Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৮ অক্টোবর, ২০২৫ ১১:২০ পূর্বাহ্ণ

“দূর্নীতি রাষ্ট্রের উন্নতির অন্তরায়”

দূর্নীতি রাষ্ট্রের উন্নতির অন্তরায়

মোহাম্মদ মনির হোসেন

প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, মেহের ডিগ্রি কলেজ, শাহরাস্তি, চাঁদপুর। +8801811656353, [email protected]

 


দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের পথে একটি গুরুতর এবং পদ্ধতিগত বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেই নয়, বরং সুশাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিকেও ধ্বংস করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) কর্তৃক প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্কোর গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন (২৩), যা প্রমাণ করে দেশে দুর্নীতি কেবল ব্যক্তিগত অপব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি ক্ষমতার রাজনীতির মূল উপাদান হিসেবে কাজ করছে । রাজনৈতিক প্রশ্রয় এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে দুর্নীতিবাজরা রাষ্ট্রীয় তোষণ পাচ্ছে, যা দেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে । এই প্রতিবেদনে দুর্নীতির বহুমাত্রিক প্রভাব, বিশেষত অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা হ্রাস, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা এবং সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টির বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে সিঙ্গাপুরের মতো সফল আন্তর্জাতিক মডেলের উদাহরণ অনুসরণ করে, আমূল রাষ্ট্র-কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই সংস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ সম্পন্ন করা, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন এবং কালো টাকা সাদা করার সুযোগ চিরতরে বাতিল করা । এই কাঠামোগত সংস্কারই জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য পূর্বশর্ত।

.  তাত্ত্বিক ভিত্তি ও দুর্নীতির বহুমুখী কাঠামো

v  রাষ্ট্রের উন্নতির পথে দুর্নীতির চ্যালেঞ্জ:

দুর্নীতিকে প্রায়শই একটি নৈতিক দুর্বলতা বা বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলেও, রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে এটি একটি গভীর পদ্ধতিগত বাধা। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে দুর্নীতি এক ভয়াবহ অভিশাপ, যা সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি, মূল্যবোধ ও আদর্শের পরিপন্থী । দুর্নীতি একটি জাতির সকল অর্জন এবং জাতীয় উন্নয়নের সকল সম্ভাবনাকে ম্লান করে দেয় । বিশেষজ্ঞরা বহুলাংশে একমত যে, দুর্নীতি বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায় । এই সর্বনাশা সামাজিক ব্যাধির করাল গ্রাসে একটি সম্ভাবনাময় জাতির ভবিষ্যৎ ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয় ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, পৃথিবীর ইতিহাসে সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ ও পরিশ্রমী জাতিই উন্নতির শিখরে আরোহণ করেছে। কিন্তু যখন জাতীয় জীবনে দুর্নীতি প্রবেশ করে, তখন জাতির সকল উন্নতির পথ বন্ধ হয়ে যায় । দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি করে না; বরং এটি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি করে, যা স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দেয় । তাই, দুর্নীতিকে একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের অগ্রগতির প্রধানতম প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করা অপরিহার্য।

v  দুর্নীতির তাত্ত্বিক সংজ্ঞা ও বহুমুখী প্রকৃতি:

দুর্নীতির সংজ্ঞা ও প্রকৃতি বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-এর বহুল স্বীকৃত সংজ্ঞা   অনুযায়ী, "ব্যক্তিগত লাভের জন্য অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার হল দুর্নীতি"এই সংজ্ঞাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করেব্যক্তিগত স্বার্থে রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহারই হলো দুর্নীতির মূল ভিত্তি

প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি নিজের খেয়াল খুশি মতো সরকারি ক্ষমতা বা পদমর্যাদার অপব্যবহার করে, অথবা আর্থিক, বস্তুগত বা অন্য যেকোনো উৎকোচের বিনিময়ে কোনো কাজ করে বা ন্যায়সঙ্গত কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকে, তবে এরূপ কার্যাবলী দুর্নীতি বলে বিবেচিত হয়এই সংজ্ঞার ভিত্তিতে, দুর্নীতির প্রকৃতি কেবল আর্থিক ঘুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। উদাহরণস্বরূপ, মোটর গাড়ির লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ঘুষের বিনিময়ে অযোগ্য ব্যক্তিকে লাইসেন্স দেওয়া বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের খাতিরে অযোগ্য ব্যক্তিকে পদোন্নতি প্রদান যেমন দুর্নীতি, তেমনি সরকারি হাসপাতালে সিট পেতে ওয়ার্ডবয়কে বকশিস প্রদানও দুর্নীতির অন্তর্ভুক্ত এছাড়াও, দুর্নীতি কেবল উৎকোচের মাধ্যমে ব্যক্তিগত লাভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সকল ধরনের অব্যবস্থাপনাও দুর্নীতির অস্তিত্বকে নির্দেশ করে । প্রশাসন বিজ্ঞানে দুর্নীতির অর্থ হলো দায়িত্বশীল পদে সমাসীন হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা লাভের জন্য স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের আশ্রয় গ্রহণ । সুতরাং, দুর্নীতি এমন একটি কৌশলগত অপরাধ যা কেবল ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের আকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, বরং নীতিগত বা প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার (যেমন স্বজনপ্রীতি) থেকেও উদ্ভূত হয়। এটি মূলত কর্তৃপক্ষের অপব্যবহারের মাধ্যমে স্বজনপ্রীতি বা বলপ্রয়োগ দ্বারা অবৈধ সুবিধা প্রদানকে নির্দেশ করে । দুর্নীতিকে এর স্তর অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, রাজনৈতিক দুর্নীতি, অর্থনৈতিক দুর্নীতি, সামাজিক দুর্নীতি এবং ব্যক্তির একক দুর্নীতি হিসেবে শ্রেণীকরণ করা যায়

v  উন্নয়ন এবং সুশাসনের প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি:

দুর্নীতির ব্যাপকতা একটি রাষ্ট্রের সুশাসন ও উন্নয়নের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। দুর্নীতির কারণে গণতন্ত্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো, যা জাতীয় সততা ব্যবস্থার অংশ, অকার্যকর হয়ে পড়ে, ফলস্বরূপ সুশাসন প্রতিষ্ঠা ব্যাহত হয়দাতা দেশ ও উন্নয়ন সংস্থাসমূহ বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণদানের ক্ষেত্রে সুশাসনকে অন্যতম শর্ত হিসেবে আরোপ করছে, যা প্রমাণ করে দুর্নীতির উপস্থিতি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একটি রাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দেয় উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনামূলক চিত্র এই প্রসঙ্গে গভীর বার্তা বহন করে। স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশের সমপর্যায়ে থাকা দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে যে, গত তিন দশকেরও বেশি সময়ে বাংলাদেশের আপেক্ষিক কোনো অগ্রগতি হয়নিএই স্থবিরতার সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিদেশী বিনিয়োগ, দেশের আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে দুর্নীতি কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রগতিকে মৌলিকভাবে থামিয়ে দিয়েছে

. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: পদ্ধতিগত অবনতি ও সূচক বিশ্লেষণ

v  দুর্নীতির ধারণা সূচকে (সিপিআই) বাংলাদেশের হতাশাজনক চিত্র:

জার্মানির বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) প্রতিবছর দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) প্রকাশের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী দুর্নীতির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সূচক ক্রমাগতভাবে হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেছে, যা দেশের উন্নয়নের পথে দুর্নীতির তীব্রতাকে প্রমাণ করে। সিপিআই অনুযায়ী, ০ থেকে ১০০ স্কেলে শূন্য স্কোরকে সবচেয়ে ব্যাপক দুর্নীতি এবং ১০০ স্কোরকে সবচেয়ে কম মাত্রার দুর্নীতি ধরা হয় । ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ ২৫ থেকে ২৮ এর মধ্যে স্কোর পেলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অবস্থানে অবনতি হয়েছে২০২৩ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৪ এবং নিম্নক্রম অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০ম২০২৪ সালে এই প্রবণতা আরও খারাপের দিকে মোড় নেয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর তথ্যমতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের স্কোর আরো এক পয়েন্ট কমে হয় ২৩, যা ২০১২ সাল থেকে ১৩ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের সর্বনিম্ন স্কোর । বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দুই ধাপ অবনতি হয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫১তম স্থানে দাঁড়ায় । নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৪তম । দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল আফগানিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় সর্বনিম্ন, যা আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে চরম উদ্বেগজনকটিআইবি'র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সর্বনিম্ন স্কোর এবং ক্রমঅবনতি প্রমাণ করে যে, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে, লালন করেছে, এমনকি দুর্নীতি সংঘটনে সহায়তা ও অংশগ্রহণ করেছে । এর ফলস্বরূপ যথেচ্ছ লুটপাট, দুর্নীতিবাজদের রাষ্ট্রীয়ভাবে তোষণ, আইনের সঠিক প্রয়োগ না করা এবং সার্বিক কাঠামোগত দুর্বলতা বৃদ্ধি পেয়েছেএই চিত্রটি নির্দেশ করে যে বাংলাদেশে দুর্নীতি কেবল একটি বিচ্যুতি নয়; বরং এটি একটি চৌরতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে, যেখানে ক্ষমতার মূল উপাদানই হলো দুর্নীতি

v  দুর্নীতির কাঠামোগত চালক এবং উৎপত্তির কারণ:

দুর্নীতির উৎপত্তি একক কোনো কারণের ফল নয়; বরং এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার একটি জটিল চক্রের ফল।

প্রথমত, রাজনৈতিক প্রশ্রয় এবং অসুস্থ রাজনীতি দুর্নীতির মূল চালক । রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকুক বা বিরোধী দলেই থাকুক, তারা দুর্নীতিকে পুঁজি করে লাভবান হয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করেরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে বহুলোক অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়ে। অবৈধ কাজ করার পরেও রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে অপরাধীরা শাস্তি থেকে মুক্ত থাকে এবং আরও অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে । রাজনীতিবিদ ও সন্ত্রাসীদের নেতৃত্বে বিকশিত এই অসুস্থ রাজনীতিই দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দলীয়করণ দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করে। প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীকে খুঁজে বের করে শাস্তি প্রদান করা সম্ভব হয় না, কারণ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে । সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দুর্নীতি সবারই জানা ঘটনা। এর কারণে অযোগ্য ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয় এবং তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে না । বিগত সময়ে কোটাব্যবস্থা এমন দুর্নীতির প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিল, যা যোগ্য জনশক্তির অভাবে দেশের শিক্ষা, চিকিৎসা, শিল্প, যাতায়াত ব্যবস্থা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে পিছিয়ে দিয়েছে

তৃতীয়ত, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় দুর্নীতির পথ সুগম করে। অনৈতিকতার বিস্তার, সামাজিক বৈষম্য, হতাশা, নিরক্ষরতা এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ব্যক্তিকে অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলে । সীমাহীন লোভ এবং পরবর্তী প্রজন্মের নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নির্মাণের কাল্পনিক স্বপ্নে বিভোর কতিপয় মানুষের আকাঙ্ক্ষা দুর্নীতির অন্যতম কারণ দুর্নীতি সামাজিক অনুশাসন ও মূল্যবোধ বিনষ্ট করে এবং সমাজে স্বার্থপরতা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জাতীয় অনৈক্য ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে

চতুর্থত, অর্থনৈতিক কারণগুলো মানুষকে অপরাধপ্রবণ করে তোলে। দারিদ্র্যের আঘাতে মানুষ ভালোভাবে বাঁচতে চায় এবং সমাজে সচ্ছলদের মতো হবার বাসনায় আর্থিক মর্যাদা লাভের জন্য দরিদ্র শ্রেণীর কিছু লোক অপরাধ প্রবণ হয়ে পড়ে । শিল্পায়ন ও শহরায়ন, পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাব এবং বিত্তবানদের বিলাসী জীবনধারা যুবসমাজকে আকৃষ্ট করে অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়

. জাতীয় উন্নয়নের উপর দুর্নীতির বহুমুখী এবং ব্যয়বহুল প্রভাব

দুর্নীতির প্রভাব শুধু রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ক্ষতি করে না, বরং এটি একটি জাতির সার্বিক উন্নয়ন কাঠামোকে ভঙ্গুর করে তোলে। দুর্নীতি এমন একটি ব্যয়বহুল করহিসেবে কাজ করে, যা রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয় এবং সার্বিক উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে

v  অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগে বাধা:

দুর্নীতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর সরাসরি আঘাত হানে। দেশের উন্নয়নে বড় বাধা হিসেবে পরিচিত দুর্নীতি নানা কাঠামোর স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে, ফলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব হয় না, বরং দেশ ধীরে ধীরে অবনতির দিকে চলে যায়
প্রথমত, দুর্নীতি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI)-কে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিনিয়োগকারীরা এমন দেশে অর্থ বিনিয়োগ করতে চায় না যেখানে স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা গেছে, যার ফলে গত আট মাসে বিদেশি বিনিয়োগ ২০.১৫ শতাংশ কমেছে । রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অনিশ্চয়তা দূর না হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরে না
দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও অর্থের ব্যাপক অপচয় ঘটায়। সরকারি ক্রয়, প্রকল্প পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভ্যালু ফর মানিঅর্জনে অন্তরায় সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক হীনস্বার্থের উদ্দেশ্যে গৃহীত অবকাঠামো প্রকল্পগুলো কেবল অর্থনীতির উপরই চাপ বাড়ায় না, তা জনগণের কোনো কল্যাণও করে নানির্মাণ কাজে ভেজাল করে টাকা আত্মসাৎ  অবকাঠামোগত উন্নয়নকে ব্যাহত করে

তৃতীয়ত, অর্থপাচার ও মূলধন ঘাটতি জাতীয় অর্থনীতিকে দুর্বল করে। বৈধ উৎসবিহীন অপ্রদর্শিত আয়কে বৈধ করার সুযোগ দেওয়া (কালো টাকা সাদা করা) একটি দুর্নীতি-ান্ধব, অনৈতিক ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা । এই চর্চা দেশের ভেতরে সম্পদ পাচার ও আহরণের সুযোগ তৈরি করে, যা অর্থনীতির উৎপাদনশীল ভিত্তি ধসিয়ে দিতে পারে

v  সুশাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণ খাতের ক্ষতি:

দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলো দরিদ্র জনগোষ্ঠী। দুর্নীতির কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি এটি দারিদ্র্য ও অবিচার বাড়ায় । শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচারব্যবস্থা সহ জীবনধারণের জন্য সকল সরকারি সেবা পেতে দরিদ্র মানুষকে ঘুষ দিতে হচ্ছে, ফলে সরকারি সেবা থেকে বেশিরভাগ দরিদ্র মানুষ বঞ্চিত হয়

স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি: চিকিৎসা কেন্দ্রে স্বাস্থ্যসেবা নিতে যাওয়া পরিবারের প্রায় ৪৮.৭ শতাংশ দুর্নীতির শিকার হন । বিশেষত দালালরা অসচেতন মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়। গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে ঘুষের হার যথাক্রমে ৪৫ শতাংশ এবং ৫১ শতাংশ, যার গড় পরিমাণ প্রায় ৬৮০ টাকা । এটি দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার অধিকারকে মৌলিকভাবে লঙ্ঘন করে।
সামাজিক বৈষম্য ও অস্থিরতা: দুর্নীতি সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি করে এবং সুষ্ঠ ও সুস্থ প্রতিযোগিতার পথে বাধা সৃষ্টি করে । এছাড়া এটি সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও জাতীয় অনৈক্য সৃষ্টিতে সহায়তা করে । দুর্নীতি কেবল জীবনধারণের ব্যয় বাড়ায় না, বরং দুর্নীতি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে । গার্মেন্টস খাতসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের প্রাণহানি বা টেন্ডারবাজি ও জমি দখলের কারণে মৃত্যুর ঘটনা এর জঘন্যতম দৃষ্টান্ত

. বৈশ্বিক উত্তম চর্চা ও সাফল্যের মডেল: সিঙ্গাপুর দৃষ্টান্ত

দুর্নীতি দমনে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও সফল মডেলের প্রয়োজনীয়তা:

যেসব রাষ্ট্র কার্যকরভাবে দুর্নীতি দমন করে উন্নয়নের শিখরে আরোহণ করেছে, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা অপরিহার্য। এই দেশগুলো প্রমাণ করেছে যে, দুর্নীতি দমনে কেবল আইন নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং স্বাধীন, ক্ষমতাধর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অপরিহার্য। সিঙ্গাপুর এই ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

v  সিঙ্গাপুরের দৃষ্টান্ত: স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার:

সিঙ্গাপুরের Corrupt Practices Investigation Bureau (CPIB) হলো দেশটির দুর্নীতি দমনকারী স্বাধীন সংস্থা, যা সিঙ্গাপুরকে বিশ্বের সর্বনিম্ন দুর্নীতিগ্রস্ত ও এশিয়ার সবচেয়ে স্বচ্ছ জাতিগুলোর একটিতে রূপান্তরিত করেছে
প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও সুরক্ষা: CPIB-কে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (Prime Minister's Office - PMO) অধীনে রাখা হয়েছে । এটি পুলিশ বা বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থেকে কাজ করে, যা এর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে। সংস্থাটি ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও, ১৯৬৯ সালে এটিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতায় আনা হয়, যা দেখায় যে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্ব এর স্বাধীন কার্যক্রমে পৃষ্ঠপোষকতা করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। এটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি বিপরীত চিত্র উপস্থাপন করে, যেখানে রাজনৈতিক প্রশ্রয়ই দুর্নীতির মূল কারণ

দ্বিতীয়ত, ব্যাপক আইনগত ক্ষমতা: CPIB-এর ম্যান্ডেট অত্যন্ত ব্যাপক। এটি সিঙ্গাপুরের সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের সকল প্রকার ঘুষ (আর্থিক ও অ-আর্থিক) তদন্ত করতে পারেআরও উল্লেখযোগ্য হলো, সিঙ্গাপুরের নাগরিকরা দেশের বাইরে দুর্নীতি করলেও CPIB-এর সেই অপরাধ তদন্ত করার জন্য এক্সট্রা-টেরিটোরিয়াল ক্ষমতা রয়েছে । সরকারি চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত দুর্নীতির জন্য $100,000 পর্যন্ত জরিমানা বা ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারেএই কঠোর শাস্তি এবং বিস্তৃত ক্ষমতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ তৈরি করে।

তৃতীয়ত, -গভর্নেন্স ও স্বচ্ছতা: সিঙ্গাপুরে ই-গভর্নমেন্ট কার্যকরভাবে চালু হওয়ার ফলে সরকারি ক্রয় এবং ব্যবসা-রাষ্ট্র সম্পর্ক অত্যন্ত স্বচ্ছ হয়েছে । বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কোনো সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার চেষ্টা করলে জরিমানা হতে পারে, যা কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনৈতিক যোগাযোগ স্থাপনকে নিরুৎসাহিত করে

চতুর্থত, নেতৃত্বের অঙ্গীকার: সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ-এর উক্তি রাজনৈতিক সদিচ্ছার গুরুত্ব তুলে ধরে: "আমি হয় দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারতাম এবং আমার পরিবারকে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় রাখতে পারতাম, অথবা আমার দেশ ও জনগণের সেবা করতে পারতাম এবং দেশকে বিশ্বের সেরা ১০ অর্থনীতির তালিকায় নিয়ে আসতে পারতাম। আমি দ্বিতীয় বিকল্পটি বেছে নিয়েছি।" এই উক্তি প্রমাণ করে যে, দুর্নীতি দমনে কেবল আইন নয়, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা নেতৃত্বের ব্যক্তিগত নৈতিক অঙ্গীকার এবং রাষ্ট্রের উন্নতিকে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার সংকল্প অপরিহার্য।
. দুর্নীতি প্রতিরোধে অপরিহার্য রাষ্ট্রকাঠামোগত সংস্কার

দুর্নীতি নামক জাতীয় ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে এবং জাতীয় উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে হলে কেবল সচেতনতা বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার আবশ্যক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিশন কর্তৃক প্রস্তাবিত সুপারিশমালায় এই কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

v  দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি:

দুর্নীতি দমনে কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য দুদকের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা এবং সক্ষমতা নিশ্চিত করা সর্বাগ্রে প্রয়োজন।
প্রথমত, প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা: দুদকের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতাসহ জনবল নিয়োগ, পদায়ন ও বদলির ক্ষমতা দুদক সচিবের কাছ থেকে সরিয়ে কমিশনের হাতে ন্যস্ত করতে হবে । মহাপরিচালকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা (৮ থেকে ১২ তে) এবং শূন্য পদসমূহে অবিলম্বে নিয়োগের ব্যবস্থা করে নতুন জনবল-কাঠামো প্রণয়ন করা উচিত । এছাড়া প্রতিটি জেলায় পর্যায়ক্রমে পর্যাপ্ত লজিস্টিক সক্ষমতাসহ জেলা কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে

দ্বিতীয়ত, প্রেষণে নিয়োগ বন্ধ ও অভ্যন্তরীণ নিয়োগ: মহাপরিচালক ও পরিচালক পদসমূহে প্রেষণের মাধ্যমে পদায়ন বন্ধ করা জরুরিএই পদগুলোতে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক ও উন্মুক্ত প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দিতে হবে, তবে অভ্যন্তরীণ প্রার্থীদের জন্য পদ সংরক্ষণ করা যেতে পারে

তৃতীয়ত, স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট ও ডিজিটালাইজেশন: দুর্নীতি দমন আইন, ২০০৪-এর ধারা ৩৩() পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অবিলম্বে স্থায়ী প্রসিকিউশন ইউনিট গঠনের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে । অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, তদন্ত, গোপন অনুসন্ধান ও প্রসিকিউশন সংক্রান্ত কার্যাদি এন্ড-টু-ন্ড অটোমেশনের আওতায় আনতে হবে

চতুর্থত, অন্যান্য সংস্থার সাথে সমন্বয়: CAG (মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক) এবং IMED (বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ) কোনো দুর্নীতি উদঘাটন করলে, তা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে দুদকের নজরে আসে এবং দুদক প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে

v  বিচার বিভাগ ও আইনের শাসনে আমূল সংস্কার:

দুর্নীতির দায়ে শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা অত্যাবশ্যক।
প্রথমত, বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ: মাসদার হোসেন মামলার রায় অনুযায়ী বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ-প্রক্রিয়া অবিলম্বে সম্পন্ন করতে হবে। বিচার বিভাগের পরিপূর্ণ ক্ষমতায়িত নিজ সচিবালয় স্থাপন ও কার্যকর করা আবশ্যক, যাতে উচ্চ এবং অধস্তন আদালতের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিসহ সার্বিক নিয়ন্ত্রণ এককভাবে সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্বাধীন সচিবালয়ের ওপর ন্যস্ত হয়

দ্বিতীয়ত, বিচারপতি নিয়োগ ও অপসারণ: উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ সাপেক্ষে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা/আইন প্রণয়ন করতে হবে। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে বিচারপতি অপসারণের এখতিয়ার সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত করতে হবে

তৃতীয়ত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংস্কার: সকল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে হবে । পুলিশের সকল পর্যায়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করার লক্ষ্যে পুলিশ সার্ভিস কমিশন গঠন করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য পুলিশ কর্তৃপক্ষের বাইরে একটি স্বাধীন কর্তৃপক্ষ গঠন করা অপরিহার্য

চতুর্থত, সরকারি কর্মচারীর দায়বদ্ধতা: সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’-তে সরকারি কর্মচারীদের ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তারে সরকারের অনুমতি গ্রহণের বিধান (ধারা ৪১ এর ১) বাতিল করতে হবে । এই বিধান দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শাস্তির হাত থেকে সুরক্ষা প্রদান করে, যা আইনের শাসনের পরিপন্থী।

v  রাজনৈতিক ও সংসদীয় কাঠামোগত সংস্কার:

রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

প্রথমত, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা: জাতীয় সংসদে জনরায়ের বাস্তব প্রতিফলন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (Proportional Representation) সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবেএর পাশাপাশি, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে গণ-অনাস্থা প্রকাশের মাধ্যমে অপসারণ (Recall Election) এবং পুনরায় নির্বাচনের বিধান নিশ্চিত করতে হবে

দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার ভারসাম্য: সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে নিজ দলের ওপর অনাস্থা প্রস্তাব ও বাজেট ব্যতীত, আইন প্রণয়নসহ অন্য সকল ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের নিজ দলের সমালোচনা ও দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে । এছাড়া, একই ব্যক্তির সরকারপ্রধান (প্রধানমন্ত্রী), দলীয় প্রধান ও সংসদ নেতা থাকার দ্বৈত-ভূমিকা বন্ধ করা উচিতসংসদীয় স্থায়ী কমিটি, যেমন সরকারি হিসাব বা অর্থ কমিটি, এর সভাপতির পদ অন্তত ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচন করতে হবে

তৃতীয়ত, নৈতিকতা ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব: জনপ্রতিনিধিত্ব ও সরকারি কার্যক্রমে ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থতা, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে স্বার্থের দ্বন্দ্ব আইনপ্রণয়ন করা আবশ্যক

v  আর্থিক স্বচ্ছতা ও অর্থপাচার রোধে পদক্ষেপ:

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য কঠোর নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন।

প্রথমত, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল: বিগত বিভিন্ন অর্থবছরে আয়কর আইনে নির্দিষ্ট হারে কর প্রদানের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার যে ব্যবস্থা দেওয়া হয়েছে, তা দুর্নীতি-বান্ধব, অনৈতিক ও বৈষম্যমূলকবৈধ উৎসবিহীন আয়কে বৈধতা দানের এই রাষ্ট্রীয় চর্চা চিরস্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে

দ্বিতীয়ত, সম্পদের বিবরণ প্রকাশ: সকল পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী এবং সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ সব পর্যায়ের কর্মীদের প্রতি বছর তাদের আয় ও সম্পদের বিবরণ জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে

তৃতীয়ত, ব্যাংক খাতের সংস্কার: ঋণ জালিয়াতি, প্রতারণা এবং অনিয়ম-দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবেব্যাংক খাতের সংস্কারের জন্য স্বাধীন ব্যাংক কমিশন গঠন করতে হবে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকসহ ব্যাংক খাতের সংস্কারের জন্য কৌশলপত্র প্রণয়ন করবেবাংলাদেশ ব্যাংকসহ সকল বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে

. প্রতিরোধমূলক সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও অংশীজনের ভূমিকা

দুর্নীতি দমনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি রাষ্ট্রের অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ, যেমন গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং নজরদারি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

v  নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষা:

গণমাধ্যম সামাজিক জীবনের নানা সমস্যা মোকাবেলায় সহযোগী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে এবং সমাজ থেকে দুর্নীতি ও বৈষম্য দূরীকরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম

প্রথমত, স্বাধীনতার নিশ্চয়তা: মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদ মাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ তথ্য প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করে এমন সব ধারা সংশ্লিষ্ট আইন থেকে বাতিল করতে হবে । খসড়া ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৪’-এর মতো আইনগুলো ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, বাকস্বাধীনতা এবং ভিন্নমত নজরদারির সুযোগ সৃষ্টি করে, যা সংশোধন করা আবশ্যক
দ্বিতীয়ত, নজরদারি বন্ধ: জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের কার্যক্রমের ওপর গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপ ও নজরদারি বন্ধ করতে হবে । বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও)-এর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন, ২০১৬এবং আয়কর আইন ২০২৩’-এর বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিল করতে হবে, কারণ এগুলো মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে

তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন: গণমাধ্যম কর্মীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সুরক্ষায় স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন করতে হবে । এছাড়া, সরকার ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রচার-যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার চর্চা বন্ধ করতে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমসমূহকে পুনর্গঠন করা জরুরি । যখন গণমাধ্যম বা নাগরিক সমাজের ওপর রাষ্ট্রীয় নজরদারি বা হস্তক্ষেপ করা হয়, তখন তা দুর্নীতি দমনকারী হিসেবে তাদের ভূমিকার উপর সরাসরি আঘাত হানে এবং পরোক্ষভাবে দুর্নীতির বিস্তারকে উৎসাহিত করে।

v  প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা ও জনসচেতনতা সৃষ্টি:

দুদকের প্রতিরোধ অনুবিভাগ দুর্নীতি দমনে নীতি প্রণয়ন এবং জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করে । এই কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে নৈতিকতা ও আচরণবিধি চালুকরণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্র তৈরি এবং দুর্নীতির ঝুঁকিগুলোর মূল্যায়ন
সচেতনতামূলক কার্যক্রম: দুর্নীতি বিরোধ সংস্কৃতি তৈরি করার লক্ষ্যে সততা সংঘকে পরামর্শ প্রদান, নতুন দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি গঠন ও বিদ্যমান কমিটির দক্ষতার উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় । দুদক কর্মশালা, সেমিনার, মানববন্ধন ও র‌্যালির মাধ্যমে দুর্নীতির কুফল সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে

প্রতিবন্ধকতা তৈরি: দুর্নীতি প্রতিরোধে জনসম্পৃক্ততা জোরদার করার লক্ষ্যে নাগরিকদের ক্ষমতায়ন করতে হবে । দুর্নীতি সম্পর্কে অভিযোগ করা সঙ্গতিপূর্ণভাবে সহজ ও নিরাপদ করে তুলতে হবে। এছাড়া, দুর্নীতির দায়ে শাস্তি ও জরিমানার বিষয়টি বেশি করে প্রচার করা উচিতযেমন জরিমানা, জেল, সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণযা দুর্নীতিবাজদের মধ্যে একটি শক্তিশালী ভয়ের সঞ্চার করবে । দুদক ও তার সাফল্যের ইতিবাচক গল্পসমূহ প্রচারের জন্য গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি

. চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ ও জাতীয় ঐক্যের আহ্বান

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সংস্কারের অনিবার্যতা এই বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে যে দুর্নীতি রাষ্ট্রের উন্নতির পথে সবচেয়ে বড়, পদ্ধতিগত এবং বহুমুখী অন্তরায়। এটি কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে না; বরং সামাজিক ন্যায়বিচার, দরিদ্রদের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে দুর্বল করে। সিপিআই সূচকে বাংলাদেশের ক্রমাগত অবনতি এবং চৌরতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ প্রমাণ করে যে প্রচলিত উপায়ে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব দুর্নীতি দমনের কাঠামোগত ব্যর্থতা শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের (দুদক) দুর্বলতার ফল নয়, বরং সংসদ, বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগসহ রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গে সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক অনুপ্রবেশের (Political Encroachment) ফল। যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য (Checks and Balances) ফিরিয়ে আনা না হবে এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে নাদুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং আমূল কাঠামোগত সংস্কারই হলো একমাত্র অনিবার্য পথ।

v  রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জাতীয় ঐক্যের অপরিহার্যতা:

দুর্নীতিকে নির্মূল করতে হলে সরকারের পাশাপাশি সর্বস্তরে মূল্যবোধ সৃষ্টি এবং সচেতনতা বাড়াতে হবেএই কাজে রাজনৈতিক দল, বেসরকারি খাত, এনজিও, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো অরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সম্পৃক্ত করা প্রয়োজনদুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ; দলগুলোকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের স্পষ্ট অবস্থান থাকবে এবং দুদকের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে তারা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে

রাষ্ট্রীয় অপচয় রোধ করতে এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে দুর্নীতির দ্রুত অবসান বাঞ্ছনীয় নয়, বরং অনিবার্য । নাগরিকদের উচিত রাজনৈতিক নেতাদের ওপর চাপ বজায় রাখা এবং স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, কার্যকরী ও দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি অব্যাহত রাখা । দুর্নীতিমুক্ত জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে প্রত্যেক নাগরিককে দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে এই জাতীয় ব্যাধি প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে । দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র কাঠামো নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আইনের শাসন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব

মন্তব্য করুন

ব্লগ