেন?
প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য সরকার গঠিত একটি ৯ সদস্যের কনসালটেশন কমিটি করা হয়েছে, যার আহ্বায়ক হচ্ছেন ব্রাক বিশ্ব বিদ্যালয়ের ইমিরেটস ড. মনজুর আহমদ। তারা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। সেখানে শিক্ষকদেরকে এট্রি পদে ১২ তম গ্রেড ৪ বছর পর ১১ তম গ্রেড দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু আজকে পাঁচ/ছয় মাসে ও সেটার বাস্তবায়ন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ২০০৯ সাল থেকে প্রাথমিকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি বন্ধ আছে। স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা মহোদয়, গত ১৫ জুলাই ২০২৫ খ্রি. প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁর কোন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
ইউনেস্কোর মতে শিক্ষায় জিডিপির ৬% বরাদ্দ রাখা উচিত। অথচ বাংলাদেশে চলতি অর্থ বছরে রাখা হয়েছ ১.৫%এর কাছাকাছি !!! কিন্তু অবাক করা বিষয় সোমালিয়ার মত জলদস্যু কবলিত দেশে জিডিপির বরাদ্দ ৩%, পৃথিবীর সবচেয়ে দূর্নীতিগ্রস্থ দেশ দক্ষিণ সুদানের বরাদ্দ আমাদের থেকে সামান্য কম ১.২%, দরিদ্র দেশ নেপালের ৩.৪%, ভিয়েতনামের ৩.৯২% দরিদ্র দেশ হাইতির ১.৩% দেওলিয়া দেশ শ্রীলঙ্কার বরাদ্দ ৪.৩২%। আর আমাদের যে কারিকুলাম অনুসরণ করা হয় তাদের (ফিনল্যান্ড) জিডিপির বরাদ্দ কত জানেন? ৬-৭%!!! যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ৬% অস্ট্রেলিয়া ৬.১% নরওয়ে ৬.৬% আর আমাদের প্রাথমিকের শিক্ষকদের বেতন দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিন্ম। তারা এত এত মেগা প্রকল্প নিয়ে মেগা দূর্ণীতি করেছে কিন্তু শিক্ষায় কোন মেগা প্রকল্প নিতে পারে নায়। এমন কী দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থাকার পর ও ২০১০ সালের শিক্ষা নীতি ই বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তারপর ও নাকি আমরা রোল মডেল ছিলাম!!!!
আর এই সব কারণে বাংলাদেশের শিক্ষার মান দিন দিন তলানির দিকে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীর মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সপ্তম শ্রেণির সমান। ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলাপমেন্ট একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে বাংলাদেশের শিক্ষার মান দিন দিন কমছে। প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ ভিয়েতনামের পিছনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকের সনদকে সিঙ্গাপুরের ফাউন্ডেশন কোর্সের সমান ধরা হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত স্নাতক সনদকে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ ডিপ্লোমা হিসেবে গন্য করেছে। ২০২৪-২৫ শিক্ষা বর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরিক্ষায় বিজ্ঞান ইউনিটে ৯৪% শিক্ষার্থী অকৃতিকার্য। কলা,আইন ও সমাজবিজ্ঞান ইউনিটে ৯০% ফেল করছে। অথচ এদের এস এস সি ও এইচ এস সি তে ৫ লাখ ২১ হাজার শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ প্রাপ্ত।
তবে আমার সামান্য অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি শত সমস্যার মাঝেও শিক্ষকতা এমন একটি পেশা যেখানে অপেক্ষাকৃত স্বাধীনভাবে কাজ করা যায়, অপেক্ষাকৃত উৎকণ্ঠাবিহীন ভাবে থাকা যায়, অপেক্ষাকৃত কম তাঁবেদারি করে থাকা যায়, অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ বিবেক নিয়ে কাজ করা যায়। শিক্ষকতার সার্থকতা- ব্যর্থতা,ভালোলাগা, নালাগা-সবই নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের সাথে সম্পর্কের ওপর। শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ওপর। আমি প্রাথমিকের শিক্ষক হয়েছি আপসোস নেই। যখন দেখি আমার ছাত্র-ছাত্রীরা, তাদের অভিভাবকেরা সম্মান দিচ্ছে, তাদের স্বপ্নকে আমাদের হাতে তুলে দিচ্ছে আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারলে তখন ভালো লাগে, গর্বে বুক ভরে যায়। নিতান্তই ক্ষুদ্র একজন শিক্ষক হিসেবে আমার সকল ক্ষুদ্রতা ঢেকে যায়। ওদের সাফল্যের মাঝে খুঁজে পাই আমার শিক্ষক জীবনের সার্থকতা।
নিজের পেশার প্রতি ভালোবাসা ও প্রচেষ্টার ফলে ২০২৩ সালে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শ্রেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক নির্বাচিত হয়ে জেলায় ও ২০২৪ সালে নোয়াখালী জেলার শ্রেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক নির্বাচিত হয়ে বিভাগে অংশ গ্রহণ করার সুযোগ হয়েছে। ২০২৫ সালে উপজেলা পর্যায়ে গুণি শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। আমার প্রিয় সহকর্মীবৃন্দ সহ এ পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট যাঁদের আন্তরিকতা আর সহযোগিতায় এ পেশায় থাকতে পারছি তাদের নিকট কৃতজ্ঞ । প্রিয় শিক্ষার্থী সহ সকলের জন্য রইল আন্তরিক শুভ কামনা । মহান আল্লাহ যেন বাকি সময়টা সুস্থতার সঙ্গে, নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে অতিবাহিত করার এবং যথাযথ দায়িত্ব পালন করার সামর্থ্য দেন এটাই প্রত্যাশা করছি । সকলের নিকট দোয়ার আবেদন রইলো।
৪
৬ মন্তব্য